এলএনজি-এলপিজি বিতর্ক

সবার আগে দেখতে হবে ভোক্তার স্বার্থ

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০২:২২ এএম

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট ও পাইপলাইনে অপর্যাপ্ততার কারণে রান্নার কাজে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আমদানিনির্ভর এলপিজির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ঊর্ধ্বমুখী। চলমান নানামুখী বৈশ্বিক অস্থিরতা, সরবরাহ সংকট এবং একই সঙ্গে অভিযোগ আছে বেসরকারি সিন্ডিকেটের কারণ এক্ষেত্রে প্রায়ই ভোক্তাদের সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম গুনতে হচ্ছে। আবাসিক ও বাণিজ্যিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি

থাকায় এবং নতুন সংযোগ বন্ধ থাকায় এলপিজি এখন প্রধান জ্বালানি। একদিকে ভোক্তার চাহিদা, অন্যদিকে সরবরাহ সংকট এ দুইকে পুঁজি করে অনেকেই নিজেদের পকেট ভারী করছেন ভোক্তার পকেট কেটে এই অভিযোগও পুরনো। এলপিজি খাতের নৈরাজ্য কাটাতে বিশেষজ্ঞদের তরফে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ সত্ত্বেও বিগত রাজনৈতিক সরকার বিষয়টি গ্রাহ্য করেনি।

এই প্রেক্ষাপটে ৪ জুলাই ‘সাশ্রয়ী এলএনজি ছেড়ে কেন এলপিজি’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি সঙ্গতই ফের প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, সাশ্রয়ী এলএনজি ছেড়ে কেন এলপিজির প্রতি এত আগ্রহ! প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দেশের বড় শহরগুলোতে পাইপলাইন থাকায় তুলনামূলক কম খরচে এলএনজি আমদানি করে সরবরাহ করা সম্ভব। অন্যদিকে এলপিজি আমদানি করা হলে সিলিন্ডারে ভরে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে বাড়তি খরচ হয়।’ আরও বলা হয়েছে, গৃহস্থালিতে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ নিয়ে বিশ্ব একদিকে হাঁটলেও বাংলাদেশ যাচ্ছে উল্টোপথে। সরকারের তরফ থেকে বারবার সারা বিশ্বে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ সংকুচিত হয়ে আসার কথা বলা হলেও পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। শহর এলাকায় গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে এখনো পাইপলাইনকেই সবচেয়ে সস্তা ও নিরাপদ মনে করছে বিভিন্ন দেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজির পরিবর্তে এলএনজি আমদানি করে শহর এলাকায় পাইপলাইনে সরবরাহ বাড়ালে বছরে এক বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় সম্ভব। প্রতিবেশী দেশ ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ আরও দেশে কীভাবে বাড়ছে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহের নেটওয়ার্ক, তাও তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশে এলএনজির আওতা কমে আসার শঙ্কার পাশাপাশি বাড়ছে এলপিজি-নির্ভরতা। বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণের কারণে যেখানে এলপিজির দামে নাগাল টানা কঠিন হয়ে পড়ছে, তখন কেনইবা সাশ্রয়ী এলএনজি ছেড়ে এলপিজির ভাবনা তা প্রশ্নের বিষয়।

সরকারি সংস্থাগুলোও পাইপে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পক্ষে। আমরা মনে করি, সরকারকে সর্বাগ্রে দেখতে হবে ভোক্তার স্বার্থ। ব্যবহারের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সরবরাহকৃত এলএনজির ৭০ ভাগই কাজে লাগে আর এলপিজির চুলায় জ্বালানি দক্ষতার হার প্রায় ৫৫ শতাংশ। এক্ষেত্রে ব্যবহারিক তারতম্যের চিত্রটি পরিষ্কার। এলপিজি ব্যবহারে ঝুঁকির মাত্রাও যে অনেক বেশি এর নজির প্রায়ই সৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের স্মরণে আছে, দেশে এলএনজি সরবরাহের শুরুতে রান্নার গ্যাসের জন্য কোন গ্যাস উপযুক্ত এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করা হয়েছিল। ওই কমিটি সব দিক যাচাই-বাছাই করে শহর এলাকায় পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ করার বিষয়ে মতামতও দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের ১৮ মার্চে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয় তখনকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। কিন্তু কোন রহস্যজনক কারণে তা চাপা পড়ে যায়, এ নিয়ে আছে নানারকম নেতিবাচক কথা।

আমরা মনে করি, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এ ব্যাপারে সরকারকে নতুন করে ভেবে ভোক্তার স্বার্থের অনুকূলে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। পতিত রাজনৈতিক সরকারের এ ব্যাপারে আগ্রহ-অনাগ্রহের বিষয়গুলোও আমলে নেওয়া দরকার। আমরা দেখছি, এলপিজি সংকটে সরকার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হিমশিম খায়, কারণ এর নাটাই অন্য হাতে। বিইআরসি ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে এ নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিইআরসির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলব, সাশ্রয়ী এলএনজি-এলপিজি বিতর্ক নিরসনে ব্যক্তি নয়, ভোক্তার সাশ্রয়ের বিষয়টি আমলে রাখুন, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিন। নিশ্চয় আমরা বেসরকারি খাতের বিকাশের পক্ষে, কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থ যেন নাগরিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান না পায় , তা মনে রাখা বাঞ্ছনীয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত