কাব্যিক গদ্যের প্রোজ্জ্বল নমুনা

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:২৪ এএম

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনের ট্র্যাজেডি হলো তার জনপ্রিয় টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতারূপে সংগঠক হিসেবে তার সফলতা তার সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্বকে ঢেকে রেখেছে। তার পূর্ব দুই সত্তা সাধারণের এত কাছের বলে এগুলো জনপ্রিয়তার জোরে জোরে চাপা দিয়ে রাখে সাহিত্যিক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের সক্ষমতাকে। আমরাও আমাদের পাঠ সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে তার সাহিত্যিক মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হই।  সায়ীদের ‘উত্তরপ্রজন্ম’ তেমনি এক হতভাগ্য গদ্য সৃষ্টি, যাকে উপলব্ধি করতে গেলেও এক বিস্তর পাঠ প্রয়োজন।

সায়ীদের উত্তরপ্রজন্মের প্রকাশকাল ১৯৯২। এখানে মোট ১০টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি লিখিত হয়েছে ৭০ দশকে। অর্থাৎ স্যারের বয়স যখন ৩০-৪০-এর কোটায়। দুটি লিখিত হয় ৮০-এর দশকে। দুটি তো লিখিত হয়েছে ৬০-এর দশকে।      

এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ ‘অতিক্রমণের গান : রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল’ স্যার লিখেছেন ১৯৮৫ সালে। বাংলা সাহিত্যের প্রতিভাবান দুই কবি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের নবুয়ত প্রাপ্তির সময়কে চিহ্নিত করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত স্যার রবীন্দ্রনাথের দিকে হেলে পড়েছেন। এই প্রবন্ধের শেষে তার আলো-আঁধারি ইঙ্গিত দিয়েছেন।    

“নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ অপরিমেয় পিপাসার গান। কোনো সীমিত বা নির্দিষ্ট ছকের ভেতর এ যাত্রা কবিকে সংকীর্ণ করেনি; এই কবিতার পদযাত্রা সুদূরচারী ও দীর্ঘ যার শেষে দাঁড়িয়ে আছে মহাসাগরের বিশালতা। বোঝা যায়, এমন এক অপরিমেয় কবি জাগ্রত হচ্ছেবেই কবিতার মধ্য দিয়ে যিনি মহৎ থেকে মহত্তরের কক্ষণটিহিন পিপাসায় অপ্রতিহত ও বিকাশমান এবং অস্তিত্বের উচ্চতম স্পর্শের লক্ষ্যে প্রজ্জ্বলন্থ, দুর্জয়।

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ এখানেই বিজয়ী আঁধারে নয় আধেয়তে, প্রকরণে নয় প্রসঙ্গে, হৃদ্যতর জীবনের মহৎ প্রতিশ্রুতিতে, কাব্য সাফল্যে নয় ‘কবি সাফল্যে’।”

আমার কাছে মনে হয় সায়ীদ এই ফলাফলটুকু প্রকাশ না করলেও তার প্রবন্ধের শ্রেষ্ঠত্ব ক্ষুন্ন হতো না। তবে আমার কাছে এই প্রবন্ধে রবীন্দ্র ও নজরুল দুটি কবিতা বিষয়ের চেয়ে তার কাব্যিক ছন্দে সুললিত গদ্য ভাষারীতি মুগ্ধ করেছে। আমার কাছে মনে হয় বাংলা গদ্য প্রবন্ধের তালিকা করলে এই প্রবন্ধ তার ভাষারীতির কারণে ওপরের দিকে স্থান করে নেবে। কারণ লেখক গদ্য লিখতে গিয়ে পাঠক কে কবিতা পড়ছে না গদ্য পড়ছে এই বিভ্রম সৃষ্টিতে সক্ষম হন।

‘প্রকাশ ক্ষমতা যদি কবিত্বের প্রাথমিক শর্ত বলে মানা যায়, তবে বিদ্রোহীকে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের তুলনায় সফল না বলে উপায় থাকে না নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ এর অসামান্য তীব্রতা, সংহতি এবং পরিপূর্ণতার কথা মনে রেখেও। বৈচিত্র্য, বর্ণাঢ্য আত্মবিক্ষণের বিস্মিত বৈভব, ক্যানভাসের বিশালতা, সাংগীতিক বহুমাত্রিকতা, চিত্রকল্পের অবিশ্বাস্য সাফল্য, সবিরোধিতার সুন্দর সামঞ্জস্য, বলীয়ান জীবনাগ্রহ এসব নিয়ে’ ‘বিদ্রোহী’ বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে অনতিক্রম্য।

পাঠক মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ভাবনায় পড়ে যান তিনি গদ্য পড়ছেন নাকি কবিতা। এখানেই প্রবন্ধকার আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের গদ্যের শক্তি ও সক্ষমতা।

‘ফররুখ’ প্রবন্ধে সায়ীদ ফররুখের সক্ষমতার প্রশংসা করে তার পাকিস্তান পর্বের দর্শনে আটকে থাকা তার বড় কবি হওয়াকে রুদ্ধ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন, তবে সায়ীদ ফররুখকে সম্পূর্ণ কবি বলেছেন। এই মন্তব্য করতে গিয়ে কবি ও কবিতার সংজ্ঞা দিয়েছেন।

“যিনি কবিতা লিখতে চেষ্টা করবেন দুটো জিনিস থাকতেই হবে তার রক্তে। এক, প্রাত্যহিক জীবনের ভেতর ‘জীবনের অধিক জীবনের’ অপার্থিব আবির্ভাবে শিউরে উঠার মতো একটি হৃদয়। দুই. সেই ছাপিয়ে ওঠা হৃদয়কে কবিতার সম্পন্নতায় ফুটিয়ে তোলার মতো কম বেশি লাবণ্য।”

পরের প্রবন্ধ ‘কবিতা ও অন্ত্যমিল’ অনেক বেশি কবিতায় ছন্দের কারিগরি দিক নিয়ে আলোচনা বলে সাধারণ পাঠকের বোধগম্য হয় না সহজে।

বাকি প্রবন্ধগুলো তার সমসাময়িক সময়ের সাহিত্যিক বিশ্লেষণ বলা যেতে পারে, যেখানে পাত্রপাত্রীদের মধ্যে সায়ীদ নিজেই একজন। তবে এই প্রবন্ধগুলো থেকে শিক্ষা হলো সমসাময়িক প্রতিভাকে স্বীকার ও তাদের প্রশংসা করার উদারতা। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার সমসাময়িকদের অনেকের চেয়ে ব্যক্তি মানুষ হিসেবেও এখানে ব্যতিক্রম।

উত্তরপ্রজন্ম॥ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদে॥  প্রকাশক : বিশ^সাহিত্য কেন্দ্র॥  মূল্য : ২৯০ টাকা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত