পাওনা টাকার নামে চাঁদাবাজি

ঢাকা কলেজ থেকে ছাত্রলীগের সাবেক দুই নেতা গ্রেপ্তার

পাওনা টাকা আদায়ের নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাকে অপহরণ এবং ঢাকা কলেজের আবাসিক হলে আটকে রেখে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের জন্য নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগীর করা চাঁদাবাজির মামলায় ছাত্রলীগের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নিউমার্কেট থানা পুলিশ। গত শুক্রবার রাতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

তারা হলেন ঢাকা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী জনি হাসান ও এস এম শফিক।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, জনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসম্পাদক। আর শফিক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক উপক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক। তবে ভুক্তভোগী বলছেন, যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা মারধর করেনি, বরং রক্ষা করেছে।

গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ঢাকা কলেজের নর্থ হলের ১২০ নম্বর কক্ষে নির্যাতনের ওই ঘটনা ঘটে। ওই ভুক্তভোগী হলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোয়ালিটি কন্ট্রোলার মো. মেহেদী হাসান অয়ন। তাকে নির্যাতনকারীরা মাঝেমধ্যেই এভাবে লোক ধরে এনে মুক্তিপণ আদায় করে বলে জানিয়েছেন হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

ডিএমপির নিউমার্কেট থানার ওসি মো. শফিকুল গনি সাবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকা কলেজের হলে আটকে রেখে চাঁদা দাবির এক মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা ছাত্রলীগের সমর্থক বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

ঢাকা কলেজের আবাসিক হলে এমন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হলে এমন ঘটনার বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। ঘটনার দিন পরীক্ষার কাজে ব্যস্ত ছিলেন হল প্রভোস্টসহ অন্য শিক্ষকরা। আমরা যখন জানতে পেরেছি ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করেছি।’

এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি সাড়া দেননি।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী মো. মেহেদী হাসান অয়ন যে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, তার মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ চুক্তিতে বিভিন্ন জরিপের কাজ করে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ঢাকা কলেজের ছাত্র পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি করেন এবং ভুক্তভোগী মেহেদীর কাছে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা না দেওয়ায় গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুর থানাধীন বছিলা ব্রিজ সংলগ্ন পাকা রাস্তার মোড়ে থাকা দুটি সিসি ক্যামেরা, সাতটি পাওয়ার ব্যাংক, পাঁচটি কেব্ল, দুটি ক্যামেরা স্ট্যান্ড খুলে নিয়ে যায়। পরে রাতে সিয়াম ও রমজান নামের ঢাকা কলেজের দুই ছাত্র ভুক্তভোগীকে ফোন করে বিষয়টি জানান এবং এগুলো ফেরত পেতে হলে কলেজে আসতে হবে বলে জানান। তখন প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী মো. তৌকির মালামাল ফেরত নিতে গেলে তাকে আটক করে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি ও প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেন। মেহেদী ঢাকা কলেজে এলে তাকেও আটকে রেখে মারধর করেন এবং তৌফিরকে ছেড়ে দেন। এ সময় ভুক্তভোগীদের থেকে নগদ টাকা, এটিএম কার্ড ছিনিয়ে নেন। গত শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টায় জনি হাসান, এস এম শফিকসহ আরও একজন মেহেদীকে আহত অবস্থায় গাউছিয়া মার্কেট মোড়ে রেখে আসেন। এ সময় টহল পুলিশ মেহেদীকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এ ঘটনায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০-১২ জনকে আসামি করে নিউমার্কেট থানায় একটি চাঁদাবাজির মামলা করেন মেহেদী। অভিযুক্ত অন্যরা হলেন ছাত্রলীগের কর্মী মো. গোলাপ হোসেন, মেহেরাব হোসেন সিয়াম, অর্ণব, মো. রমজান, গোপাল, রাব্বী তালুকদার, মো. বেল্লাল হোসেন, তারিফ, সালমান, মো. রায়হান, মাসুম, ফাহিম ও শাহীন।

ঢাকা কলেজ সূত্রে জানা গেছে, মামলার আসামিরা সবাই ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সবাই নর্থ হলের আবাসিক ছাত্র। নিউমার্কেটসহ আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগী মেহেদী হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে খ-কালীন চাকরি করতেন ঢাকা কলেজের নয় শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পাঁচজন সরাসরি আমার অধীনে কাজ করতেন। তিন মাস আগে রাজধানীর মহাখালী আইআরসিতে তথ্য সংগ্রহের কাজের ৪৫ হাজার টাকা পেতেন ওই পাঁচজন। সেই টাকার জন্য তারা চাপ দিয়ে আসছিলেন। তারাই ছাত্রলীগের মাধ্যমে অপহরণ করেন আমাকে। ছাত্রলীগের নেতা জসিমের সমর্থকেরা মারপিট করেন।’ সেই কাজের টাকা এখনো পাননি বলে দাবি করেন মেহেদী।

মেহেদী হাসান আরও বলেন, ‘অপহরণের পর আমার কাছে এক লাখ ষাট হাজার টাকা দাবি করেন তারা। টাকা না দেওয়ায় তারা শুক্রবার সকাল থেকে নির্যাতন বাড়িয়ে দেন। টানা দুই ঘণ্টা মারপিট করে আমাকে। সব মিয়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা তারা নিয়ে গেছেন।’   

মেহেদী হাসান বলেন, ‘যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা আমাকে রক্ষা করেছে। কীভাবে তাদের নাম মামলায় ঢুকল আমার জানা নেই। আমি তাদের নাম দিতে বলি নাই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মো. শফিকুল গনি সাবু বলেন, ‘বাদী বিভিন্ন চাপে পড়ে এমন কথা বলতে পারে। মামলার এজাহারে গ্রেপ্তারকৃতদের নাম আছে। আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষে বলা যাবে কোনটা সঠিক।’