সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ সম্ভবত সিগারেটের প্যাকেটের সৌন্দর্যবর্ধন করে। দেদার বিক্রি হওয়া একটি সিগারেটের প্যাকেটে ক্যানসারাক্রান্ত গলার এক ভয়ংকর ছবি থাকে, নিচে কালোর ওপর সাদাতে বাংলায় লিখা : ধূমপানের কারণে গলায় ও ফুসফুসে ক্যানসার হয়। এই সংবিধিবদ্ধ সতর্কবাণী দেখে সিগারেট ছেড়ে দিয়েছেন এমন কারও সঙ্গে অদ্যাবধি আমার সাক্ষাৎ হয়নি। সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ কেবল বাংলাদেশে নয় সারা পৃথিবীতেই একটি খেলো ফাজলামিতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের হিসাবে সিগারেট প্রতি বছর ৮০ লাখ মানুষকে খুন করে। এর মধ্যে ৭০ লাখ মৃত্যুর কারণ সরাসরি ধূমপান। ধূমপায়ী না হলেও ধূমপায়ীদের সান্নিধ্যে থাকা ১২ লাখ মানুষ প্যাসিভ স্মোকার হিসেবে প্রতি বছর মৃতের তালিকায় নাম লেখায়। ১৩০ কোটি তামাকখোরের ৮০ শতাংশের নিবাস নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশে।
ধূমপানের মিথ
সিগারেট বছরে কমপক্ষে ৮০ লাখ লোককে হত্যা করে। তবে এই হত্যাকাণ্ডটি খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘটানো হয় না। ব্যাপারটা ঘটে নীরবে-নিভৃতে। তাই অবিশ্বাস্য ঠেকে। উল্টো এই ধূম্রদণ্ডটিকে মনে হবে অফুরন্ত শক্তিদাতা ও প্রাণ-সঞ্জীবনী। বিশ্বব্যাংক সিগারেট নিয়ে এক ডজন বহুল প্রচলিত মিথ শনাক্ত করেছে এবং সেগুলো কতটা অসার এবং সত্যবিরোধী তাও ব্যাখ্যা করেছে।
মিথ ১ : সিগারেট কেবল সচ্ছল মানুষ ও ধনী দেশের ব্যাপার।
বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হরেকরকম সিগারেট খাইয়ে গোটা পৃথিবীকে ধোঁয়ামুখী করেছে, সেই দেশেই ধূমপান ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উপাত্ত পরীক্ষা করে দেখা গেছে, একটি নির্দিষ্ট সীমার ওপরে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি মাথাপিছু সিগারেট সেবনের হার ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দিয়েছে। অতি উঁচু আয়ের দেশগুলোতে পুরুষদের ধূমপান লক্ষণীয় দ্রুততার সঙ্গে হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু স্বল্প ও মাঝারি আয়ের দেশগুলোতে ধূমপান বাড়ছে। মহিলাদের বেলায় ধূমপানের হার পৃথিবীর প্রায় সবগুলো দেশেই বাড়ছে। গরিব দেশগুলোতে উঁচু আয়ের লোকেরা ধূমপানে কম আসক্ত হচ্ছে আর আসক্তরা ছেড়ে দিচ্ছে। গরিব দেশে এবং তুলনামূলকভাবে কম আয়ের পরিবারগুলোতে সিগারেটের চাহিদা বেশি। ধূমপান থেকে সৃষ্ট রোগের ভারও তাদের বেলায় অন্যের চেয়ে বেশি।
মিথ ২ : ধূমপান নিরুৎসাহিত করা সরকারের কাজ নয়, তা ভোক্তার স্বাধীন পছন্দে হস্তক্ষেপ করার নামান্তর।
প্রথমত, অধিকাংশ ধূমপায়ী ধূমপানের ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত নয় কিংবা ঝুঁকিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। দ্বিতীয়ত, ধূমপানের ক্ষতিকর দিক না জেনেই অধিকাংশ শিশু ও তরুণের ধূমপানে হাতেখড়ি হয়। যখন সিগারেট ছাড়ার কথা ভাবে ততদিনে রীতিমতো নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, চাইলেও ছাড়তে ইচ্ছে করে না। তৃতীয়ত, ধূমপানের খেসারত দিতে হয় অধূমপায়ীদের। ‘প্যাসিভ স্মোকিং’ একই ধরনের ক্ষতির কারণ। অধূমপায়ীদের রক্ষা করার যুক্তিতে হলেও ধূমপান বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ যুক্তিসংগত।
মিথ ৩ : ধূমপায়ীরা নিজের গাঁটের টাকায় সিগারেট কেনে; অসুখ-বিসুখ হলে গাঁটের টাকাই খরচ করে। অন্যের মাথাব্যথার কারণ নেই।
অবশ্যই, মাথাব্যথার কারণ রয়েছে। ধূমপায়ীরা খরচের ভার অন্যের ওপর ফেলে দেয়। আশপাশে অবস্থানকারীদের স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ধূমপায়ী এবং তাদের সান্নিধ্যে থাকা অধূমপায়ীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে হিমশিম খেতে হয়। কার্যত, এই সরকারি খরচ আদায় করা হয় নিরপরাধ জনগণের কাছ থেকে বাড়তি কর আরোপের মাধ্যমে। ধূমপায়ীদের জন্য রাষ্ট্রের খরচ অনেক বেশি। আর ধূমপায়ীদের অপরাধের দায় বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে।
মিথ ৪ : ধূমপান নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে অনেকেই স্থায়ী চাকরি হারাবে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ভয়টি অমূলক। অনেক শিল্পজাত দ্রব্যের উৎপাদন বিভিন্ন অর্থনীতিতে বন্ধ হয়েছে, তাই বলে অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়েনি। পরিকল্পিত ধূমপান নিয়ন্ত্রণ অর্থনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। ভিন্ন উৎপাদনশীল খাতে পরিবর্তিত হবে। যে হাত তামাকপাতা পিষত সেই হাতেই তৈরি হতে পারে কম্পিউটার। অর্থনীতি সে ক্ষেত্রে আরও গতিময় হবে, শ্রমিকের মজুরিও বাড়বে।
যে দেশে সিগারেট উৎপাদন নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, সেসব দেশে কার্যত চাকরির বাজারে এর তেমন প্রভাব পড়েনি। বরং ধূমপান হ্রাস পাওয়ায় অর্থনীতির হিসাবে নিট লাভ হয়েছে।
মিথ ৫ : সিগারেটখোরদের বেলায় ধূমপান আসক্তি এত তীব্র যে, ট্যাক্স বাড়িয়ে চাহিদা কমানো সম্ভব নয়। ফলে ট্যাক্স বাড়ানোর কোনো যুক্তি নেই।
পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। সিগারেটের ওপর ট্যাক্স বাড়ালে ধূমপায়ীর সংখ্যা কমে আসে এবং একই সঙ্গে নেমে আসে ধূমপানজনিত মৃত্যুর সংখ্যা। সিগারেটের দাম বাড়লে কেউ কেউ সিগারেট ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। বাড়তি খরচে অসমর্থ হওয়ায় কেউ কেউ কমসংখ্যক সিগারেট খায়। মূল্যবৃদ্ধি তাদের নিরুৎসাহিত করে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, সিগারেটের ওপর বর্ধিত ট্যাক্স চাপানো হলে উঁচু আয়ের দেশগুলোতে তা খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারে না। কিন্তু নিম্ন ও মাঝারি আয়ের দেশে তা বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ধূমপান ট্যাক্স আরোপ করা হলে সরকারের আয়ের তেমন হেরফের না ঘটিয়ে ধূমপান বৃদ্ধির প্রবণতাকে রোধ করা সম্ভব। ধূমপান নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপানজনিত মৃত্যু কমাতে উচ্চতর ট্যাক্স আরোপই কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
মিথ ৬ : ট্যাক্স বাড়ালে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাবে, কারণ তখন কম সিগারেট বিক্রি হবে।
এটি একেবারে ভ্রান্ত ধারণা। বর্ধিত ট্যাক্স আরোপের কারণে পৃথিবীর কোথাও সিগারেট থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব কমেনি। ট্যাক্স বৃদ্ধিতে ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাজনিত কারণে বিক্রি কমে সত্যি, কিন্তু বর্ধিত ট্যাক্স সিগারেট খাতে টার্গেটকৃত রাজস্বকে অবশ্যই অক্ষুণœ রাখে। দাম বাড়লে ধূমপায়ী যত দরিদ্রই হোক না কেন সঙ্গে সঙ্গেই সিগারেট ছেড়ে দিচ্ছে না। এটি একটি ধীরগতি প্রক্রিয়া। ফলে অর্থের বাজারে আকস্মিক কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না।
মিথ ৭ : সিগারেটের ওপর ট্যাক্স বাড়ানোর সুফল চোরাচালান ও অবৈধ উৎপাদন নষ্ট করে দেয়।
মিথটি আংশিক সত্য। কেবল সিগারেট নয়, যেকোনো দ্রব্যের বেলাতেই চোরাচালানি এবং অবৈধ উৎপাদন বিভিন্ন কারণে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। চোরাচালান রোধ করতে না পারা রাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রশাসনিক দুর্বলতা। এদিকে সরকারকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। চোরাচালানির বাস্তবতা মেনে নেওয়ার পরেও দেখা যাচ্ছে, সিগারেটের ওপর বর্ধিত ট্যাক্স আরোপ এ খাতে প্রাপ্ত রাজস্বকে বাড়াচ্ছে এবং ধূমপানের হার কমিয়ে আনছে। চোরাচালানপ্রবণ দেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ সহযোগিতাতেই চোরাচালান চলছে।
মিথ ৮ : সিগারেটের ওপর ট্যাক্স বাড়ানো অনুচিত। কারণ এতে দরিদ্র ধূমপায়ী আনুপাতিক হারে ধনীর চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মিথটিতে একটি নৈতিক প্রশ্নের সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো দ্রব্যের একই হারে মূল্যবৃদ্ধি ধনীর চেয়ে গরিবকেই বেশি বিপদগ্রস্ত করে। বাড়তি ট্যাক্সের কারণে সিগারেটের দাম বাড়লে কিনে খেতে ধনীর খুব একটা অসুবিধা হয় না। কিন্তু আয় নিতান্ত সীমিত হওয়ায় দরিদ্র ব্যক্তির পক্ষে তা কেনা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কাজেই দরিদ্রের ভোগের ইচ্ছে রাষ্ট্রের কারণে বেশি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক মনে করে, নীতিনির্ধারকদের কাজ কেবল সিগারেটের ওপর ট্যাক্স বাড়ানো নয়। সিগারেটের জন্য ব্যয়িত বাড়তি অর্থ বেঁচে যাচ্ছে। অসুস্থতা কমছে। রাষ্ট্রের চিকিৎসা ভর্তুকিও কম লাগছে। পরোক্ষভাবে তা দরিদ্র ধূমপায়ীর এবং রাষ্ট্রের কল্যাণই করছে।
মিথ ৯ : সিগারেটের ওপর ট্যাক্স বাড়ালে ধূমপায়ীরা আরও কম দামি সিগারেটের দিকে ঝুঁঁকে পড়বে। ফলে সার্বিক ধূমপানের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।
ধূমপানে একটি নির্দিষ্ট রুচি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মানুষ সাধারণত হীন রুচির সিগারেটের দিকে হাত বাড়ায় না। তবে কিছুসংখ্যক ধূমপায়ী তাদের বাজেট ঠিক রেখে বর্তমান ব্র্যান্ডের কমসংখ্যক সিগারেট খাবে অথবা একই বাজেটে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের সমসংখ্যক সিগারেট খাবে। নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপিতে সিগারেটের বিকল্প বাজারের সুযোগ রয়েছে।
মিথ ১০ : অধিকাংশ দেশেই সিগারেটের ওপর ট্যাক্স অত্যন্ত বেশি।
প্রতিপাদ্যটি যথার্থ নয়। রাষ্ট্রীয় কর কাঠামো এবং ধূমপান নিয়ন্ত্রণে সরকারের নীতিমালা ট্যাক্স নির্ধারণের গাইডলাইন। ‘অত্যন্ত বেশি’ মানে কী তাও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। ধনী দেশগুলোতে সিগারেটের ওপর ধার্য ট্যাক্স মোটামুটিভাবে সিগারেটের খুচরা মূল্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ। নিম্নআয়ের দেশগুলোতে ট্যাক্স সিগারেটের খুচরা মূল্যের অর্ধেকেরও কম। ইউরোপ ও আমেরিকার কোনো কোনো দেশে ট্যাক্সের পরিমাণ খুচরা মূল্যের শতকরা আশি ভাগ।
মিথ ১১ : সিগারেটের জোগান হ্রাসের চেষ্টাই ধূমপান হ্রাসের কার্যকর পন্থা।
মিথটি যুক্তিসংগত, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। একজন সরবরাহকারী কমিয়ে দিলে বিকল্প সরবরাহকারী জন্ম নিচ্ছে। দেশীয় উৎপাদন কমিয়ে দিলে চোরাচালান বেড়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে জোগান নয়, চাহিদা হ্রাসই অন্যতম কর্মকৌশল। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য-শিক্ষা, সিগারেটের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অবহিতকরণ এবং সিগারেটের বিকল্প দ্রব্য বাজারজাতকরণ আবশ্যক।
মিথ ১২ : ধূমপান নিয়ন্ত্রণ তামাকনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতির দারিদ্র্য আরও বাডিয়ে দেবে।
মিথটি অতিরঞ্জিত। ধূমপান নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে কালই সবাই সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেবেন না। সুষ্ঠু ও বাস্তবায়নযোগ্য নীতিমালা থাকলে তা ধীরে ধীরে কার্যকর হবে। আগামী এক দু’দশকে আকস্মিকভাবে তামাক চাষের জমি ব্যাপক হারে কমে যাবে মনে করার কারণ নেই। নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা একই সঙ্গে তাদের বিকল্প কৃষিপণ্য উৎপাদনের সুযোগ করে দেবে এবং একটি নতুন বাজারও তৈরি হবে। এভাবেই কৃষি ক্ষেত্রে ও শিল্পে পুনর্বাসনেও কোনো কোনো সরকার সহায়তা করছে।
সিগারেটের পক্ষে বলার মতো ধূমপায়ীদের ভালো লাগার যুক্তি ছাড়া আর কিছু নেই। এই ভালো লাগার ক্ষতি নিজের এবং চারপাশের সবার। ট্যাক্সের ভিত্তি বাড়ানো হচ্ছে। সিগারেটের ক্ষেত্রে ট্যাক্সের হারও বাড়ানো প্রয়োজন। আরও উচ্চমূল্য হওয়া প্রয়োজন প্রতিটি সিগারেট। এতে রাষ্ট্র এবং জনগণ উপকৃত হবে।
লেখক: সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট
momen98765@gmail.com