আজ বিশ্ব ব্রেন ক্যানসার দিবস

শিশু ও বয়স্কদের ব্রেন ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি

দেশে একদম শিশু এবং যাদের বয়স ৪০ বছরের ঊর্ধ্বে, তাদের ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এই শ্রেণির মানুষ ব্রেনের ‘ম্যালিগন্যান্ট টিউমার’ দ্বারা আক্রান্ত হয়। তাদের ব্রেন টিউমার থেকে ক্যানসার দেখা দেয়। আর সাধারণত ১৮-৪০ বছর বয়সী মানুষ ‘বেনাইন টিউমারে’ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এটা সাধারণ টিউমার, যা থেকে ক্যানসার হয় না। অস্ত্রোপচারে সেরে যায়। এমন তথ্য জানিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সার্জারি অনুষদের ডিন ও নিউরোসার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সব বয়সী মানুষেরই ব্রেন টিউমার হতে পারে। বাচ্চাদেরও হতে পারে। পূর্ণবয়স্ক ও বেশি বয়স্ক মানুষেরও হয়। নারীরাও আক্রান্ত হন। তবে দেশে ঠিক কী পরিমাণ ব্রেন টিউমারের রোগী আছে, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই বলে জানান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলেন, এ ধরনের কোনো গবেষণা বাংলাদেশে হয়নি। বিএসএমএমইউর নিউরোসার্জারি বিভাগ শিগগিরই এই পরিসংখ্যান করার চেষ্টা করবে।

রোগী বাড়ছে : বাংলাদেশ সোসাইটি অব নিউরোসার্জনসের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেন বলেন, দেশে ব্রেন টিউমারের রোগী বাড়ছে। রোগ শনাক্তকরণে এমআরআই ও সিটিস্ক্যানসহ পর্যাপ্ত পরীক্ষার সুবিধা থাকায় এখন রোগ নির্ণয় হচ্ছে। তিনি বলেন, ভেজাল খাদ্যগ্রহণ, নানা ধরনের রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তা, বিভিন্ন ধরনের দূষণÑ এসব কারণে ব্রেনের ক্যানসার বাড়ছে।

এ ব্যাপারে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালের ইন্টারভেনশন নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবির সরকার হিমু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্রেন টিউমারের রোগী এখন অনেক বেশি। আগে শনাক্ত করার আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না। এখন অনেক উন্নত এমআরআই মেশিন আছে, অন্যান্য ইমেজিং ব্যবস্থা আছে। এখন ধরা পড়ছে। শিশুদেরও ব্রেন টিউমার হচ্ছে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে শুরুতে নির্ণয় করা গেলে চিকিৎসায় ভালো ফল দেয়। সাধারণত পূর্ণবয়স্ক মানুষের মধ্যেই এই রোগের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

তৃণমূলে চিকিৎসা কম, শহরাঞ্চলে বেশি : ঢাকা ও জেলা শহরগুলোতে ব্রেন টিউমারের পর্যাপ্ত চিকিৎসা রয়েছে। সে অনুপাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসা অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা জানান, বাংলাদেশে এই রোগের পর্যাপ্ত চিকিৎসাব্যবস্থা রয়েছে। বিএসএমএমইউ, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ ঢাকার বাইরে অন্তত আরও ১৪টি সরকারি মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে চিকিৎসাব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালেও চিকিৎসা হচ্ছে। তবে সে অনুপাতে বিভাগীয় ও জেলা শহরের বাইরে এর চিকিৎসা অপ্রতুল।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকেই ব্রেন টিউমারের চিকিৎসা হচ্ছে। এখন আধুনিক যন্ত্রপাতি এসেছে। নাকের ভেতর দিয়ে ব্রেন টিউমারের অপারেশন হচ্ছে। ব্রেনে ছোট একটা ছিদ্র করে ক্যামেরা দিয়েও এখন অপারেশন করা হচ্ছে। এখন দরকার এই চিকিৎসা সারা দেশে বিস্তৃত করা, যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও এই সেবা পায়।

ডা. হুমায়ুন কবির সরকার হিমু বলেন, কিছু অত্যাধুনিক টেকনোলজি এখনো বাংলাদেশে নেই। যেমন রেডিও সার্জারি অপারেশন হচ্ছে না। এটাকে গামা নাইফ সার্জারি বলে। মেশিন দিয়ে ব্রেনের টিউমার ছোট করে ফেলা যায়। এমন কিছু অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে। নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল এই গামা নাইফ সার্জারি শুরুর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

শুরুতেই নির্ণয়ে ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে না : চিকিৎসকরা দ্রুত পরীক্ষা করে এই রোগ শনাক্তের পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, টিউমার ছোট থাকলে অস্ত্রোপচার করলে ভালো হয়ে যায়। টিউমার বড় হয়ে গেলে রোগ জটিল পর্যায়ে চলে যায়। অস্ত্রোপচার করলেও সম্পূর্ণ ভালো হয় না। অনেক সময় অবশ হয়ে যাওয়া হাত-পা আর ভালো হয় না। আগেই যদি শনাক্ত করা যায় ও চিকিৎসা করা যায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্রেন টিউমার ভালো হয়ে যায়।

অবশ্য ব্রেন টিউমারের অস্ত্রোপচার ব্যয়বহুল বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলেন, যেহেতু অস্ত্রোপচার প্রযুক্তিনির্ভর ও অনেক সময় লাগে, সে কারণে পৃথিবীব্যাপী এর চিকিৎসা ব্যয়বহুল। তবে বাংলাদেশে আশপাশের দেশের তুলনায় খরচ অনেক খরচ কম।

এখনো কারণ আবিষ্কার হয়নি : ঠিক কী কারণে ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ, তার সঠিক কোনো কারণ আবিষ্কার হয়নি বলে জানান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেন। তিনি বলেন, তবে অনুমান করা হয় রেডিয়েশন, জন্মগত কিছু কারণ, জিনের মিউটেশন এসব কারণে হচ্ছে। কারণটা জানতে পারলে ওষুধ দিয়েই ভালো করা যেত।

সুতরাং উপসর্গ দেখে এবং সে অনুযায়ী রোগটি শনাক্ত করে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তিনি বলেন, মাথাব্যথা হয়, হাত-পা অবস হয়ে যায়, হাঁটতে গিয়ে পড়ে যায়, চোখে দেখে না, কথা বলতে পারে না এমন উপসর্গ হলেই নিউরোসার্জন বা নিউরোলজির চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। দ্রুত পরীক্ষা করা গেলে শনাক্ত দ্রুত হয়। তখন সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রোপচার করা যায়। দ্রুত ব্যবস্থা নিলে রোগী ভালো হয়ে যায়।

এ ধরনের রোগীদের মৃত্যুহার কেমন জানতে চাইলে এই চিকিৎসক বলেন, রোগীর মৃত্যু নির্ভর করে টিউমারটা কত বড় হয়েছে ও মাথার কোনো অংশে আছে, সেটার ওপর। ব্রেনের অনেকগুলো স্পর্শকাতর অংশ আছে, যেখানে টিউমার হলে মৃত্যুহার বেশি। তবে অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে রোগীর মৃত্যুহার ১-২ শতাংশ। আগে এ হার অনেক ছিল। এখন উন্নত চিকিৎসা আসার কারণে অনেক কমে গেছে।

আজ বিশ্ব ব্রেন টিউমার দিবস : ব্রেন টিউমারের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করা হয়। ১৯৯৮ সালে গঠিত জার্মান ব্রেন টিউমার অ্যাসোসিয়েশন নামের দাতব্য সংস্থার উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। রাজধানীতে দিবসটি উপলক্ষে বিএসএমএমইউ আলোচনা সভা ও গণসচেতনতা শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে।