ধনীদের মার্কেটে ভিড় গরিবে ফাঁকা

উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে স্বল্প আয়ের মানুষদের আয়ের বড় অংশই চলে যায় খাবার কিনতে। সংসার চালাতে এই শ্রেণির এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ এখন ধার করে চলছে। এমন পরিস্থিতিতে এবারের ঈদে নি¤œ আয়ের বেশির ভাগ মানুষের নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য যেসব মার্কেট রয়েছে, সেগুলোতে কাক্সিক্ষত বেচাকেনা নেই। তবে কিছুটা চাপে থাকা মধ্যবিত্ত কিংবা সংকটের আঁচ না পাওয়া উচ্চবিত্তদের কেনাকাটা থেমে নেই। তাদের পদচারণে শপিং মলগুলোতে ভিড় বাড়ছে অন্যান্য বছরের মতোই। ব্যবসায়ীদের দাবি, এ বছর ঈদের কেনাকাটা ৩০ শতাংশ কমেছে।

ঈদুল ফিতরের বাকি মাত্র কয়েক দিন। কিন্তু এ উৎসবের আগে সব সময়ই ব্যবসা ভালো করেন ব্যবসায়ীরা। এবারের আগুন আতঙ্কে ছোট ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত, বড় শপিং মলগুলোর ঈদের ব্যবসা স্বাভাবিক। যদিও পণ্যমূল্য বেশি থাকায় শপিং মলগুলোর ব্যবসায়ীরাও আগের বছরের তুলনায় বেচা-বিক্রি কম বলে দাবি করছেন।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ও শপিং মল সেজেছে নানান সাজে। ছেলেদের জন্য নতুন ডিজাইনের পাঞ্জাবি এবং মেয়েদের জন্য থ্রিপিস-টপস জিন্সের সংমিশ্রণে এসেছে নানা পোশাক। তবে উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে এবারের ঈদে বহুগুণে বিক্রি কমেছে। এর মধ্যে তুলনামূলকভাবে যমুনা ফিউচার পার্ক ও বসুন্ধরার মতো বড় শপিং মলগুলোর ব্যবসায়ীদের বেশি বিক্রি হলেও নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য গুলিস্তানের পীর ইয়ামিন ও মৌচাক মার্কেটের ব্যবসায়ীদের বিক্রি অন্যান্য বছরের তুলনায় অর্ধেকে নেমেছে।

গতকাল রবিবার বসুন্ধরা শপিং মল ও যমুনা ফিউচার পার্কের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, আগের বছরের চেয়ে সব ধরনের পোশাকে অন্তত ৩০০-৫০০ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছে। এসব মার্কেটে এবার ঈদের বেচাকেনা অনেকাংশে কমেছে।

যমুনা ফিউচার পার্কের ‘ইয়োলোতে’ দীর্ঘ ৫ বছর বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করছেন আদ্রিয়ান। তার চোখে এবারের ঈদের বাজারে সব থেকে বিক্রি কম হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ইয়োলোর চাকরিজীবনে এ বছরে বিক্রির অবস্থা এতটা খারাপ দেখেছি। করোনার পরে যে বছর দোকান খুলেছে, সে বছরও এমন সময়ে দৈনিক পাঞ্জাবি বিক্রি হয়েছে মিনিমাম ৫০-৭০ হাজার টাকা। এবার সেই বিক্রি ঠেকেছে ৪০-৫০ হাজার টাকার মধ্যে। আমাদের শোরুমে ছেলেদের ঈদ পোশাকে পাঞ্জাবির বিক্রি ভালো। বাকি বিভাগগুলোর অবস্থা খারাপ যাচ্ছে। এবারের ঈদের বেচাকেনা কেবল যে আমাদের একার খারাপ যাচ্ছে তা-ই নয়, পুরো মার্কেকেটর ব্যবসায়ীদের অবস্থা একই।’

উত্তরা থেকে আসা আকরাম-ফতেমা দম্পতি বলেন, ‘এবার পোশাকের মূল্য আমাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। অস্বাভাবিকভাবে পোশাকের দাম বেড়েছে। গত বছর পরিবারের সবার জন্য ঈদের পোশাক কিনতে খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। এবার সেই বাজেটে অর্ধেক মানুষের জন্য পোশাক ক্রয় করতে কষ্ট হচ্ছে।’

মার্কেট ব্যবধানে এবার সব ধরনের ঈদপোশাকে গড়ে ৩০-৫৫ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছ। এর মধ্যে গতবার ১৪০০ টাকায় বিক্রি হওয়া কটন কাপড়ের পাঞ্জাবি এবার বিক্রি হচ্ছে ১৮০০-১৯০০ টাকায়, সব ধরনের শার্টে বেড়েছে ৩০০-৪০০ টাকা, ৫০০ টাকার পোলো শার্ট বিক্রি হচ্ছে ৬০০-৬৫০ টাকা, জিন্স প্যান্ট বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা এবং সব থেকে বেশি মেয়েদের শাড়ি ও থ্রি-পিসের দাম ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বসুন্ধরা শপিং মলের কয়েকজন বিক্রয়কর্মী জানান, ছুটির দিনগুলোতে একটু ভালো হলেও অন্য বছরের হিসাবে এবার বিক্রি কমেছে অন্তত ৩০ শতাংশের মতো। তারা আশা করছেন ঈদের আগে বেচাকেনা বাড়বে।

তবে ছোট মার্কেটগুলোর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, শিপমেন্ট ও ইয়ার ভাড়া বেশি হওয়ায় এবার ঈদের পোশাকের দাম অনেক বেড়েছে। পাইকারিতেই ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেড়ে মেয়েদের একটি টপস বিক্রি হচ্ছে ১৫০০-২০০০ টাকা, সায়রা থ্রিপিস বিক্রি হচ্ছে ৩-৪ হাজার টাকা, ন্যারাকাট বিক্রি হচ্ছে ৫-৬ হাজার টাকা ও লেহেঙ্গা ৬-৭ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।

গুলিস্তানের পীর ইয়ামিন ও মৌচাক মার্কেটে খবর নিয়ে জানা যায়, এবারের ঈদবাজারে দেশীয় পোশাকের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান ও চীন থেকে আমাদানি করা ঈদপোশাক মার্কেট দখল করেছে। ব্যবসায়ীরা একেক দোকানে ২০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন আমাদানিকৃত পোশাকের ওপর। বসুন্ধরার মতো অভিজাত শপিং মলের তুলনায় এসব মার্কেটে বিক্রি অনেক কম। তবে নারীদের জন্য আমদানিকৃত পোশাকের মধ্যে গয়ারা, সারারা, লেহেঙ্গা, নায়নাসহ নানান পোশাকের চাহিদা রয়েছে।

গত শনিবার রাত ৮টার দিকে পীর ইয়ামিন মার্কেটের কোয়ালিটি কালেকশনের স্বত্বাধিকারী জয় বলেন, ডলারের মূল্য বেশি থাকায় পোশাক আমাদানি করতে এবার বাড়তি খরচ হয়েছে। নতুন করে ইয়ার ভাড়া যুক্ত হওয়া। সব মিলিয়ে এ বছর কিছুটা বাড়তি দামেই ঈদের পোশাক বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘গত বছর গুলিস্তানের ফুটপাতে বসেই  দৈনিক ৫০ হাজার টাকা সেল করতে পেরেছি। এবারে তার অর্ধেকও বিক্রি করতে পরছি না। সাধারণ ক্রেতারা দাম শুনেই দোকানের বাইরে থেকে চলে যান। এবারে সর্বোচ্চ ২৩ রোজায় ১৯ হাজার টাকার মাল বিক্রি করেছি।’

একই মার্কেটের আরেক ব্যবসায়ী পারুল বস্ত্রালয়ের মালিক আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘এই সময়ে মার্কেটে সব থেকে বেশি ভিড় থাকার কথা। সারা বছর যা ব্যবসা হয় ঈদকে কেন্দ্র করে এর থেকে বেশি বিক্রি হয়। কিন্তু এবার ৩০ লাখ টাকার শাড়ি-থ্রিপিস তুলে অলস সময় পার করছি।’

মোহাম্মদ নাজমুল আলম নামের এক ক্রেতা বলেন, ভেবেছিলাম এই সময়ে মার্কেটে প্রচন্ড ভিড় থাকবে। এসে দেখছি একদম লোকজন নেই বললেই চলে। বর্তমানের চিত্র যা রয়েছে, তা বছরের অন্যান্য স্বাভাবিক সময়ের মতো। কিন্তু ঈদের কেনাকাটা করতে এসে দেখছি পোশাকের দাম অনেক বেড়েছে। বাজেটের সঙ্গে মিল না থাকায় উপহারের পোশাক কম কিনতে হয়েছে।