অনুবাদ : কাজী নজরুল ইসলাম প্রয়াণের ৮৯২ বছর পরও কাব্যভুবনের অনস্বীকার্য নাম হয়ে বেঁচে আছেন ওমর খৈয়াম। গত শতকের ত্রিশের দশকে বাংলা ভাষায় এই কবির অমর কাব্য রুবাইয়াৎ-ই ওমর খৈয়াম অনুবাদ করেছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আর এর মাধ্যমে বাঙালিও বিশদভাবে পরিচিত হয় পারস্যের এ কবির সঙ্গে। ১৮ মে ওমর খৈয়ামের ৯৭৫তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে ধ্রুপদিতে প্রকাশিত হলো বিদ্রোহী কবির অনূদিত রুবাইয়াৎ-ই ওমর খৈয়াম থেকে নির্বাচিত দশটি রুবাই। ধ্রুপদি সম্পাদক
রাতের আঁচল দীর্ণ করে আসল শুভ ঐ প্রভাত,
জাগো সাকি! সকাল বেলার খোঁয়ারি ভাঙো আমার সাথ।
ভোলো ভোলো বিষাদ-স্মৃতি! এমনি প্রভাত আসবে ঢের,
খুঁজতে মোদের এইখানে ফের, করবে করুণ নয়নপাত।
আমরা পথিক ধূলির পথের, ভ্রমি শুধু একটি দিন,
লাভের অঙ্ক হিসাব করে পাই শুধু দুখ, মুখ মলিন।
খুঁজতে গিয়ে এই জীবনে রহস্যেরই কূল বৃথাই
অপূর্ণ সাধ আশা লয়ে হবই মৃত্যুর অঙ্কলীন।
সাকি! আনো আমার হাতে মদ-পেয়ালা, ধরতে দাও!
প্রিয়ার মতো ও মদ-মদির সুরত-ওয়ালি ধরতে দাও!
জ্ঞানী এবং অজ্ঞানীরে বেঁধে যা দেয় গাঁটছড়ায়,
সেই শরাবের শিকল, সাকি, আমায় খালি পরতে দাও!
করব এতই শিরাজি পান পাত্র এবং পরান ভোর
তীব্র মিঠে খোশবো তাহার উঠবে আমার ছাপিয়ে গোর।
থমকে যাবে চলতে পথিক আমার গোরের পাশ দিয়ে,
ঝিমিয়ে শেষে পড়বে নেশায় মাতাল-করা গন্ধে ওর।
কারুর প্রাণে দুখ দিয়ো না, করো বরং হাজার পাপ,
পরের মনে শান্তি নাশি বাড়িয়ো না তার মনস্তাপ।
অমর আশিস লাভের আশা রয় যদি, হে বন্ধু মোর,
আপনি সয়ে ব্যথা, মুছো পরের বুকের ব্যথার ছাপ।
ছেড়ে দে তুই নীরস বাজে দর্শন আর শাস্ত্রপাঠ,
তার চেয়ে তুই দর্শন কর প্রিয়ার বিনোদ বেণির ঠাট;
ঐ সোরাহির হৃদয়-রুধির নিষ্কাশিয়া পাত্রে ঢাল,
কে জানে তোর রুধির পিয়ে কখন মৃত্যু হয় লোপাট।
‘শারাব ভীষণ খারাপ জিনিস মদ্যপায়ীর নেইকো ত্রাণ।’
ডাইনে বাঁয়ে দোষদর্শী সমালোচক ভয় দেখান
সত্য কথাই! যে আঙুরে নষ্ট করে ধর্মমত,
সবার উচিত নিঙড়ে ওরে করে উহার রক্তপান!
দেখতে পাবে যেথায় তুমি গোলাপ লালা ফুলের ভিড়,
জেনো, সেথায় ঝরেছিল কোনো শাহানশার রুধির।
নার্গিস আর গুল-বনোসার দেখবে যেথায় সুনীল দল,
ঘুমিয়ে আছে সেথায় গালে তিল ছিল যে সুন্দরীর।
আরাম করে ছিলাম শুয়ে নদীর তীরে কাল রাতে,
পার্শ্বে ছিল কুমারী এক, শারাব ছিল পিয়ালাতে;
স্বচ্ছ তাহার দীপ্তি হেরি শুক্তি-বুকে মুক্তা-প্রায়
উঠল হেঁকে প্রাসাদ-রক্ষী, ‘ভোর হলো কি আধ-রাতে?’
হায় রে, আজি জীর্ণ আমার কাব্য পুঁথি যৌবনের!
ধুলায় লুটায় ছিন্ন ফুলের পাপড়িগুলি বসন্তের।
কখন এসে গেলি উড়ে, রে যৌবনের বিহঙ্গম!
জানতে পেরে কাঁদছি যখন হয়ে গেছে দেরি ঢের!