জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) স্থায়ী আদেশ জারি করায় চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরুর পথ খুলল। এর আগে পরীক্ষামূলকভাবে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে এক কনটেইনার ভারতীয় পণ্য গত বছরের সেপ্টেম্বরে কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে আনার পর সিলেটের শেওলা স্থলবন্দর হয়ে আসামে পাঠানো হয়। এতে সরকারি ও বেসরকারি খাতে আয় হয়েছিল ৩ লাখ ৯৩৫ টাকা। ফলে ট্রানজিট থেকে বাংলাদেশের রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা নির্ভর করছে সেভেন সিস্টার হিসেবে পরিচিত ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর প্রবৃদ্ধি বাড়ার ওপর।
এনবিআরের আদেশে ট্রানজিট প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। নতুন করে এসকর্ট (পাহারা) ফি বাড়ানো হয়েছে। আগে প্রতি চালানে এসকর্ট ফি ছিল ৫০ টাকা, এখন তা বাড়িয়ে প্রতি কনটেইনার বা গাড়ির জন্য করা হয়েছে প্রতি কিলোমিটারে ৮৫ টাকা।
ট্রানজিট সুবিধার আওতায় ভারত থেকে কোনো পণ্য চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর ব্যবহার করে বিদেশের কোনো বন্দরে যেতে পারবে, বিদেশের কোনো বন্দর থেকে বাংলাদেশের বন্দর দিয়ে প্রবেশ করে তা ভারতের কোনো রাজ্যে যেতে পারবে। আবার ভারতের এক রাজ্য থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতের অন্য রাজ্যে যেতে পারবে। আর এতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে বলে জানিয়েছেন চিটাগাং চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবশ্যই আমাদের অর্থনীতি লাভবান হবে। তারা আমাদের বন্দর, সড়ক, ব্রিজসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ব্যবহার করবে। এতে আমাদের আয় বাড়বে।’
তবে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ায় রাজস্ব আয় তখনই বাড়বে, যখন ভারতের সেভেন সিস্টার্সে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ে। তবে এ ধরনের ট্রানজিট সুবিধা যত বাড়বে, তত আঞ্চলিক উন্নয়ন বাড়বে। এ ছাড়া মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে এর সুফল আরও বেশি পাওয়া যাবে।’
জানা যায়, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর করে ২০২০ সালের জুলাই মাসে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে চালান আনা-নেওয়া করে ভারত। মোট পাঁচটি চালান ভারত থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে গিয়েছিল।
কোন কোন খাতে আয় বাড়বে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, এনবিআর স্থায়ী আদেশে ট্রানজিট পণ্য পরিবহনে মাশুল নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সেই আদেশ অনুযায়ী, প্রতি চালানের প্রক্রিয়াকরণ মাশুল, ট্রান্সশিপমেন্ট ফি, নিরাপত্তা ফি, কনটেইনার স্ক্যানিং ফি, প্রশাসনিক ফি রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে আয় আসবে।
কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, সড়কপথে পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত মাশুল রয়েছে। মোদ্দাকথা, ভারত থেকে আসা ট্রানজিট পণ্য পরিবহনে বিভিন্ন ধরনের মাশুল ও খরচ, ট্রানজিট পণ্য পরিবহনে বন্দর ব্যবহারের সেবা মাশুল এবং দেশীয় ট্রাকে ট্রানজিট পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে আয় বাড়বে দেশের।
যেহেতু কিলোমিটারপ্রতি ফি রয়েছে, তাই দূরত্বের হিসাবে আয় বাড়বে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারত মূলত তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যে (আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল ও মেঘালয়) পণ্য পরিবহন করতে চায়। কারণ তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে পণ্য পরিবহন অনেক ব্যয়বহুল। বর্তমানে আটটি রুটে ট্রানজিট সুবিধা পাবে ভারত। এই রুটগুলো হলো চট্টগ্রাম বন্দর-আখাউড়া-আগরতলা, মোংলা বন্দর-আখাউড়া-আগরতলা, চট্টগ্রাম বন্দর-তামাবিল-ডাউকি, মোংলা বন্দর-তামাবিল-ডাউকি, চট্টগ্রাম বন্দর-শেওলা-সুতারকান্দি, মোংলা বন্দর-শেওলা-সুতারকান্দি, চট্টগ্রাম বন্দর-বিবিরবাজার-শ্রীমন্তপুর, মোংলা বন্দর-বিবিরবাজার-শ্রীমন্তপুর। এসব রুট দিয়ে পণ্য আনা ও নেওয়া উভয়ই করতে পারবে। ২০২১ সালের এসব রুটে মাশুল নির্ধারণ করেছিল সড়ক ও জনপথ মন্ত্রণালয়। প্রতি টন পণ্যে প্রতি কিলোমিটারে মাশুল ১ টাকা ৮৫ পয়সা। আটটি রুটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব মোংলা বন্দর-তামাবিল রুটে (৪৩৫ কিলোমিটার দূরত্ব) টোলসহ মাঝারি পণ্য পরিবহনক্ষমতার ট্রাকের আদায়যোগ্য মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ হাজার ১৯৫ টাকা। সবচেয়ে কম দূরত্ব (১৪৩ কিলোমিটার) চট্টগ্রাম বন্দর-কুমিল্লা বিবিরবাজার রুটের সড়কপথের মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ হাজার ৯৮৮ টাকা। সে হিসাবে যত পথ অতিক্রম করবে, সেই হিসাবে সড়কের মাশুলের পাশাপাশি এসকর্ট ফিও বাড়বে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একই সঙ্গে আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ নেপাল ও ভুটানও যদি আমাদের বন্দরগুলো দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়ার সুবিধা নেয়, তাহলে রাজস্ব আয় বহুগুণে বেড়ে যাবে।’
চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করে। বর্তমানে বন্দরের জেটি প্রায় জাহাজশূন্য থাকে। বিদ্যমান টার্মিনালের পাশাপাশি পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালও প্রস্তুত রয়েছে। সে হিসেবে ট্রানজিট পণ্য পরিবহনে চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো সমস্যা হবে না বলে জানান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের যে অবকাঠামো রয়েছে তা দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য এবং নেপাল-ভুটান ও মিয়ানমারকেও পণ্য পরিবহন সুবিধা দিতে পারবে। আমরা ইতিমধ্যে বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ এগিয়ে নিয়েছি। সে হিসেবে ভারত, ভুটান, নেপাল, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারসহ সমগ্র এলাকার বিজনেস হাব হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর কাজ করতে পারবে।’
এদিকে শিপিং সেক্টরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ট্রানজিট সুবিধায় শুধু সড়কপথ ও কাস্টমসের বিভিন্ন মাশুল নয় বন্দরের বিভিন্ন ফি যুক্ত হবে। এ ছাড়া ট্রানজিট অপারেটর নিয়োগ, বন্দরে জাহাজ ভেড়া, ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্টের ঘোষণা, শুল্কায়ন, পণ্যের কায়িক পরীক্ষা, ট্রানজিটকাল বিভিন্ন মাশুল রয়েছে। আর চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দরে বেশি জাহাজ ভিড়লে বন্দরের আয়ও বাড়বে।
উল্লেখ্য, ভারতের কলকাতা থেকে সেভেন সিস্টারস খ্যাত রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহন অনেক দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। কলকাতা থেকে এসব রাজ্যের দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত রয়েছে। কলকাতা থেকে পণ্যের চালান এই শহরগুলোতে নিতে চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর ব্যবহার করলে দূরত্ব অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। আর সে জন্যই ২০১৮ সালে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ট্রানজিট চুক্তি করে। চুক্তির আলোকে ২০২০ সালে প্রথম ও পরে গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে পণ্য আনা-নেওয়া করে ভারত। এরই ধারাবাহিকতায় ট্রানজিট সুবিধাকে স্থায়ী রূপ দিতে গত সোমবার আদেশ জারি করে এনবিআর। আদেশে ডকুমেন্ট প্রসেসিং ফি প্রতি চালানে ৩০ টাকা, ট্রানশিপমেন্ট ফি প্রতি মেট্রিক টনে ২০ টাকা, সিকিউরিটি চার্জ প্রতি মেট্রিক টনে ১০০ টাকা, এসকর্ট চার্জ প্রতিটি কনটেইনার বা গাড়ির জন্য প্রতি কিলোমিটারে ৮৫ টাকা, বিবিধ প্রশাসনিক চার্জ প্রতি মেট্রিক টনে ১০০ টাকা, কনটেইনার স্ক্যানিং ফি প্রতি কনটেইনার ২৫৪ টাকা। এ ছাড়া ইলেকট্রিক লক অ্যান্ড সিল ফি রয়েছে আর তা চালু হলে এসকর্ট ফি বাতিল হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় কর্তৃক সড়ক ব্যবহার মাশুল টোলসহ এসব চার্জের ওপর মূল্য সংযোজন কর রয়েছে ১৫ শতাংশ।