কেমন বাজেট চাই

The pessimist sees, difficulty in every opportunity. The optimist sees the opportunity in every difficulty. - Winston churchill

অনুমান করি ২০২৪ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ পুরোদমে চলছে । সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষত বাজেট তৈরির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থ মন্ত্রণালয় আরামের ঘুম হারাম করে  বাজেট ঘষামাজা  নিয়ে ব্যাস্ত। মাননীয় অর্থমন্ত্রী প্রাক-বাজেট আলোচনায় লিপ্ত; শুনছেন নানা গোষ্ঠীর প্রত্যাশার কথা,  টুকে নিচ্ছেন সমাজবিজ্ঞানী আর অর্থনীতিবিদদের অভিমত। মনে করা হচ্ছে যে, প্রধান তিনটি বিষয় বাজেট সংক্রান্ত ভাবনায় ওপরে থাকবে আইএমএফের শর্ত, অব্যাহত উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আগামী বছরের জাতীয় নির্বাচন। সুতরাং, কম মূল্যস্ফীতির মুখে বেশি জিডিপি অর্জন হবে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য।

বিভিন্ন সূত্র বলছে, সম্ভবত এবারের বাজেটের আকার সাড়ে সাত কোটি লাখ টাকা। গেল অর্থবছরের প্রায় সাত লাখ কোটি টাকার বিপরীতে; বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় বরাদ্দ ২.৬৫ লাখ কোটি; মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৬ শতাংশ এবং রাজস্ব লক্ষ্য চার দশমিক ছিয়াশি লাখ কোটি টাকা এবং প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির হার সাত শতাংশের ওপর। আগেও বলেছি, এই সংখ্যাগুলো প্রাথমিক এবং পরিবর্তন হতে পারে ক্ষেত্রবিশেষে।

দুই

অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, নীতিনির্ধারকদের কপালে ভাঁজ ফেলার মতো সাতটি চিন্তা চোখের সামনে উপস্থিত: (ক) সর্ব্বোচ্চ জিডিপি অর্জন করতে সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করা; (খ) আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা; (গ) সামাজিক সুরক্ষা জাল বিস্তৃত করে দরিদ্র ও হতদরিদ্রের মুখে খাবার তুলে দেওয়া এবং (ঘ) বিশ্ববাজার বিবেচনায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কৃষির ওপর ভর্তুকি প্রদান। এর সঙ্গে সার ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি, মানব সম্পদের উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির চিন্তা তো থাকছেই। সবশেষে, আইএমএফের শর্তগুলোর বাস্তবায়ন উদ্বেগের অন্যতম উৎস হিসেবে থাকছে।

তিন

কেমন বাজেট চাই?

প্রথম কথা, কৃষিতে যেন ভর্তুকি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রণোদনা অব্যাহত থাকে। বাংলদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের ভূমিকা বাড়ছে না কমছে এ নিয়ে বিতর্ক আছে, হয়তো থাকবে। এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে কোন কোণ থেকে আমরা বিষয়টা দেখছি। মোট জাতীয় আয়ে এর পড়ন্ত অবদান, ধরা যাক সত্তরের দশকের প্রায় অর্ধেক থেকে বর্তমানে এগারো শতাংশ ছুঁইছুঁই। সুতরাং, যারা বলছেন কৃষির ক্রমহ্রাসমান কৃতিত্বের কথা তারা সঠিক বলছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ যে এখনো প্রধানত কৃষিপ্রধান দেশ মোট শ্রমশক্তির ৪০ ভাগ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত, দেশের কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দারিদ্র্য নিরসনে কৃষি খাতের অবদান এখনো অবিচল, সেটা প্রমাণ করে যে কৃষি খাতের ভূমিকা কোনোভাবেই খাটো করে দেখবার নয়।

প্রসঙ্গত জানান দেওয়া দরকার যে, সম্পদের শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখনই কৃষি খাতের উন্নয়নে মনোযোগী হয়েছে। আর যখন বিরোধী দলে থাকতে হয়েছে, তারা কৃষিবান্ধব পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।  আরও বলে রাখা দরকার, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার কৃষি উন্নয়নে যে সমস্ত বৈপ্লবিক পদক্ষেপ প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল, বাংলাদেশের অন্য কোনো সরকার তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি। তবে স্বীকার করতে হয় তার ধারাবাহিকতায় এবং পরিবর্তিত অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শেখ হাসিনার সরকার আপ্রাণ প্রচেষ্টা করেছে কৃষিবান্ধব নীতিমালা পরিগ্রহণে।

দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন পরিকল্পনার নামে প্রকল্প চাই না যার সঙ্গে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনা এবং অর্থের অপচয় জড়িত। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয় এমন প্রকল্প থাকা ঠিক হবে না। যত সম্ভব অন্তত এই বাজেটে উন্নয়ন প্রকল্পের আকার যেন ছোট থাকে; দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এমনিতেই নাজুক, এমন অবস্থায় না নিলে নয় এমন প্রকল্প যেন গ্রহণ করা হয় যা অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক প্রকল্প যেন পরিহার করা হয়। প্রসঙ্গত,  চলমান বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ পরিস্থিতি এবং সার্বিকভাবে বিশ্ব পরিস্থিতি মাথায় রেখে কিছু মেগা প্রকল্প কাটছাঁট করার পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার এখন তুলনীয় দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ভালো এমনকি ছয় শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রশংসনীয় এবং পূজনীয়। যেমন গেল অর্থবছরে হিসাবকৃত ছয় দশমিক তিন শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের দাবি যদিও সমালোচিত, তবু কম গর্বের নয়, বিশেষ করে চলমান বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনা করে। সামস্তিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে অপেক্ষাকৃত কম প্রবৃদ্ধিও দীর্ঘ মেয়াদে সুফল বয়ে আনতে পারে। এই বাজেটে পরিষ্কারভাবে জানতে চাইব চার দশমিক সাত বিলিয়ন ডলারের ঋণের সঙ্গে যুক্ত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি।

এবারের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ যেন না থাকে। প্রথমত, এ কাজটি নৈতিক নয়। কারণ এক অর্থে অবৈধ অর্থ বৈধ করা মানে অবৈধতাকে পুরস্কৃত করা। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই ঘোষণা গেল একুশ বছরে খুব একটা সস্তিদায়ক পরিমাণ সরকারি কোষাগারে টানতে পেরেছে বলে হিসাব পাচ্ছি না। তা হলে আম এবং ছালা দুটো হারিয়ে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে থাকার মানে কী?

অর্থমন্ত্রীর বাজেট ভাষণে আমরা শুনতে চাই ঋণখেলাপিদের নিয়ে তার সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা, টাকা পাচার এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে এ যাবৎ কীভাবে এবং কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সে সম্পর্কেও জাতি জানতে আগ্রহী। বস্তুত এই দুই গোষ্ঠীকে কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে সমাজে বৈষম্য কমবে না, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না।

এই বাজেটে আমরা ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের, বিশেষত নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা চাই, চাই ঋণে তাদের প্রবেশগম্যতা; আশা করি দেশজ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো সুরক্ষা পাবে।

চার

সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য বলি, মাননীয় অর্থমন্ত্রী আ হ ম  মুস্তফা কামাল এমপি দায়িত্বভার নেওয়ার পর থেকে যে বাজেট পেশ করে আসছেন, তা বিশ্বব্যাপী ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে। স্বাভাবিক বছর পেয়েছেন খুব কম, কিন্তু তারপরও কৃতিত্বের সঙ্গেই হালটা তার হাতে রয়েছে। এবার তাকে বেশ কিছু অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে এবং সেগুলো নিম্নরূপ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে বিপুল সম্পদ আহরণ, মোট ভর্তুকি বৃদ্ধি সম্ভবত ৮২০ বিলিয়ন টাকা থেকে এক ট্রিলিয়ন টাকা, মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থের অপচয় বন্ধ, বিনিময় হারের ওঠানামা বন্ধ করা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যস্ফীতিকে ছয় শতাংশের মধ্যে বেঁধে রাখা।

পরিশেষে, এমন বাজেট চাই যে বাজেটে নেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপের সুফল এদেশের আপামর জনসাধারণের বিশেষত মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট দরিদ্র মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটে। মনে রাখতে হবে যে চ্যালেঞ্জের অপর নাম সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জকে ভয় না করে সুযোগ হিসেবে সামনের দিকে পথ চলাই হবে সমীচীন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা/ বিপদে আমি না যেন করি ভয়/ দুঃখ তাপে ব্যথিত চিতে নাই-বা দিলে সান্ত¡না/ দুঃখে যেন করিতে পারি জয়।

লেখকঃ অর্থনীতিবিদ। সাবেক উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

abdulbayes@yahoo.com