ঝুঁকি নিয়ে সফল খালেদা

প্রায় এক যুগ আগে বন্ধুর মাধ্যমে নরওয়েতে ৭০০ মার্কিন ডলারের পাটজাত পণ্য সরবরাহের কাজ পান খালেদা সুলতানা। অভিজ্ঞতা না থাকলেও পাটের প্রতি মমত্ব আর ভালোবাসার কারণে কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই মাঠে নেমে সফলভাবে পণ্য সরবরাহ করেন তিনি। পাটজাত হস্তশিল্পে এভাবেই যাত্রা শুরু এই নারী উদ্যোক্তার।

রাজধানীর রামপুরা এলাকায় অবস্থিত ‘জুট মার্ট অ্যান্ড ক্রাফট ইন বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খালেদা সুলতানার সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল ছোটবেলা থেকেই হস্তশিল্পের ওপর প্রবল ঝোঁক ছিল তার। উদ্ভিদবিদ্যায় স্নাতকোত্তর শেষ করে শিক্ষকতাসহ নানা পেশায় যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সবসময় ভাবতেন হস্তশিল্পের মাধ্যমে কীভাবে মানুষের লাইফ স্টাইল পরিবর্তন করা যায়, কীভাবে রপ্তানি আয় বাড়ানো যায়।

সেই ভাবনা থেকেই ২০০৮ সালে হস্তশিল্পকে পেশা হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন খালেদা। কিন্তু চাকরি করে কোনো কিছুই ঠিকমতো গোছাতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে ২০১২ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ‘জুট মার্ট অ্যান্ড ক্রাফট ইন বাংলাদেশ’-এর। তিনি বলছিলেন, নরওয়ের প্রথম চালান সফলভাবে সরবরাহ করার পর আরও তিন হাজার মার্কিন ডলারের কাজ পান তিনি। এভাবে বিভিন্ন দেশে ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পাটজাত পণ্য সরবরাহ করে আসছেন বেশ সুনামের সঙ্গে। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এখন তিনি সরাসরি রপ্তানি না করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য পাটজাত পণ্য তৈরির কাজ করছেন। পাশাপাশি ব্যবসার ভিত আরও মজবুত করার চেষ্টা করছেন দেশের বাজারে। বর্তমানে তার কারখানায় শতাধিক পাটজাত পণ্য উৎপাদন হয়।

খালেদা বলছিলেন, ‘যেকোনো ব্যবসায় ভালো করতে হলে গবেষণার পাশাপাশি অভিজ্ঞতার দরকার। কিন্তু শুরুর দিকে এ দুটোর কোনোটাই আমার ছিল না। পাটপণ্যের হস্তশিল্পের ক্ষেত্রে এটা আরও বেশি প্রযোজ্য। কারণ এই খাত এখনো সেভাবে দাঁড়াতে পারেনি।’

‘অন্য কেউ হলে হয়তো এতদিনে ব্যবসা বন্ধ করে দিত। কিন্তু আমি লেগে আছি। কারণ আমার বিশ্বাস, দেশে একদিন পাটজাত শিল্পের বড় বিপ্লব হবে। বিশ^বাজারে নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ। আমাদের দেশে বড় একটা সমস্যা হলো তথ্যের অভাব। পাটজাত শিল্প নিয়ে এখন কিছুটা তথ্য পাওয়া গেলেও শুরুটা ছিল অনেক কঠিন,’ যোগ করেন তিনি।

নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে খালেদাকে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ফলে কখনো কখনো বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আবার নিজের সবকিছু বিনিয়োগ করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। যেমন, করোনা মহামারীর কারণে ২০২০ সালের মার্চের পর বড় সংকটে পড়েন তিনি। প্রায় ৫ মাস তার কোনো আয় হয়নি। কিন্তু অফিস ভাড়া, কর্মীদের বেতনসহ নানা ব্যয় বহন করতে হয়েছে। এতে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হওয়ায় বড় অফিস ও কারখানা ছেড়ে ছোট পরিসরে নেমে আসার পাশাপাশি অনেক কর্মীকেও বাধ্য হয়ে ছাঁটাই করতে হয়েছে তার।

২০২১ সাল থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ান তিনি। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে আবার সংকট তৈরি হয়। বর্তমানে সেই সংকট কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছেন। কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে হু হু করে বাড়ছে তাতে কতদিনে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা যাবে তা নিয়ে সন্ধিহান তিনি।

খালেদা বলছিলেন, বিদ্যুতের মূল্য কয়েক দফা বাড়ানোর কারণে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এরপরও ঠিকমতো বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। কারণ জেনারেটর কেনা বা এর পরিচালনা ব্যয় বহনের সামর্থ্য তার মতো এ খাতের বেশির ভাগ উদ্যোক্তার নেই। ফলে দেশের বাজারে পণ্যের বিক্রি কমছে আর আন্তর্জাতিক বাজারে অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।

এসব চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি দক্ষ কর্মীর অভাব রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই খাত সেই অর্থে বড় না হওয়ায় ঠিকমতো কর্মী পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অভাব। অনেক ক্ষেত্রে, বিশ্ববাজারে ভারত, চীন ও ভিয়েতনাম উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নানারকম সুবিধা দেওয়ায় বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের চেয়েও কম দামে মানসম্মত পণ্য দিতে পারছে। ফলে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।

‘পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনতে পাট দিবস চালু, শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া, ১৭টি পণ্যে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করাসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীও বিভিন্ন সময়ে পাট নিয়ে নানা প্রেরণার কথা বলেন। কিন্তু তারপরও দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ধরনের সংকট রয়েছে এখনো’, বলছিলেন খালেদা সুলতানা।

তার মতে, ‘পাটের সঙ্গে আমাদের আবেগ জড়িয়ে আছে। পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বিশ্বে এর চাহিদাও ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু আমরা এর বাজার ধরতে এত বেশি দেরি করছি যে, একসময় হয়তো পাটের বিকল্প অন্য কোনো পরিবেশবান্ধব উপকরণ চলে আসবে। আমাদের অবহেলার কারণে তখন হয়তো বিপুল সম্ভাবনাময় পাটের বাজার হারাতে হবে।’

খালেদা জানান, ‘বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের জেডিপিসি আমাদের প্রাণের জায়গা। এই প্রতিষ্ঠানকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। এখানে বড় সমস্যা হলো প্রতিষ্ঠানের প্রধান এখানে বেশিদিন থাকতে পারেন না। তাকে বদলি করে নতুন আরেকজনকে পদায়ন করে সরকার। ঘন ঘন এই আসা-যাওয়ার ফলে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মূল কাজে ব্যাঘাত ঘটে। এখানে পরিবর্তন দরকার। পাশাপাশি পাট নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপকহারে পড়ালেখার সুযোগ সৃষ্টি করা। সেইসঙ্গে অনেক বেশি কার্যকর গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকতে হবে, যাতে নতুন উদ্যোক্তারা সেখানে নানা বিষয়ে জানতে ও শিখতে পারে।’

‘দেশের বাজারের উন্নয়নের পাশাপাশি বিশ্ববাজার ধরতে আমাদের পণ্যের প্রচুর ব্র্যান্ডিং করতে হবে। কম খরচে কীভাবে মানসম্মত পণ্য তৈরি করা যায় তা নিয়ে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে এ খাতের উদ্যোক্তাদের সরকার নানারকম প্রণোদনা বা আর্থিক সহায়তা দিতে পারে,’ বলেন তিনি।

খালেদা মনে করেন, এই ব্যবসায় উন্নতি করতে হলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘ঘণ ঘঙড ডরহঃবৎ ঝযড়’ি-এ অংশ নিয়ে তিনি পাটপণ্যের ব্র্যান্ডিং, দাম নির্ধারণ, উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদা সম্পর্কে জানতে ও শিখতে পেরেছেন। তিনি এই মেলার স্পন্সর ইউএসএআইডি-অর্থায়নকৃত ফিড্ দ্য ফিউচার বাংলাদেশ হর্টিকালচার অ্যাক্টিভিটি, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অফিস (টিএফও) কানাডা এবং এসএমই ফাউন্ডেশন বাংলাদেশকে অশেষ ধন্যবাদ জানান এবং একই সঙ্গে এ ধরনের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অন্যান্য মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে অনুরোধ জানান।   

নতুনদের উদ্দেশে তার পরামর্শ হলো, ভবিষ্যতে এই খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে সহজে রাতারাতি সফল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এটা অন্য ব্যবসার মতো না। এখানে সততার সঙ্গে লেগে থাকতে হবে। আন্তরিকতার সঙ্গে ভালো কাজ করতে হবে। তবেই সাফল্য আসবে।

নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানালেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে এই পেশায় লেগে থাকার কারণে হোঁচট খেয়েও অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। সেটাকে কাজে লাগিয়ে আরও ভালো কিছু করতে চাই। বতর্মানে ঢাকার পাশাপাশি খুলনা ও বরিশালের স্থানীয় নারীদের নিয়ে কাজ করছি। ভবিষ্যতে আরও অন্যান্য জেলায় কাজ করার পাশাপাশি আউটলেট বা বিক্রয়কেন্দ্র চালু করে নিজস্ব ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা আছে।’