ভয়ংকর ভ্রাম্যমাণ অপরাধী

পোশাকে ফিটফাট। গলায় ঝোলানো সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তার পরিচয়পত্র। ঘোরাফেরা করেন বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের সামনে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা পরিষদ থেকে সরকারি ত্রাণের কম্বল ও শীতবস্ত্র আনার কথা বলে ভাড়া করেন অটোরিকশা। তারপর চালকের সঙ্গে সখ্য গড়ে সুবিধামতো স্থানে নিয়ে পানীয়সহ বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে খেতে দেন।  চালক অচেতন হতে থাকলে যাত্রীবেশে থাকা দুজন দ্রুত সটকে পড়েন। আর আগে থেকেই ওঁৎ পেতে থাকা চক্রের অপর সদস্যরা অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যান। এ সময় চালক বাধা দিলে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হয় রাস্তার পাশের ঝোপঝাড়ে। কোনো এলাকা থেকে একটি অটোরিকশা চুরির পর ওই এলাকা ছেড়ে চলে যান অন্য এলাকায়, বদলে ফেলেন নাম-পরিচয়।

জয়পুরহাটের কালাই থানায় অটোরিকশা চালক কোব্বাদ আকন্দের করা এক মামলার তদন্ত শেষে আদালতে জমা দেওয়া চার্জশিট (অভিযোগপত্র) ও তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। গত সোমবার জয়পুরহাট চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) জয়পুরহাট জেলা ইউনিট। চক্রে পাঁচ সদস্য গ্রেপ্তার হলেও হোতা সুরুজ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

জানা গেছে, চক্রের হোতা মো. আবু হায়াত ওরফে সুরুজ ওরফে রেজাউল (৩৫) বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন নামে বিয়ে করে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী নেটওয়ার্ক।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, টানা পাঁচ বছর অসংখ্য অটোরিকশা চুরি-ছিনতাই করলেও পুলিশের খাতায় তাদের কোনো নাম নেই। রাজশাহী ও রংপুর ছাড়াও কুষ্টিয়া, মেহেরপুরে ঘুরে ঘুরে অটোরিকশা চুরি করলেও একেবারেই ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল চক্রটি।  কালাই থানা এলাকায় সম্প্রতি চার থেকে পাঁচটি অটোরিকশা চুরি-ছিনতাইয়ের পর দুই চালককে জবাই করে হত্যাও করেছে। অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে গুরুতর জখম করে ঝোপঝাড়ে ফেলে দেয় ভয়ংকর এই চক্র। গ্রেপ্তারকৃতরা অন্যান্য ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না তদন্ত করা হচ্ছে।

সিআইডির গণমাধ্যম শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজাদ রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত দুই বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।’  

চক্রের গ্রেপ্তাররা হলেন পারুল বেগম (২১), মো. গোলজার হোসেন ওরফে হায়দার (৪২), মো. রাজু মিয়া (৪৪), মো. শফিকুল ইসলাম করিম (৪৫) ও মো. আ. জব্বার (৫০)। তাদের দেওয়া তথ্য থেকে লালমনিরহাট থেকে ছিনতাই করা অটোরিকশা উদ্ধার করে সিআইডি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ইন্সপেক্টর কে এম মাসুদ রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চক্রের হোতা আবু হায়াত ওরফে সুরুজের বাড়ি বগুড়ার বারপুর। সেখানে তার স্ত্রী-সন্তান ও মা থাকে। এছাড়া রংপুর, লালমনিরহাট, মেহেরপুর, মাগুরায় তিনি অবস্থান করে বিয়ে করেছেন। আমরা এখন পর্যন্ত তার কথিত পাঁচ স্ত্রীর তথ্য পেয়েছি। তবে সুরুজকে গ্রেপ্তার করতে পারিনি। তিনি ভয়ংকর রকমের অপরাধী।’ তিনি বলেন, ‘কালাই থানায় হওয়া মামলার পর দীর্ঘ সময় আমরা কোনো কূলকিনারা পাইনি। কোব্বাদ আকন্দের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া ফোনও বন্ধ ছিল। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার আট মাস পর চক্রের হোতা সুরুজের কথিত তৃতীয় স্ত্রী পারুল বেগমের কাছে ফোনটির সন্ধান পাওয়া যায়। তাকে রংপুরের কাউনিয়া থেকে গ্রেপ্তারের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য পেতে থাকি।’

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ৪ ডিসেম্বর সকালে জয়পুরহাট জেলার কালাই থানাধীন ২ নম্বর জিন্দারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে অটোরিকশা চালক মো. কোব্বাদ আকন্দ (৫৫) যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় দুজন ব্যক্তি ইউনিয়ন পরিষদের ভেতর থেকে বের হয়ে আসেন এবং নিজেদের সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে অটোরিকশাটি এক হাজার টাকায় ভাড়া করেন। ত্রাণের কম্বল ও শীতবস্ত্র আনার জন্য গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় যাবেন বলে জানান। পথে দুই যাত্রী কোব্বাদ আকন্দকে কালাই উপজেলা সংলগ্ন রাস্তার পাশে একটি হোটেলে নাস্তা করান এবং পান খাওয়ার অনুরোধ করে ১টি খিলিপান বের করে দেন। পান খেয়ে রিকশা চালানো শুরু করে কিছুদূর গেলেই কোব্বাদ আকন্দ বুঝতে পারেন তার শরীর ক্রমশ নিস্তেজ হচ্ছে ও বোধশক্তি লোপ পাচ্ছে। এ সময় ওই দুই যাত্রী রিকশা থামিয়ে নেমে পড়েন। অপর দুইজন এসে রিকশা নিয়ে চলে যান। এ সময় কোব্বাদ আকন্দ সাহায্যের জন্য ফোন করার চেষ্টা করলে তার ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাকে হুমকি দিয়ে বলা হয়, আজ শুধু মাল হারালি, কিন্তু জীবনে বেঁচে গেলি। পরে বাড়াবাড়ি করলে জানে শেষ করে লাশ গুম করে ফেলব। এরপর কোব্বাদ আকন্দ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। বেশ কিছুদিন স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন তিনি। এ ঘটনায় ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি কালাই থানায় মামলা করেন কোব্বাদ আকন্দ। ওই সময়ই মামলাটির তদন্তভার সিআইডি গ্রহণ করে।