এত পরীক্ষার্থী কেন অনুপস্থিত 

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০২:২৩ এএম

বাংলাদেশের সবচেয়ে দামি সম্পদ কী? তেল নেই, সোনা নেই, ইউরেনিয়াম নেই, লোহা নেই, মাটির নিচে কিছু গ্যাস, কয়লা আছে। মাটির ওপরে চাষাবাদের জমিও খুব বেশি নেই সবই নেতিবাচক কথা। কিন্তু একটা সম্ভাবনা আছে, যা কাজে লাগালে সম্পদ, কাজে না লাগাতে পারলে সমুহ বিপদ, তা হলো মানবসম্পদ। এই সম্পদ তৈরিতে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। তলস্তয়ের সেই বিখ্যাত প্রশ্ন অনুযায়ী প্রতিটি মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষা জীবনের কথা বিবেচনা করলে এবং বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষা বিবেচনায় নিলে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষার প্রবেশদ্বার হলো উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা। শুধু শিক্ষার্থী নয়, বাবা-মায়েরাও উৎসাহ উদ্বেগ-আশঙ্কা নিয়ে এই পরীক্ষার কথা ভাবেন। এই পরীক্ষার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন। 

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা হলো ক্রমাগত বাদ দেওয়ার একটা পদ্ধতি। সবাইকে শিক্ষিত করা হবে না, এটাই যেন এই শিক্ষাব্যবস্থার নীতি। ব্রিটিশরা যা চেয়েছিল, যে নীতি ঘোষণা করেছিল আইয়ুব খানের শরীফ কমিশন, এত রক্ত ঝরানো আন্দোলন আর স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশে যেন সেই নীতিই বহাল রয়েছে। শরীফ কমিশনে বলা হয়েছিল শিক্ষা সবার জন্য নয়। এখনো যেন সেই শিক্ষা সংকোচন নীতির নির্মম প্রদর্শনী চলছে। এখনকার নীতি হলো শিক্ষা সবাই অর্জন করতে পারবে না। পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে সেই চিত্র ফুটে উঠছে। পরিসংখ্যান বলে, দেশে প্রতি বছর শিশু জন্ম নেয় ৩৪ লাখের মতো, প্রাক প্রাথমিকে ভর্তি হয় ৩২ লাখের কিছু বেশি শিক্ষার্থী। এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১৯ লাখের কিছু বেশি শিক্ষার্থী আর গত ২ জুলাই শুরু হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দুই বছর আগে (২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় সাড়ে ৫ লাখ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। এই বয়সী শিক্ষার্থীরা জন্ম নিয়েছিল ৩৪ লাখ আর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ৯ লাখ। ইতিমধ্যেই ২৫ লাখ শিশু হারিয়ে গেছে শিক্ষার আঙ্গিনা থেকে। 

এবার উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এইচএসসি ও সমমান) নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশই অংশ নিচ্ছেন না। প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেন না। তবে এ বছর পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার এই হার অস্বাভাবিক বেশি। গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা না দেওয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হারটি প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে। গত বছর নিবন্ধিত সোয়া ৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়নি। আবার যারা পরীক্ষার জন্য ফর্ম পূরণ করেছিল তাদের অনেকেই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। পরীক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে ফরম পূরণ করেও পরীক্ষার প্রথম দিনে মোট ২৪ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। গত বছর পরীক্ষার প্রথম দিন ১৯ হাজার ৭৫৯ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। তার আগের বছর প্রথম দিনে অনুপস্থিত ছিলেন ১৫ হাজার ২০৩ পরীক্ষার্থী। ফলে পাবলিক পরীক্ষায় ফরম পূরণ করার পরেও পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থী বাড়ছে। 

সাধারণ শিক্ষার বিপরীতে কারিগরি শিক্ষার কথা বলেন অনেকেই। কিন্তু বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এ বছর এই বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের বেশি পরীক্ষার জন্য ফরমই পূরণ করেননি। কেন এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে যায় বা পরীক্ষায় অংশ নেয় না, তার সুনির্দিষ্ট কারণ কি শিক্ষায় নাকি অর্থনীতিতে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার। গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের করা একটি বিশ্লেষণে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। ওই বছর ঢাকা বোর্ডের অধীনে ৬ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৩৫০ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় ৪১ শতাংশের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ বাল্যবিবাহই ছিল অনুপস্থিতির প্রধান কারণ। এ তো গেল নারী শিক্ষার্থীদের ব্যাপার, বাকিদের ক্ষেত্রে পরীক্ষার প্রস্তুতির অভাব ও দারিদ্র্যও উল্লেখযোগ্য কারণ বলা হলেও এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, দারিদ্র্যের কারণে বাল্যবিবাহ, প্রস্তুতির অভাবে পরীক্ষা না দেওয়া, ঝরে পড়া ঘটতে থাকে।   

শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ওপরের শ্রেণিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য এবং এসএসসি পাসের পর অনেক শিক্ষার্থীর কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়া এ প্রবণতার উল্লেখযোগ্য কারণ। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার বৈষম্য ফুটে উঠে আঞ্চলিক বৈষম্যে। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষায়। শিক্ষা বোর্ড অনুযায়ী পরীক্ষা না দেওয়ার পরিসংখানেও তা স্পষ্ট। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন। বাকি ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন ফরম পূরণ করেননি। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৩৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। এক বছরে হারটি প্রায় ৬ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম প্রথম বর্ষে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে নিবন্ধন করেছিলেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ৭৮ হাজার ২৬৯ জন পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন। ৬১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেননি, যা মোট নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর ৪৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় একাদশ শ্রেণিতে (ভোকেশনাল) নিবন্ধন করেছিলেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে মাত্র ৭৫ হাজার ১৯৭ জন পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন। অপরদিকে ৯০ হাজার ৩৪৫ জন ফরম পূরণ করেননি। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশই এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ।

শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করেন না, তাহলে কেন এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে না। যে মাসে এই পরীক্ষা হচ্ছে, সেই জুলাই মাসে দুই বছর আগে বিরাট গণআন্দোলন হয়েছিল। সেই জুলাইয়ের আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীরাই তো সবচেয়ে বড় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। জুলাই পরিবর্তনের পরে অন্তর্র্বর্তী সরকার, নতুন সরকার তারা কেউই ছাত্রছাত্রী তথা যুবসমাজের সমস্যা শোনার বা বোঝার চেষ্টা করেছে কি? নাকি উন্মাদনায় ভাসিয়ে দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি  দায় অস্বীকার করেছেন? প্রশ্ন জাগে, ক্ষমতায় থেকে এই তরুণদের ভাঙতে উৎসাহিত করেছেন যত, তাদের শিক্ষাজীবন গড়ে তোলার ভাবনা কি ততটা ভাবিয়েছেন? ৩৬ শতাংশ ছাত্রছাত্রী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে না, এই বয়সী মোট তরুণদের মাত্র ২৬ শতাংশ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে। ভাবতে অবাক লাগে, দেশের ৭৪ শতাংশ ছাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত আসতেই পারছে না, যারা এলো তাদের কতজন পাস করবে, তাদের মধ্যে কতজন বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা করতে পারবে, পড়াশোনা শেষ করে কতজন প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান পাবে তার কোনোটাই নিশ্চিত নয়। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত যে, বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে আছে দেশের ভবিষ্যৎ।

জনমিতিগত সুবিধা বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের কথা খুব আলোচিত হচ্ছে। দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ তরুণ এবং যুবক বয়সী। কিন্তু যে তরুণরা শিক্ষা পেল না, দক্ষতা অর্জন করতে পারল না তারা দেশে এবং বিদেশে সস্তা এবং অদক্ষ শ্রমিক হিসেবেই বিবেচিত হবে। গার্মেন্টসনির্ভর যে অর্থনীতি তাতে দক্ষ জনগোষ্ঠীর চেয়ে সস্তা শ্রমিক বেশি প্রয়োজনীয়। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সম্পদ যেমন লুণ্ঠন চলে, তেমনি অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয় মানুষকে। আর শিক্ষার অধিকার বঞ্চনা একটা প্রজন্মকে পিছিয়ে দেয়। অল্প কিছু মানুষকে মানসম্পন্ন শিক্ষা আর বিপুল সংখ্যক মানুষকে শিক্ষাবঞ্চিত কিংবা মানহীন শিক্ষা দিয়ে বৈষম্যমুক্ত সমাজ বা উন্নত সমাজ কি গড়ে তোলা যাবে? শিক্ষায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না দিয়ে আগের থেকে কত বরাদ্দ বেড়েছে এই পরিসংখ্যানে তৃপ্তি খোঁজার চেষ্টা না করে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্র কি বেদনা অনুভব করবে না? ইতিমধ্যেই ২৫ লাখ শিশু হারিয়ে গেছে শিক্ষার আঙ্গিনা থেকে!

লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত