কাজী নজরুল ইসলাম। আমি তাকে ‘সাহস’-না, ‘দুঃসাহস’ বলেই ডাকি! যদিও দুখু মিঞা, নজর আলি কত নামই-না বইপত্তরে পাওয়া যায়। কিন্তু দুঃসাহসই যেন তার ঠিকঠাক নাম। একটি কবিতায় নজরুল নিজেই অবশ্য বলেছিলেন : দারিদ্র্য তাকে মহান করেছে, খ্রিস্টের মতো করেছে সম্মানিত আর দিয়েছে ‘অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস’। তবু যে কেউ বলবেন, ওটা নজরুলের বিনয়াধিক্য : শুধুই দারিদ্র্য তাকে এমনটা করেনি। কিংবা দারিদ্র্যের মোটেই এমন শক্তি নেই, এটা নজরুলের আলঙ্করিক প্রয়োগ। দারিদ্র্যই যদি এমনটি করত তাহলে গুলিস্তান বা ফার্মগেট এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা সাহায্যপ্রার্থী দরিদ্রদের সবাই নজরুল হয়ে যেতেন বা হতেন দুরন্ত সাহসী! কিন্তু তারা তা হননি।
নজরুল কী? এই প্রশ্নটি বুঝতে হলে দারিদ্র্য মাপকাঠি নয়, বোধের বিস্তার চাই আরও অন্যদিকে। এতটা দুঃসাহসী নজরুল হলেন কী করে? তার চরিত্রে বাউণ্ডেলে ভাব ছিল বটে, কিন্তু জেদের বিন্দুমাত্র ভাব ছিল না। নারীপ্রেমে তার চোখে জল এসেছে অনেকবার। একই সঙ্গে একাধিক নারীর প্রেমেও দ্রবীভূত হয়েছে তার হৃদয়। বিবাহিত ও সন্তান-সংসারেও দেখা দিয়েছে অন্য নারীর প্রতি আকর্ষণ। বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনকে লিখেছেন বালিশ চাপা দিয়ে কি বুকের কষ্ট লাঘব হয়! মায়ের জন্য মনে কাতরতা ছিল আর তাই বিরজাসুন্দরী, বাসন্তী দেবী, মিসেস মাসুদা রহমান, গিরিবালা দেবীকে নজরুল মা বলে ডাকতেনই শুধু নয়, তাদের সঙ্গে মাতা-পুত্রের স্নেহময় সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী করেছিলেন। দিনের পর দিন এই নারীদের মাতৃজ্ঞানে সেবা করেছেন নজরুল। আবার প্রেমময় বৈষ্ণবের মতো কাতর হয়ে লিখেছেন : ‘তুমি যদি রাধা হতে শ্যাম... তুমি যে কাঁদনে কাঁদায়েছ মোরে, আমি কাঁদাতাম তেমনি করে’। এই কান্না আর আবেগ স্নেহময়তা যার মধ্যে বিরাজ করে, তিনি এতটা দুঃসাহসী হয় কী করে! নজরুল যখন সাহিত্যচর্চা শুরু করছেন এবং প্রকাশের জন্য লেখাগুলো পাঠাচ্ছেন, সেগুলো মূলত মুসলিম ভাবধারার। যেমন, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সম্পাদিত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ বা মোজাম্মেল হক সম্পাদিত ‘মোসলেম্ ভারত’ পত্রিকায় নজরুল প্রথম দিকে প্রচুর লিখেছেন। দুই বছরের কম সময় বেরিয়েছে ‘মোসলেম্ ভারত’ কিন্তু এরই মধ্যে নজরুলের চল্লিশটি রচনা এখানে স্থান পায়। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস কী বের হয়নি এখানে? চিত্রের নজরুল-প্রদত্ত ক্যাপশন পর্যন্ত ছাপা হয়েছে এখানে। এরপর নজরুলের চেতনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে যায়। তিনি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ঘরানা থেকে বের হন এবং ধীরে ধীরে অমুসলিম সম্পাদিত পত্রিকায় লেখা আরম্ভ করেন। নলিনীকান্ত সরকার সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রকাশ হলে দুবারে পত্রিকাটি প্রায় ঊনত্রিশ হাজার সংখ্যা ছাপতে হয়। এরপর নজরুলের অন্যভাবে প্রকাশ! কিন্তু তার আগ পর্যন্ত নজরুল মূলত লিখেছেন ইসলামি ভাবধারার কবিতা। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’য় যে কবিতাগুলো আছে তার মধ্যে প্রায় অর্ধেক আছে ইসলাম ধর্মসংশ্লিষ্ট। যেমন ‘মোহররম’, ‘কোরবানী’, ‘খেয়া-পারের তরণী’, ‘শাত-ইল আরব’, ‘রণভেরী’ এসব কবিতাতেই ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য কোনো না কোনোভাবে ব্যঞ্জিত হয়েছে। এমন কি ‘আনোয়ার’ নামের কবিতাও ইসলামের বিজয়কে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার প্রয়াসমাত্র। এই কবিতাগুলোর পরে লেখা ‘বিদ্রোহী’, ‘ধুমকেতু’, ‘প্রলয়োল্লাস’ এবং সেগুলো পরেই পত্রিকাতেও বের হয়। কিন্তু লক্ষ করার বিষয়, ১৯২২ সালের সেপ্টেম্বরে যখন ‘অগ্নিবীণা’ বই আকারে প্রথম বের হলো, যেটি নজরুলের প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই সেই বইয়ে লেখক প্রথমে স্থান দিলেন ‘প্রলয়োল্লাস’ বা ‘বিদ্রোহী’র মতো কবিতা এবং একেবারে শেষে স্থান দিলেন ইসলাম ধর্মসংশ্লিষ্ট কবিতাগুলো। ব্যাপারটি সামান্যতর নয়, দুঃসাহসের! কারণ, ততদিনে নজরুলের চেতনার বেশ পরিবর্তন হয়ে গেছে। আরও অবাক হওয়ার ব্যাপার : ‘অগ্নিবীণা’ উৎসর্গ করা হলো বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে। যে সময় ক্ষুদিরাম বসু, যতীন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখ বিপ্লবী কর্মকাণ্ড করে ব্রিটিশদের রোষানলে পড়েছেন, সে সময়ই নজরুল আর এক বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে উৎসর্গ করেন নিজের লেখা প্রথম কবিতার বই। এই বারীন্দ্রকুমার ঘোষ বোমা তৈরি ও প্রয়োগের মামলায় প্রথমে প্রাণদণ্ডাদেশ ও পরে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ পেয়েছিলেন। তার সঙ্গে উল্লাসকর দত্তকেও একই আদেশ দেওয়া হয়। এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি, যিনি প্রথম থেকেই ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন, তাকে প্রথম গ্রন্থ উৎসর্গ করেও নজরুল বুঝিয়েছিলেন, কোনো জ্ঞাতি বা আত্মীয় নয়, আদর্শের সম্পর্কই বড় আর সেটি আত্মার আত্মীয়ও। নজরুলের এই উৎসর্গ কর্মটি সাধারণ ও স্বাভাবিক ছিল না। শুধু আদর্শের টানে এই কর্মটি তিনি করেছিলেন।
‘তুই’ তুচ্ছার্থ দিয়ে আরম্ভ করলেন কবিতা : ‘তোরা সব জয়ধ্বনি র্ক’! প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার প্রথম চরণের প্রথম শব্দ তুচ্ছার্থের তুই দিয়ে আরম্ভ হতে আর কোনো বাঙালি কবির কবিতায় দেখিনি। একেবারে ধাক্কা দিয়ে বাংলা কাব্যাঙ্গনে প্রবেশ করলেন নজরুল। এরপর ‘বিদ্রোহী’ পড়ে বাঙালি পাঠক ভাব ও ভাষাতে যে স্পর্ধিত সাহস অনুধাবন করে, তা আর তুলনায় ধরে না। মুসলিম সমাজ চমকে যায় খোদার আসন আরশ ছেদ করার ঘোষণায়, হিন্দুসমাজ হতবিহ্বল হয়ে পড়ে আরেক ভ...গু মুনির আগমন ধ্বনি শুনে। এখনো একই কবিতায় এমন স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয়কে আর কি কেউ ধরতে পেরেছেন? ‘কামাল পাশা’ কবিতায় নজরুল বললেন, কামাল পাশার বীরত্ব দেখে আহ্লাদিত নারীসমাজ পথে নেমে এসেছে এবং তাদের মাথার ঘোমটা খুলে পড়ছে। কী সাংঘাতিক! নারীর এমন বেপর্দা হওয়ার চিত্র কোনো দুঃসাহসী কবি ছাড়া কি উল্লেখ করতে পারেন? প্রকরণেও সাহস ছিন্ন করলেন নজরুল। ‘বিদ্রোহী’তে তিনি যে আঙ্গিক বৈচিত্র্য আনলেন, বাংলা কবিতায় তা অভাবিতপূর্ব।
লেখার দায়ে কাজী নজরুল ইসলামই জেলে গেছেন প্রথম, তেমন নয়। এর আগেও অনেকে গেছেন : এ প্রসঙ্গে ইসমাইল হোসেন শিরাজির নামই করা যায়! কিন্তু নজরুল জেলখানায় যে দৃঢ়তার পরিচয় দেন, তা বিস্ময়কর। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামের কবিতা লিখে তিনি জেলে যান। জেলে আটক রেখে নজরুলের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয় লিখিত কবিতা সম্পর্কে। ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেলে বসে চার পৃষ্ঠার লেখা লেখেন তিনি, এর নাম ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’। তাতে নজরুল স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন : ‘এই অন্যায় শাসনক্লিষ্ট বন্দি সত্যের পীড়ত ক্রন্দন আমার কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল বলেই আমি রাজদ্রোহী?’ বাঘের সামনে বসে তার গালে চপেটাঘাত করা যেমন, নজরুলের এই জিজ্ঞাসার মধ্যেও আছে তেমন সাহসের তড়িৎ। এরপর বিভিন্ন সময় তার একাধিক কবিতা ও প্রকাশিত পাঁচটি বই ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। এসব ব্যাপারে নজরুলের ভ্রুক্ষেপও ছিল না।
ব্যক্তিজীবনে এতটা দুঃসাহসী তিনি! নার্গিসের সঙ্গে বিয়ে তিনি কীভাবে ছিন্ন করলেন? কুমিল্লার মুরাদনগর থানার দৌলতপুরের মেয়ে নার্গিসের সঙ্গে বিয়ের রাতেই নজরুল অভিমান বা বিয়ের ঘটনা প্রত্যাখ্যান করে চলে যাওয়া যে মিথ, সেটি দুঃসাহসী নয় কি? একটি মেয়েকে বিয়ে করে, সেই বিয়েকে অস্বীকার করে বর একাকী কোন পথে এবং কীভাবে মুরাদনগর থেকে চলে গেলেন? বর চলে যেতে চাইলে, নববধূর পক্ষই-বা তাকে যেতে দিলেন? আজ থেকে একশ বছরেরও আগের মুরাদনগর-কুমিল্লা-কলকাতার রাস্তা ও যোগাযোগব্যবস্থার কথা চিন্তা করে নজরুলের পুরো কাজটি দুঃসাহসী অ্যাডভেঞ্চারের মতো লাগে। পরে প্রমীলাকে যে অবস্থায় (!) তিনি বিয়ে করেন এবং বিয়ের সময় প্রমীলার ধর্ম-অস্তিত্ব বজায় রাখার পথ বাতলে দেন, সেটিও এক কথায় অসামান্য। বাংলা ও আরবি শব্দ মিলিয়ে নজরুল ও প্রমীলার সন্তানদের নামকরণ এমন দৃষ্টান্ত কি আগে আছে? আমার জানা নেই। এমন দৃষ্টান্ত আজও অনুসরণ করার লোক বেশ অভাব, এমন কি তার উত্তর-প্রজন্মেও!
কাজী নজরুল ইসলাম তাই তার সময়ের থেকে এগিয়ে; তার কর্ম ও চিন্তাও প্রাগ্রসর সমকালীন ব্যক্তিবর্গ থেকে। নজরুলের আরেক নাম তাই সাহস। না না দুঃসাহস!
লেখক ও গবেষক, উপাচার্য-জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ