দেশের অর্থনীতি, জনশক্তি, কৃষি ও প্রযুক্তি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশকে সব দিক থেকে অনেক সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু এই ‘অপার সম্ভাবনা’কে পাশ কাটিয়ে পর্দার আড়ালে থেকে ক্রমাগত সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলায় ব্যস্ত এক শ্রেণির মানুষ। অর্থনীতির গতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা আগেও হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কিছুদিন আগে আশাব্যঞ্জক এক ঘোষণা আসে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তরফে। বন্ধ কলকারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঘোষণার পেছনেও কারণ রয়েছে। বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেশ কয়েকবার বন্ধ থাকা কলকারখানা চালুর ব্যাপারে জোরেশোরে কথা বলেছেন। ১২ ফেব্রুয়ারির বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার ইঙ্গিত ছিল। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি চাঙা করার স্পষ্ট ব্যাপার ছিল ইশতিহারে। এ কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণাটি দেন। তিনি জানান, তহবিলের এই ঋণে ৬ শতাংশ সুদ সরকার ভর্তুকি হিসেবে দেবে। তার অর্থ দাঁড়ায়, গ্রাহকরা ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। তিনি আরও বলেন, বরাদ্দের ৪১ হাজার কোটি টাকা জোগান দেবে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা আসবে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মাধ্যমে। বন্ধ কলকারখানা চালুসহ কৃষি খাত, পোশাক, সিএমএসএমই ও পরিবেশবান্ধব সৃজনশীল অর্থনীতির খাতে ঋণ ও অর্থায়নের মাধ্যমে ২৫ লাখ কর্মসংস্থান হবে মর্মে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এই আনন্দ সংবাদের পশ্চাতে ঘোষণায় না থাকা কিছু বিষয় এখন জনমনে ঘোরপাক খাচ্ছে। কারা ঋণ পাবেন, কী প্রক্রিয়ায় ঋণ পাবেন এসব এখানে স্পষ্ট নয়। ধরে নিলাম, বাংলাদেশ ব্যাংক খুব সুন্দর ও জুতসই একটা নিয়ম ধরিয়ে দিল উদ্যোক্তা বা ঋণগ্রহীতাদের জন্য। এরপর প্রশ্ন দাঁড়ায় প্রদেয় এ ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার হবে?
বর্তমানে তারল্য সংকটে ধুঁকছে কিছু ব্যাংক। গ্রাহকচাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে তারা। এমতাবস্থায় আর্থিক খাতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের যে ঘোষণা দিল তা ইতিবাচক মনে হলেও এর সফলতা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ দেশে অতীতে যত কিসিমের উন্নয়ন বরাদ্দ হয়েছে সেগুলোর ওপর বদ নজর পড়েছে। অর্থ বরাদ্দের বড় ঘোষণা এলেই তারা অপতৎপরতা শুরু করে। তাই ৬০ হাজার কোটি টাকার এই ঋণ বিতরণে কঠোর নীতিমালা ও সতর্কতা জরুরি। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের এই কর্মযজ্ঞ তখনই সফলতার মুখ দেখবে, যখন যোগ্য ব্যক্তির যোগ্য প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ঋণ বণ্টিত হবে। ঋণ প্রদান প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বজনপ্রীতির প্রভাব ভর করলে এর উদ্দেশ্য মুখ থুবড়ে পড়বে। জানা যায়, প্রণোদনা তহবিলের অর্থের সবচেয়ে বড় অংশ ছাড় হবে বন্ধ কলকারখানার জন্য। আর এটি নিশ্চিতরূপে কর্মসংস্থানের ব্যাপ্তি ঘটাতে সহায়ক হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বন্ধকৃত কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে বিবেচিত হবে অথবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকের এই অর্থ সঠিকভাবে কাজে লাগানোর নিশ্চয়তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কীভাবে নেবে? খবর বলছে, প্রণোদনা তহবিল থেকে যেসব গ্রাহক ঋণ পাবেন, তাদের আয় জমা হবে এস্ক্রো হিসেবে। এই হিসাব থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চাইলেই অর্থ স্থানান্তর ও খরচ করতে পারে না। কারণ এই ব্যবস্থায় হিসাব তৃতীয় পক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এখানেও সংশয় দেখা দিতে পারে। তৃতীয় পক্ষ হোক বা হোক অন্য কোনো পক্ষ কাউকে নিরপেক্ষ ভাবার কারণ নেই। সত্যকে চেপে অর্থ নিয়ে লুকোচুরির ঘটনা অতীতে হয়েছে। প্রণোদনা প্রদানের ক্ষেত্রে তাই বিষয়গুলো নিয়ে বারবার ভাবতে হবে।
চিনি, পাট, কাগজ, সিমেন্ট, তৈরি পোশাক ইত্যাদি মিলিয়ে দেশে শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ রয়েছে। বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠান থেকে যন্ত্রপাতি ও কলকব্জা সরিয়ে নিয়ে পকেট ভারী করার অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেই সেটিকে মৃত বলে গণ্য করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কাগজে তার অস্তিত্ব থাকলেই জীবিত ভেবে ঢালাওভাবে ঋণ দেওয়া দায়িত্বশীল ভূমিকা নয়। পরীক্ষা করতে হবে কারখানাটির পুনর্জাগরণের বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা কতটুকু। এক্ষেত্রে বাজার চাহিদা, কাঁচামালের প্রাপ্যতা, বিদ্যুৎ, শ্রমশক্তি ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা সবার আগে বিবেচনায় আনতে হবে। কারখানার জমি, ভবন, যন্ত্রপাতি, লাইসেন্স বা কারখানার কোনো পূর্ব ঋণ আছে কিনা সেগুলোও খতিয়ে দেখতে হবে। কী কারণে লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে তার কারণ উদঘাটন করতে হবে। কৃষি খাত ও শিল্প খাত উভয়ই একটি দেশে অর্থনীতিকে সুদৃঢ় করার মৌলিক ভিত্তি। কৃষি কাঁচামাল জোগান দেয় এবং সেই কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে শিল্পকারখানা ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদন করে। টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সবকিছুর জন্য এই দুই খাতের বিকল্প নেই।
নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে বিএনপি সরকার রুগ্ন ও বন্ধপ্রায় শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবিত করার জন্য আর্থিক সহায়তার নামে বিভিন্ন ধরনের বাজেট বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছিল। তখন বিভিন্ন কারণে প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। মনে রাখতে হবে, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা সুদৃঢ় থাকলে তার অন্যতম ক্রেডিট যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের, একইভাবে ব্যাংকিং বা আর্থিক খাতে যেকোনো অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা হলে তার দায় থেকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুক্ত নয়। প্রণোদনার ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যবহারে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে, যদি এর বণ্টনে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবাদিহি থাকে। শিল্পায়নকে বিকশিত করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থের স্টিয়ারিং রাখতে হবে এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নই পারে শিল্পে পুনর্জাগরণের মাধ্যমে সার্বিক অর্থব্যবস্থাকে টেকসই করতে।
লেখক : ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও গবেষক