আ.লীগের দেখা দেখানোর মিশন

বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও গাজীপুর এ পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য এবারও গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে আগেই গত দুবার এ পাঁচ সিটির নির্বাচন হয়েছে। এবারও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন, জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করার চাপ আছে দেশের ভেতর ও বিদেশিদের কাছ থেকে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা তাই সংসদ নির্বাচনের আগে নিজেদের শক্তি পরখ করার পাশাপাশি এটা দেখাতে চান যে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়। আর তাই বিএনপির নিরপেক্ষ সরকারের দাবি অযৌক্তিক।

সরকারবিরোধী মাঠের সবচেয়ে বড় দল বিএনপি গত আগস্ট থেকে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। গত ডিসেম্বরে দলটির সাত সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেন।

এর আগে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে বিএনপির আন্দোলনের মধ্যে ২০১৩ সালে দলের শক্তির ওপর নির্ভর করে ওই পাঁচ সিটির নির্বাচন করতে গিয়ে পরাজিত হয় আওয়ামী লীগ। ওই সময় দলের শক্তি পরীক্ষার পাশাপাশি দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব তা দেশি-বিদেশিদের দেখাতে সক্ষম হয়েছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু বিএনপি ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আসেনি।

এরপর ২০১৮ সালে এসে দেখা ও দেখানোর পথে হাঁটেনি ক্ষমতাসীনরা। সিলেট ছাড়া চার সিটিতেই নৌকার প্রার্থী মেয়র নির্বাচিত হন। জাতীয় নির্বাচনের কৌশলও বদলে যায়, যদিও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। পরে দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না দাবি করে সব ধরনের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের চারজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে এবারের পাঁচ সিটি নির্বাচনে ২০১৩ সালের কৌশলে করবেন তারা। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনেই হবে এমন অনড় অবস্থানের কারণে দেখা ও দেখানোর পথে হাঁটতে যাচ্ছে সরকার। কারণ, দলের শক্তির ওপর আরেকবার আস্থা রাখতে চান দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা সম্ভব সেটাও প্রমাণ করতে চান তিনি। তাই পাঁচ সিটি নির্বাচন নিয়ে শেখ হাসিনা দেখা ও দেখানোর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। এ জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে জেতার মতো প্রার্থীকে।

তবে দলের অভ্যন্তরে ছোট একটি অংশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেখা ও দেখানোর নীতিতে চললে এবং পরাজয়ের মতো ঘটনা ঘটলে জাতীয় নির্বাচনের আগে সারা দেশের নেতাকর্মীদের মনোবলে চিড় ধরাবে। সরকারবিরোধী মহল আরও বেশি চাঙ্গা হয়ে উঠবে। এ সরকারের গ্রহণযোগ্যতা নেই, বিরোধী মহলের এমন প্রচার আরও গতি পাবে। সব মিলিয়ে বেকায়দায় পড়তে হবে আওয়ামী লীগ ও সরকারকে। এ ভাবনা থাকলেও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে দেখা ও দেখানোর বিকল্প ভাবনা নেই ক্ষমতাসীনদের।

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৫ মে গাজীপুর, ১২ জুন খুলনা ও বরিশাল এবং ২১ জুন রাজশাহী ও সিলেটের নির্বাচন হবে।

দেশের রাজনীতিতে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও আস্থার সংকট দীর্ঘদিনের। একেবারেই প্রশ্নহীন জাতীয় নির্বাচনের স্বীকৃতি কোনো রাজনৈতিক দলই কখনো দেয়নি। ফলে জাতীয় নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলে একটি অগণতান্ত্রিক সরকার একাধিকবার নির্বাচন পরিচালনা করেছে। সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নবম সংসদ নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলুপ্ত করে উচ্চ আদালত। ফলে দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় দলীয় সরকারের অধীনেই।

সর্বশেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনের পরে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চরম আকারে আস্থার সংকট সৃষ্টি করে। সেখান থেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে যাবে না ঘোষণা দিয়েছে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি। সেই সঙ্গে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করে রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে সাবেক বিরোধী দল বিএনপিসহ একাধিক দল ও সংগঠন।

এরই মধ্যে পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অন্যদিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগসহ তাদের সমমনা দলগুলো সিটি নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপি তাদের দাবি আদায়ে বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও গাজীপুর সিটির নির্বাচন বয়কট করছে। তবে পাঁচ সিটিতেই ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিততে হচ্ছে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থীদের।

অপেক্ষাকৃত কম ও ছোট শক্তির রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সিটি নির্বাচনে দেখা ও দেখানোর সুযোগ এসেছে আওয়ামী লীগের হাতে। নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি বাড়ানোও সম্ভব হবে। ক্ষমতাসীন দলের একাংশ মনে করে, শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেহেতু নেই, সে ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা যাচাই করা যেতে পারে। তাতে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব তার নজির সৃষ্টি হবে। যা দেশে-বিদেশে বিষয়টি তুলে ধরা যাবে। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে বিএনপির নির্বাচনের দাবি বিদেশিদের কাছে গুরুত্বহীন হবে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতি যে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তার বিপক্ষে কথা বলার সুযোগ থাকবে সরকারি দলের।

যেনতেনভাবে পাঁচ সিটিতে জিতে আসার বিপক্ষে থাকা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে সিটি নির্বাচন সরকারের জন্য ‘টেস্ট কেস’ ধরে এগোনোই ভালো হবে। এখানে কোনো ধরনের বিতর্ক উঠলে নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে বিএনপিসহ বিদেশিদের সরকারের ওপর চাপ আরও বেড়ে যাবে। সেই সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না। তাই পাঁচ সিটি নির্বাচনে যেকোনো মূল্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করার নীতি অনুসরণ করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে দেশের জন্য ক্ষতি, গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতি এবং আমাদের জন্যও ক্ষতি। তাই আমরা সবসময় চেষ্টা করি যাতে কোনো নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি না হয়।’ ভোট সুষ্ঠু হওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনও ব্যবস্থা নেবে বলে মনে করেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সবসময় নির্বাচনকে গুরুত্বসহকারে দেখে বলে জানান দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলো আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব। মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং পছন্দের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার চেষ্টা করেছে মনোনয়ন বোর্ড। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা মাথায় রেখেই প্রার্থী বেছে নেওয়া হয়েছে।’

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সিটি নির্বাচন সর্বতোভাবে বিতর্ক মুক্ত রাখার চেষ্টা করবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কে হারবে, কে জিতবে তা মাথায় না রেখে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয় তার প্রমাণ রাখতে ও নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কমুক্ত রাখার ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাঁচ সিটির ভোটে জেতা-হারা নিয়ে গুরুত্ব না দিতে নির্দেশনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন দলটির সভাপতিম-লীর গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা। আওয়ামী লীগ সভাপতি জাতীয় নির্বাচনের আগে দলের শক্তির ব্যাপারে পরিষ্কার হতে চান জানিয়ে সভাপতিম-লীর ওই সদস্য আরও বলেন, ‘অসাংবিধানিক সরকারের হাতে নির্বাচন পরিচালনা করার ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার দাবি অযৌক্তিক।’