ধ্রুবকে নিয়ে কিছু লিখতে যাওয়া আমার জন্য খুব কঠিন কাজ। সেই ১৯৮৬ সাল থেকে ধ্রুব’র সঙ্গে পরিচয়। বাংলা একাডেমি বইমেলায়। ধ্রুব তখন শাহনেওয়াজ হলের বাসিন্দা। ভর্তি হয়েছে আর্ট ইনস্টিটিউটে। থাকে হলের নিচতলায় ৩ নম্বর কক্ষে। হলের সামনে প্রশস্ত খালি জায়গা। রুমের সামনে লম্বা করিডর। সামনে কেয়া গাছের ঝোপ। বাঁয়ে নিউ মার্কেটের বর্ধিত অংশ। একটু হাঁটলেই নীলক্ষেত। ছবির মতো সব মনে পড়ে। ধ্রুব’র রুমে অনেক আড্ডা দিয়েছি। দুপুরে ঘুমিয়েছি। সকালের নাস্তা করেছি। আহারে, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন যৌবনের আনন্দময় দিন। ধ্রুব কথা কম বলত। শুনত অনেক বেশি। আড্ডায় আমি অনর্গল বকবক করে যাই। ধ্রুব বিছানায় হাঁটু মুড়ে বসে সেসব শোনে। ধ্রুব চিত্রশিল্পী। আজ প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবেও দুই বাংলায় খ্যাতিমান। আমার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় ধ্রুবর সঙ্গে লেখক হিসেবে। অন্তরঙ্গতা জমে ওঠে শিশুসাহিত্যের মগ্ন পাঠক হিসেবে। আমি যে বইয়ের কথাই বলি না কেন, দেখা যায় ধ্রুবরও সেই বই পড়া। সুদূর সুনামগঞ্জে বেড়ে ওঠা ধ্রুব এত সব বই পেল কোথায়? ধ্রুব মিষ্টি হেসে বলত, আমরা সপ্তাহে একদিন সিলেট যেতাম বই কিনতে। এছাড়া সুনামগঞ্জের সরকারি পাঠাগারে ছিল সমৃদ্ধ সংগ্রহ। ধ্রুব বলত, ওর মা খুব বই পড়তেন। বই পড়ার আগ্রহটা ধ্রুব পেয়েছিল মায়ের কাছ থেকে। আমাদের বন্ধুত্ব সম্পর্কের ছত্রিশ বছরে খুব কম সংখ্যক বইয়ের কথা বলে আমি ধ্রুবকে চমকে দিতে পেরেছি। কারণ আমার অধিকাংশ পঠিত প্রিয় বই ধ্রুবরও পড়া। শিশুসাহিত্যের মনোযোগী পাঠক হিসেবে আমি বারবার ধ্রুব’র কাছে হেরে গেছি। ধ্রুব সবসময় আপডেট। একসময় ধ্রুব নিয়মিতভাবে পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখত। ছড়া কবিতাও প্রচুর লিখত। ধ্রুব ছোটদের জন্য প্রচুর নিরীক্ষাধর্মী গল্প-উপন্যাস লিখেছে। এখনো প্রতি বছর দু চারটে বই ধ্রুবর নিজের প্রকাশিত হয়। লেখক ধ্রুব এষ আরেক বিস্ময়। তার প্রতিভার কোনো মূল্যায়ন হয়নি এখনো। তার লেখক সত্তা এখনো অনালোকিত। সে আলোচনা অন্যত্র হবে।
ধ্রুবর একটা বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করতেই হবে। প্রায় ৮০ ভাগ বাংলা শিশুসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য বই ধ্রুব চাক্ষুষ দেখেছে। পড়েছে। মর্মে নিয়েছে। বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণে বিবর্তনের ইতিহাস ধ্রুব খুব ভালো মতো জানে। সুকুমার রায়, দক্ষিণারঞ্জনমিত্র মজুমদার থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায়, সমীর সরকার হয়ে কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী, আফজাল হোসেন তার প্রিয় গ্রন্থচিত্রী। তবে ধ্রুব অন্ধভক্ত সত্যজিৎ রায়ের। রায়ের ড্রইং ডিজাইনের দক্ষতা এবং টাইফোগ্রাফির বিস্ময়কর ভক্ত আমাদের ধ্রুব এষ। ধ্রুব জানে বাংলা মুদ্রণের ধারাবাহিক ইতিহাস। হাফটোন যুগ পার হয়ে ব্লক যুগ, তারপর অফসেট যুগ। যুগের পরম্পরায় কীভাবে প্রচ্ছদ শিল্প পরিবর্তিত হয়েছে সে সম্পর্কে বিস্তর ধারণা আছে ধ্রুব’র। দেব সাহিত্য কুটিরের আদি প্রকাশনা, মৌচাক, শিশুসাথী, রং মশাল পত্রিকার বিবর্তন, ত্রিশের লেখকদের শিশুসাহিত্য পঞ্চাশ দশকে শিশুসাহিত্যের ব্যাপক পরিবর্তন ধ্রুবর চোখের সামনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। অনূদিত রুশ ও আমেরিকান শিশুসাহিত্য ধ্রুবকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। তাই ধ্রুবর প্রচ্ছদে আইডিয়ার নিত্যনতুন সমাহার দেখতে পাই। তার প্রচ্ছদের জগৎ অনেক বিপুল ও বিস্তারিত। কখনো পেইন্টিং, কখনো ডিজাইন, কখনো টাইফোগ্রাফি দিয়ে ধ্রুব ম্যাজিক নির্মাণ করে। সাদা চোখে আমরা তার পুরোটা বুঝতে পারি না। কেবল বিস্ময়ের মুখোমুখি নিজেকে স্থাপন করি। ধ্রুবর সৃজনশীলতার অনেক আন্তর্জাতিকমানের উজ্জ্বল উদাহরণ আমাদের চোখের সামনে আছে। সে আলোচনা অন্যত্র হবে।
বাংলা গ্রন্থচিত্রের ইতিহাস মাত্র দেড়শো বছরের অধিককাল। আধুনিকতার স্পর্শ প্রথম পাওয়া যায় সিগনেট প্রেস প্রকাশিত সত্যজিৎ রায়ের আঁকা বইয়ের প্রচ্ছদগুলো। অবিশ্বাস্য সব প্রচ্ছদ এঁকেছেন সত্যজিৎ রায়। প্রচ্ছদের নান্দনিকতায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সমগ্র বইয়ের চরিত্র মাধুর্য। প্রচ্ছদ যে একটা স্বকীয় মাধ্যম সেটা প্রথম প্রথম পরিস্ফুট হয় রায়ের হাতে। গ্রন্থচিত্রণও আরেক ধরনের আর্ট ওয়ার্ক হয়ে ওঠে। কেবল বইয়ের ঘটনা ও চরিত্রের ছবি রূপায়ণ করাই গ্রন্থচিত্রীর কাজ নয়। প্রচ্ছদ ও অলংকরণে তৃতীয়মাত্রা সংযুক্ত করতে হয়। সত্যজিৎ রায় সেক্ষেত্রে সফলতম ব্যক্তিত্ব। রায়ের পর খালেদ চৌধুরী, সমীর সরকার এবং পূর্ণেন্দু পত্রীর কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। পূর্ণেন্দু পত্রী নানা ধরনের কাজ করেছেন। তবে কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ রচনায় তিনি অবিশ্বাস্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।
আমাদের দেশে কামরুল হাসানের হাত ধরেই প্রচ্ছদ শিল্পের যাত্রা। তিনি যত বড় মাপের সৃষ্টিশীল পেইন্টার তত বড় বুক কভার ডিজাইনার। কামরুল হাসানের শিল্পীকৃতি এখনো যথাযথ মূল্যায়িত হয়নি। তিনি টাইপ, রং ও ডিজাইনের মধ্যে বহুমাত্রিকতা নির্মাণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ক বইয়ের প্রচ্ছদ অঙ্কনে তার সাফল্য গগণচুম্বী। মুক্তিযুদ্ধের ছবি এঁকে তিনি অমর হয়ে আছেন। মুক্তিযুদ্ধ যে গণমানুষের যুদ্ধ তিনি ছক এঁকে সেটাই প্রমাণ করেছেন। মাথায় ছেঁড়া গামছা বাঁধা, হাঁটু পর্যন্ত লুঙ্গি, খালি পা, হাতে রাইফেল মুক্তিযুদ্ধের এই যে শ্বাশত ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার নির্মাতা কাইয়ুম চৌধুরী স্বয়ং। একজন শিল্পীই পারেন এমন সব সৃষ্টিকর্ম তৈরি করতে। কাইয়ুম চৌধুরী অতি আধুনিক প্রচ্ছদ শিল্পী। তিনি প্রযুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে প্রচ্ছদ শিল্পে যুগান্তর এনেছেন। যে কোনো দেশের শিল্পীগুরুদের মধ্যে তিনি শক্ত অবস্থানে থাকবেন। তিনি প্রায় একক শক্তিমত্তায় আমাদের ম্রিয়মাণ অপেশাদার প্রকাশনা শিল্পকে আধুনিক করে তোলেন। তার পথ ধরে নবযুগের সূচনা হয়।
হাশেম খান, রফিকুন নবী, কাজী হাসান হাবীব, কালাম মাহমুদ, দেবদাস চক্রবর্তী, বীরেন সোম, আফজাল হোসেন, সবিহউল আলম, মুস্তফা মনোয়ার, আবুল র্বাক আলভী, মুকতাদির, সৈয়দ ইকবাল, খালিদ হোসেন প্রমুখের শিল্প সাফল্য আমাদের প্রচ্ছদ শিল্পে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এই ধারাবাহিকতায় ধ্রুব এষের আবির্ভাব। সে প্রায় একক কৃতিত্ব ও পরিশ্রমে আমাদের প্রচ্ছদ শিল্পকে প্রযুক্তির সঙ্গে মিশ্রিত করে আধুনিক যুগে প্রবেশ করে। আমি অনেক সময় ভাবি যে, ধ্রুবর আগমন না হলে আমাদের বইমেলা ও প্রকাশনা শিল্প এত দ্রুত বিস্তার লাভ করত কি?
খুব গুরুতর প্রশ্ন। উত্তরও জানা আছে। ধ্রুবর আগমনেই আমাদের প্রচ্ছদ শিল্প দ্রুত বিস্তারিত হয়। অনুমান করি ধ্রুব বছরে প্রায় হাজার পাঁচেক প্রচ্ছদ আঁকে। এর বাইরেও আছে পোস্টার, লিফলেট, কার্ড, ক্যাটালগ কতকিছুর ডিজাইন। ধ্রুব এষ গত ত্রিশ বছর ধরে প্রায় একা ক্লান্তিহীন বাংলা বইয়ের জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে। তার অবদান ও মূল্যায়ন করার মতো যথেষ্ট যোগ্যতা ও ক্ষমতা আমাদের নেই।
ধ্রুব এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ প্রচ্ছদ এঁকেছে? সেই হিসাব হয়তো ধ্রুবর কাছেও নেই। প্রায় ৫০ হাজারের অধিক প্রচ্ছদ তো হবেই। প্রতি বছরই কয়েক হাজার প্রচ্ছদ সে এঁকে থাকে। প্রচ্ছদ অঙ্কনই তার পেশা ও নেশা। অন্য কোনো পেশাদার চাকরি সে করেনি। কখনো হয়তো কোনো পত্রিকায় প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে যোগ দিয়েছে। হয়তো কিছুদিন নিয়মিত অনিয়মিত কাজ করেছে। চাকরি ছেড়ে দিতে ধ্রুব কখনো দ্বিধাগ্রস্ত হয়নি। ধ্রুব জীবনযাপন করে নিজের ইচ্ছেমতো। কেউ তাকে কখনো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। সে সন্ত মানুষ। নিজের জগতে বসবাস করে। নিজের ইচ্ছে ও খুশিমতো চলাফেরা করে। যা ভালো লাগে তাই করে। প্রচ্ছদও সে তৈরি করে খেয়ালের বশে। হওয়ার কথা ছিল পেইন্টার। ধ্রুব যদি পেইন্টিং-এ নিজেকে সমর্পিত করত তাহলে আমি নিশ্চিত যে সে হতো উপমহাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ চিত্রকর। তার সৃজনশীল সহজাত ক্ষমতার মাধ্যমে সে পেইন্টিং-এ নতুন মাত্রা যোগ করত। আধুনিক জীবনযাপনের যন্ত্রণাকে সে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে। যুগের সংকটকে সে ধারণ করে নীলকণ্ঠের মতো বেঁচে থাকে।
প্রচ্ছদ নির্মাণেও ধ্রুব তার যুগকে ধারণ করেছে। কখনো কখনো যুগকে অতিক্রম করেছে। তাই তার প্রচ্ছদ হয়ে ওঠে বিমূর্ত ও আধুনিকতম। ধ্রুবর বৈচিত্র্যের কোনো শেষ নেই। কথাচ্ছলে ধ্রুব একদিন জানাল লাখ লাখ কাভারের আইডিয়া মাথার মধ্যে খেলতে থাকে। সেই আইডিয়াসমূহ বাস্তবের আলো-আঁধারিতে এখনো উঁকি দেয়নি। ইমপ্রেশনিস্ট, অ্যাবস্ট্রাক্ট, সুররিয়ালিস্টিক নানা ইজমের ফ্রেমে সে প্রচ্ছদ করেছে। হাজার হাজার সুররিয়ালিস্টিক চিন্তা ধ্রুবর মাথায় প্রতি মুহূর্তে খেলা করে। তাই দেখা যায় বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় প্রচ্ছদের নিপুণ স্রষ্টা সে। সেই বিরল চিত্রশিল্পী যে একই সঙ্গে বয়স্কজন পাঠ্য ও শিশুকিশোর গ্রন্থচিত্রণে সমান দক্ষতা প্রদর্শন করেছে। তার নিজস্ব স্টাইল যা সর্বজনগ্রাহ্য হয়েছে তা আমাদের রুচি নির্মাণে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।
সে অবশ্য বড়মাপের শিল্পী বলেই তার প্রচ্ছদও একেকটা আর্ট কর্ম। তার প্রতিটা প্রচ্ছদই আর্ট ওয়ার্ক। প্রচ্ছদকে চিত্রশিল্পের ব্যঞ্জনায় প্রকাশে সে মূর্ত করে তোলে। তাই আমি মনে করি ধ্রুব আসলে প্রচ্ছদ আঁকে না। পেইন্টিং নির্মাণ করে। তাই দেখা যায় প্রতিটা প্রচ্ছদ সৃজনশীলতায় মুখর। যেন চিত্রকলার উচ্চতর প্রকাশ। এইসব প্রচ্ছদ শুধু বইটিকে মহৎ করে তোলে না একটা শিল্পকর্ম হিসেবেও আমাদের বইটিকে প্রসারিত করে।
ধ্রুবর প্রতিটা প্রচ্ছদ কোনো না কোনোভাবে আমাদের বিস্ময় জাগায়। অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। কয়টা বইয়ের প্রচ্ছদের নাম উল্লেখ করব? সীমাহীন সমুদ্র থেকে দু একটা নুড়ি কুড়ানো যেতে পারে। সমুদ্র সম্ভোগ কিছুতেই সম্ভব নয়।
এবার কিছুটা ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করি। ধ্রুব সিলেটের সুনামগঞ্জের ছেলে। বিস্তীর্ণ হাওর, মুক্ত আকাশ, বর্ষায় চন্দ্রভূক জোছনা, মেঘ পাহাড় এসব তার শৈশবের দৃশ্যপট। জন্মগতভাবেই ধ্রুব প্রকৃতি সংলগ্ন সন্ন্যাসী। শরতের মেঘ, বর্ষার ঝুম বৃষ্টি, মেঘলা আকাশ, শীতের জবুথবু বসন্তের উড়ু উড়ু বাতাস ধ্রুবকে আচ্ছন্ন করে রাখে। নিজের ভেতরে গুটিয়ে রাখা গোপন মানুষটি একেবারেই অন্যরকম।
বইয়ের ব্যাপারে তার মা তাকে আগ্রহী করেছেন ছোটবেলায়। মা বই পড়তেন। পুত্রও সেই সৎ গুণাবলি অর্জন করেছে। ধ্রুবর বাবাও এক অসম্ভব নাটকীয় চরিত্র। তিনি লেখালেখি করেননি। কিন্তু শিল্পীসুলভ জীবনযাপন করেছেন। স্বদেশি আন্দোলনে, ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি আরও গভীর আত্মমগ্ন ব্যক্তি। ধ্রুবর চরিত্রের নিজস্বতা হয়তো তার বাবার কাছ থেকে প্রাপ্ত।
ধ্রুবর কিছু বাহ্যিক দ্রষ্টব্য ঢাকা শহরের প্রায় সবাই জানেন। সে স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে ঘরে ও বাইরে। ছিন্ন জিন্সের প্যান্ট আর সঙ্গে সাধারণ টি-শার্ট। বন্ধুবান্ধব নিয়ে থাকতে পছন্দ করে। সবসময় তার সঙ্গে দুচারজন সঙ্গী থাকেন। ভালো খাবারের প্রতি ধ্রুবর আকর্ষণ আছে। বিশেষ করে মাছ আর ভাত। চিতল, বোয়াল এসব রান্না ধ্রুবকে টানে। ধ্রুবর কোনো পোশাকি সচেতনতা নেই। অতি সাধারণ। ভুনা গরুর মাংস তার প্রিয় খুব। বাঙালির রসনা তৃপ্ত হয় মিষ্টান্ন দ্রব্যে। সন্দেশ, প্যাড়া সন্দেশ এসব তাই খুবই পছন্দের তালিকায়। প্রতি ঘণ্টায় তিন কাপ লাল চা খাওয়ার অভ্যাস। রং চা। সময় সুযোগ পেলে নিজেই চা-টা বানিয়ে নেয়। যানজটের শহরে ঘুরতে খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। ভিড় এড়িয়ে চলে। বইমেলায় কোনো অনুষ্ঠান, কোনো ভিড় সে দেখলেই কাজের অজুহাত দেখিয়ে সরে যাবে। মাইক্রোফোনে জীবনে কোনোদিন কথা বলেনি। বক্তৃতা দেওয়ার ব্যাপারে ভীষণ ভয়। পানাহার করে উন্মত্ত হয় না। আরও স্থির ও সংযত হয়ে যায় তরল পান করে। তার পছন্দের তালিকা স্বল্পসংখ্যক। সবার সঙ্গেই মেলামেশা করে। তবে গভীরে কারও সঙ্গে সহজে স্বাচ্ছন্দ্য হয় না। লাজুক মৃদুভাষী। যে কোনো আড্ডায় সে প্রাণপুরুষ হয়ে ওঠে। উচ্চ হাসিতে মাতোয়ারা। তীব্র রসবোধ। অথবা নিষ্ঠাবান শ্রোতা হিসেবে উপভোগ করে আড্ডার মূলস্রোত। শিল্পের সব বিষয়ে আগ্রহী, বিখ্যাত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত তার ভক্ত। ধ্রুবকে বই উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। আমি, ধ্রুব দুজনেই বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের নির্মিত চলচ্চিত্র একাধিকবার দেখেছি। প্রচন্ড ভক্ত আমরা তার। ধ্রুব দুই বাংলাতেই খুব জনপ্রিয়। সবার পছন্দের চরিত্র। হুমায়ূন আহমেদ ধ্রুবকে আপন ছোটভাইয়ের মতো ভালোবাসতেন। ধ্রুব বিরল সৌভাগ্যবান। সে শিল্পসাহিত্যের সব বিখ্যাত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছে অকাতরে। বলতে দ্বিধা নেই, ধ্রুবর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে এটাও আমাদের সমাজে গুরুত্ব বহন করে। অনেক স্থানে আমি অকারণে মূল্য পেয়েছি ধ্রুবর বন্ধু হওয়ার সুবাদে। ধ্রুব একজন আইকন। বিশাল বড় ব্র্যান্ড। আমাদের প্রকাশনা শিল্পের ক্ষীণ ধারাকে সে প্রায় একক কৃতিত্বে সফল করে তুলেছে। আমাদের প্রকাশনা শিল্প অবশ্যই ধ্রুবর কাছে শতভাগ ঋণী।
বলতে ভুলে গেছি, যেকোনো উৎকৃষ্ট মানের শুঁটকি ধ্রুবর অতি প্রিয়। এছাড়া কাবাব ও নানরুটি। বই পড়ার ব্যাপারে সে সর্বভূক। যে কোনো কিছু পড়তে পারবে। সিরিয়াসধর্মী লেখার পাশাপাশি হালকা গোয়েন্দা বা রম্যলেখাও সে একই আনন্দ নিয়ে পড়ে থাকে। বইয়ের চরিত্র সম্পর্কে তার দুর্দান্ত ধারণা আছে বলেই সে সহজে যে কোনো বইয়ের প্রচ্ছদ নির্মাণ করে ফেলে। নিজে কবি। কবিতা ভালো লেখে। তাই শিল্পের বিমূর্ত জগৎ সে রক্তের মধ্যে উপলব্ধি করে। তার প্রচ্ছদ সবসময় হয়ে ওঠে ভিন্নমাত্রার অনবদ্য রূপায়ণ। ধ্রুবর প্রচ্ছদের বৈশিষ্ট্য, টাইফোগ্রাফি রং ও স্পেসের ব্যবহার, প্রতীকী চিত্র এসব নিয়ে বিপুল গবেষণা হতে পারে। আগামী দিনে ধ্রুব এষের প্রচ্ছদ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হবে। তার প্রচ্ছদের ম্যাজিক বারবার বিমুগ্ধ করবে রসবোদ্ধাদের। সে আলোচনা অন্যত্র।
ধ্রুবকে অনেকে ঋষী, দরবেশ বা সন্ন্যাসী বলে আখ্যায়িত করেন। ঝুঁটি বাঁধা বড় চুল, দীর্ঘ নাসিকা, উজ্জ্বল অক্ষিদ্বয়, ছিপছিপে দীর্ঘ দেহ ধ্রুবকে দেখলেই ভিন্ন জগতের মানুষ বলে মনে হয়। যেন কোনো এক অলৌকিক পাখি। ম্যাজিক রিয়ালিজমের প্রতীক। এই স্বার্থপর, হানাহানি বিক্ষুব্ধ পৃথিবীতে লোভ লালসার ঊর্ধ্বে এক মানুষ সে। খ্যাতি, কেরিয়ার, অর্থ লোভ কিছুই তাকে আকর্ষণ করতে পারে না। এক বিপন্নবোধ তার ভেতরে খেলা করে। ধ্রুবর সুস্বাস্থ্য ও নীরোগ জীবন আমাদের কাম্য। ধ্রুব তোমাকে ভালো থাকতেই হবে। আমাদের প্রকাশনা শিল্পের স্বার্থে।
পুনশ্চ: লেখক ধ্রুব এষও একজন বড়মাপের সাহিত্যিক। বিশেষ করে ছড়া, কবিতা ও ছোটদের গল্প রচনায় সে বারবার চমকে দিয়েছে আমাদের। অসম্ভব সৃজনশীল সে। লেখাতেও সেই সৃজনশীলতার নতুনত্ব উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তার গদ্যভঙ্গি একান্ত তার নিজস্ব। ছোট ছোট বাক্য। সংক্ষিপ্ত ডায়ালগ এবং সুররিয়ালিস্টিক বিমূর্ততা তার লেখনীকে অন্যমাত্রায় নিয়ে যায়। বইপত্রের ছবি আঁকার পাশাপাশি প্রচুর লিখেছে সে। ৫০-এর অধিক গ্রন্থ রচনা করেছে। নিজের ব্যাপারে খুব উদাসীন বলেই ধ্রুবর লেখকসত্তা এখনো বড় ক্যানভাসে আলোকিত হয়নি। শুধু যদি ধ্রুবর লেখাগুলো নিয়ে আমরা ভাবি তাতেও টের পাওয়া যায় যে, সে আমাদের কালের সেরা একজন লেখক। ধ্রুব মনের আনন্দে প্রচুর গানও লিখেছে। আর অবসরে প্রচুর গান শুনে থাকে। সে গানের দেশের মানুষ। হাছন রাজা কিংবা শাহ আবদুল করিমের গান তার মুখস্থ। তার রক্তের মধ্যে সংগীতমাতা প্রবাহিত। ধ্রুব বড় ক্যানভাসে অল্পকিছু পেইন্টিং করেছে। এখন পর্যন্ত তার কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শনী হয়নি। কারও কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহে সেসব পেইন্টিং সংগৃহীত আছে। গ্যালারি চিত্রক দীর্ঘদিন ধরে ধ্রুবর একক প্রদর্শনী করার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করছে। কিন্তু ধ্রুবর সে ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেই।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা খুব প্রয়োজন। ধ্রুব কাজ করে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে। যদি ভালো লাগে তবে অতি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে প্রচ্ছদ প্রস্তুত হয়ে যাবে। এমনও দেখেছি দুতিন ঘণ্টার মধ্যে চাররঙের পুরো বইয়ের ইলাস্ট্রেশন রেডি করে ফেলেছে। এমনও দিন গেছে যে সারা দিনে পঞ্চাশটা বইয়ের প্রচ্ছদ সে নির্মাণ করেছে। অবিশ্বাস্য তার কর্মদক্ষতা। কঠিন কোনো ডিজাইনও সে সহজ উপায়ে সমাধান করে ফেলে। টেকনিকের দিক থেকে ধ্রুব খুবই উন্নতমানের। সে ব্যক্তিগতভাবে নির্ঝঞ্ঝাট ও নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করে। তার প্রচ্ছদ শিল্পের মধ্যেও সেই সহজ মধুরতা আছে। যা আমাদের পহেলা দেখাতেই মনকে আকর্ষণ করে। বইয়ের প্রয়োজনীয়তা আজও ফুরিয়ে যায়নি। তাই অভিনয় ও আকর্ষণ করার জন্য বইকে বিপণনের জন্য সর্বাঙ্গ সুন্দর হওয়া প্রয়োজন। বই সুন্দর হবে লেখার পাশাপাশি শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায়।
ধ্রুবর যেন সোনার হাত। ছোঁয়া পেলেই মরা গাছে ফুল ফোটে। ধ্রুব ভালো থেকো।