বর্তমান সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবিতে গত ২০ মে থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে চার দিনের কর্মসূচি পালন শুরু করেছে বিরোধী দল বিএনপি। শিগগিরই দলটির ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে চূড়ান্ত আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, চলমান আন্দোলন কর্মসূচিকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের ধরপাকড় এবং তাদের বাড়িতে বাড়িতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হানা দিচ্ছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও আন্দোলন কর্মসূচি সামনে রেখে বিভিন্ন জেলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে।
বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে ভীতি সঞ্চার করে চলমান আন্দোলন কর্মসূচির গতি থামাতে এসব করা হচ্ছে বলে দাবি দলটির নেতাদের। তারা বলছেন, আগামীর চূড়ান্ত আন্দোলনের আগে নানা ধরনের চক্রান্তের জাল বুনছে সরকার।
এদিকে গত রবিবার এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এখন থেকে শান্তি সমাবেশের বদলে সারা দেশে বিএনপিকে প্রতিরোধের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনের নামে বিএনপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। বিএনপির সমাবেশে শেখ হাসিনাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এজন্য এখন থেকে শান্তি সমাবেশ নয়, সারা দেশে বিএনপিকে প্রতিরোধ করতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালাম গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওবায়দুল কাদের প্রতিরোধের কথা বলার পর গতকাল (গত রবিবার) ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনুকে তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেছে। আমরা জানতে পেরেছি তাকে মিন্টো রোডের ডিবি অফিসে রাখা হয়েছে। কিন্তু কেউ মজনুকে আটকের কথা স্বীকার করছে না। অথচ কোনো উপযুক্ত আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া মজনুকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি না করতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে উচ্চ আদালতের।’
বিএনপি নেতাদের দাবি, সরকার পতনের লক্ষ্যে তাদের চূড়ান্ত আন্দোলন সামনে রেখে সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের পুরনো মামলায় গ্রেপ্তারের পাশাপাশি হামলা ও নির্যাতন করা হচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যখনই আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করি তখনই আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আমাদের নেতাকর্মীদের বাসাবাড়িতে হামলা ও অভিযান চালায়। এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। অতীতেও এমনটা করেছে। প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপান সফরে ব্যর্থ হয়ে দেশে ফিরে নির্বাচন সামনে রেখে নির্যাতন, গায়েবি মামলা, হামলা ও গ্রেপ্তার শুরু করেছে। তবে সরকার যতই অপচেষ্টা চালাক এবার লাভবান হবে না। সরকার আমাদের আন্দোলন বানচালে যতই চক্রান্তের জাল বিস্তার করুক লাভবান হবে না। গণআন্দোলনে জনতার ঝড়ে সরকার উড়ে যাবে।’
সরকার পতনের লক্ষ্যে চলমান আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়ন ও কৌশল নির্ধারণে আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করতে একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করেছে বিএনপি। সেই কমিটির সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের ওপর কোন দেশ কী কারণে স্যাংশন দিল কিংবা না দিল তা নিয়ে আমরা ভাবছি না। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে র্যাবের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তাতে আমরা খুশি নই। কারণ এটা আমরা চাই না। পুলিশের ওপর আসুক তাও আমরা চাই না। পুলিশের ওপর যাতে স্যাংশন না আসে তার জন্য তাদের আইনের মধ্যে থেকে কাজ করার অনুরোধ করেছি বিভিন্ন সময়ে, এখনো করছি। তবে সবচেয়ে বড় স্যাংশন হবে জনতার স্যাংশন। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে স্যাংশন দেব।’
চূড়ান্ত আন্দোলন থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের দূরে রাখতে সরকার গ্রেপ্তার ও বিভিন্নভাবে হয়রানির মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে বলে দাবি দলটির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনের। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছর ১০ ডিসেম্বর রাজধানীতে আমাদের দলের ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ সামনে রেখে সারা দেশে ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছিল পুলিশ। শুধু তাই নয়, ঢাকার সমাবেশ ঠেকাতে ৭ ডিসেম্বর বিএনপি অফিসে বোমা আছে এমন কল্পকাহিনি প্রচার করে নিজেরাই বোমা নিয়ে প্রবেশ করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বাজারের ব্যাগে করে বোমা নিয়ে কার্যালয়ে প্রবেশ করে, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। আসলে আন্দোলন থেকে নেতাকর্মীদের দূরে সরাতে ও ভয়ভীতি দেখাতে এমনটা করেছিল। ঠিক একইভাবে আগামীর আন্দোলনকে বিতর্কিত করতে সরকার আগেভাগেই সারা দেশে নেতাকর্মীদের গায়েবি মামলায় গ্রেপ্তার করছে। উদ্দেশ্য একটাই জনগণের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ঠেকানোর অপচেষ্টা, কিন্তু এসবে কাজ হবে না। জনগণ কোনো বাধাই আর মানবে না।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও আন্দোলন কর্মসূচি সামনে রেখে বিভিন্ন জেলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে বলে অভিযোগ দলটির নেতাদের। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১৮ মে ফেনী জেলার বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা অতর্কিত বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে লেমুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মিন্টু মেম্বার, পরশুরাম উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মো. শাকিল, সদর উপজেলা ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ইয়াসির আরাফাত, মোটবি ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি বাদলসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে গুরুতর আহত করে এবং দুই শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করে।’
একই ধরনের অভিযোগ করে বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ২০ মে দলের নেতাকর্মীরা বরিশাল শহরের জনসমাবেশ সফল করতে প্রস্তুতি সভার আয়োজন করে। আগৈলঝাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এসএম আফজাল হোসেনের বাড়িতে আয়োজিত ওই সভায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হামলা করে বিএনপি নেতা মো. মানিক, পলাশ মোল্লা, ইয়াসিন ও হানিফ ব্যাপারীসহ ২০ জনের বেশি নেতাকর্মীকে আহত করে। এ ছাড়া বাড়িতে থাকা আসবাবপত্র ও মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে।’
গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলনেরও দাবি, তার এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ২০ মের কর্মসূচিকে সামনে রেখে পুলিশ গাজীপুর মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব শওকত হোসেন সরকার, মহানগর বিএনপির সদস্য মাহবুবুল আলম শুক্কুর ও মহানগর তাঁতী দলের আহ্বায়ক তাজুল ইসলাম ব্যাপারীর বাড়িতে তল্লাশি চালায় এবং কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে। পাশাপাশি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা চালায়।’
চলমান আন্দোলন কর্মসূচির গতি থামাতে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করতে পুলিশ হয়রানিমূলক গ্রেপ্তারি অভিযান চালাচ্ছে বলে অভিযোগ দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ২০ মে রাজধানী ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় ১০ দফা দাবিতে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ছিল। ওই কর্মসূচিকে সামনে রেখে নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের ভয়ভীতি সঞ্চার করতে গত ১৮ মে রাতে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ অভিযান চালায়। পুলিশ নেতাকর্মীদের কাউকে গভীর রাতে ঘুম থেকে ডেকে নিয়ে এবং কাউকে মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বের হওয়ার সময় গ্রেপ্তার করে। অথচ যাদের গ্রেপ্তার করা হয় তাদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা নেই। গত বছর ২৯ নভেম্বর ও চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামপুর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে হওয়া মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। অথচ এজাহারে তাদের নাম ছিল না।’