আ.লীগের সংঘর্ষে রণক্ষেত্র চৌদ্দগ্রাম আহত ৩০

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে আওয়ামী লীগের দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে পুলিশ সদস্যসহ উভয়পক্ষের অন্তত ৩০ নেতকর্মী আহত হয়েছেন। কুমিল্লা-১১ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও সাবেক রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক এবং চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. মিজানুর রহমানের অনুসারীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সকাল ১০টার দিকে শুরু হওয়া সংঘর্ষ চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। এ সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

সংঘর্ষ চলাকালে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র হাতে উভয়পক্ষের নেতাকর্মীরা তাণ্ডব চালায়। তারা দফায় দফায় ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। ভাঙচুর করে আশপাশের দোকানপাট, আগুন ধরিয়ে দেয় অন্তত ১০টি মোটরসাইকেলে। এ ছাড়াও মহাসড়কে আটকেপড়া বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

পরে দুপুর ১টার দিকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তিন ঘণ্টা পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চৌদ্দগ্রাম বাজারসহ আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, পুলিশ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার হুমকি এবং বিএনপি-জামায়াতের ‘নৈরাজ্যের’ প্রতিবাদে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেন চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান। একই সময়ে মহাসড়কের পাশে বঙ্গবন্ধু স্কয়ার এলাকায় কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য মুজিবুল হকের অনুসারীরাও সভা ডাকেন। এসব কর্মসূচি সামনে রেখে গত সোমবার রাত থেকে মিজানুর রহমানের অনুসারীরা চৌদ্দগ্রাম পৌর এলাকায় অবস্থান নিয়ে দোয়েল চত্বর, পাইলট স্কুল, চৌদ্দগ্রাম সরকারি কলেজ, বঙ্গবন্ধু স্কয়ার, বাজার ও হাসপাতাল এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরে গতকাল সকাল ৯টার দিকে লাঠিসোঁটা নিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন তারা। অন্যদিকে সকালে বিভিন্ন এলাকা থেকে মুজিবুল হকের অনুসারীরা মহাসড়কের পাইলট স্কুল এলাকায় জড়ো হতে থাকে। পরে সকাল সোয়া ১০টার দিকে চৌদ্দগ্রাম পাইলট স্কুলের সামনের সড়কে দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় কয়েকজন আহত হন। পরে জোট বেঁধে সাবেক মেয়র মিজানুর রহমানের অনুসারীরা মুজিবুল হক অনুসারীদের ধাওয়া দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। এ সময় তারা মুজিবুল হকের কর্মসূচির মঞ্চ ও চেয়ার ভাঙচুর করে। এর আগে সকাল ১০টার দিকে মহাসড়কের লালবাগ এলাকায় আওয়ামী লীগের শ্রম ও জনশক্তিবিষয়ক উপকমিটির সদস্য এম তমিজউদ্দিন ভূঁইয়া সেলিমের গাড়ি ভাঙচুর করে মুজিবুল হকের অনুসারীরা।

সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে ইউপি চেয়ারম্যান কাজী ফখরুল আলম ফরহাদ, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির পাটোয়ারী, পৌর আওয়ামী লীগ নেতা মনসুর আলম আজাদ, পৌর যুবলীগ নেতা ফরাস উদ্দীন রিপন ও আরিফুর রহমান মামুন, যুবলীগ নেতা আবুল হাশেম মজুমদার, ফরাশউদ্দিন রিপন, লিমন চৌধুরী ও পুলিশ কর্মকর্তা এসআই শামীমের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে বাকি আহতদের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

সংঘর্ষের বিষেয়ে আওয়ামী লীগের শ্রম ও জনশক্তিবিষয়ক উপকমিটির সদস্য এম. তমিজউদ্দিন ভূঁইয়া সেলিম বলেন, ‘অনুষ্ঠানস্থলে যাওয়ার সময় আমার ওপর হামলা চালিয়েছে তারা। আমরা এক সপ্তাহ আগে কর্মসূচি ঘোষণা করেছি, আমাদের প্রতিহত করতে তারা এ পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আমি মনে করি তারা জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এ ঘটনা ঘটিয়েছে।’

চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের নেতাকর্মীদের ধাওয়ায় তারা (মুজিবুল অনুসারীরা) পালিয়ে গেছে চৌদ্দগ্রাম বাজার থেকে। তারাই পথে পথে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে আমাদের কর্মসূচিকে বানচালের চক্রান্ত করেছে। আমার বেশ কিছু সমর্থককে আহত করেছে। থানায় অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

তবে এমপি মুজিবুল হকের অনুসারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রহমতউল্লা বাবুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা (সাবেক মেয়র মিজানুর ও তার সমর্থকরা) জামায়াত-শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। চৌদ্দগ্রামের মানুষ তাদের প্রতিহত করেছে। চৌদ্দগ্রামে মুজিবুল হকের বিকল্প নেই।’

সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি শুভ রঞ্জন চাকমা গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০০ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। উভয়পক্ষের কেউই থানায় এখনো কোনো অভিযোগ করেনি। অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রায় একই সময়ে হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জেলা পুলিশ কাজ করছে। আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।’

কুমিল্লা জেলা পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী সুপার (চৌদ্দগ্রাম সার্কেল) মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দুপক্ষই মহাসড়ক ছেড়ে চলে গেছে।’

নিজস্ব প্রতিবেদক, আঞ্চলিক সংবাদদাতা ও চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধির তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।