রাজধানীর বারিধারা এলাকার একটি বাসায় তেলাপোকা মারার স্প্রে করার পর দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন ভুক্তভোগী বাবা মোবারক হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘যাদের কারণে আমি দুই সন্তান হারিয়েছি, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হোক। আমি চাই সুষ্ঠু বিচারে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। যেন আর কোনো বাবা-মা এভাবে তাদের আদরের সন্তান না হারায়।’
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে তিনি এ কথা বলেন। মোবারক হোসেন আরও বলেন, ‘আল্লাহ আমার দুই সন্তানকে তুলে নিয়েছে, নিশ্চই আল্লাহ ভালো জানেন। কিন্তু ফুটফুটে দুই শিশুর এভাবে মৃত্যু কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না।’
এদিকে এ ঘটনায় করা মামলায় পেস্ট কন্ট্রোল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান ডিসিএস অর্গানাইজেশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও এমডিকে তিনদিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। তারা হলেন চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান এবং এমডি ফরহাদুল আমীন। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে টাঙ্গাইল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তাদের গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
বাহিনীটির অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেছেন, ঘটনার পর থেকেই মূল আসামি ডিসিএস অর্গানাইজেশন লি. কোম্পানির চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর ফরহাদুল আমিন গা ঢাকা দেন। একটা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা টের পেয়ে তাদের নিজস্ব গাড়িতে টাঙ্গাইল নরসিংদী ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে থাকেন সে কারণে তাদের ধরা সম্ভব হচ্ছিল না। এরপর তাদের ভ্রাম্যমাণ অবস্থান শনাক্ত করে নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গোয়েন্দা কর্মকর্তা হারুন বলেন, ওই পেস্টিসাইড বড় গার্মেন্টস ও বীজ গুদাম বা অনাবাসিক জায়গায় ব্যবহার করা যায়। কিন্তু ঘরবাড়িতে এ জাতীয় বিষাক্ত আইটেম ব্যবহার করা যায় না। প্রাণঘাতী এই বালাইনাশক ব্যবহারের অনুমোদন ছিল কি না, সে ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এই বিষাক্ত আইটেম কোথা থেকে কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, রাসায়নিক অনুপাত সঠিক ছিল কি না, মানবদেহের জন্য এগুলো কতটা ক্ষতিকর, এ বিষয়গুলোকে যাচাই-বাছাই করা হবে।
গোয়েন্দা পুলিশের এই অতিরিক্ত কমিশনার আরও বলেন, কীটনাশক মানব জীবনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বিশেষত তীব্র দাবদাহের এই সময়ে বিষয়টি উপলব্ধি করা দরকার ছিল পেস্টিসাইড কোম্পানির কর্মকর্তাদের। কিন্তু অর্থের লোভে কোম্পানির মালিক কর্মচারীরা স্বাস্থ্যঝুঁকির এই বিষয়টিকে উপলব্ধি না করে এবং পরিবারের সদস্যদের যথাযথ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উপদেশ না দিয়েই আনাড়ি কর্মচারীদের দিয়ে এই কীটনাশকগুলোকে স্প্রে করেছে যার ফলে দুটি শিশুর জীবন ঝরে যায়। অকালে অসুস্থ হয়ে যায় পরিবারের অন্য সদস্যরাও।
প্রসঙ্গত, বাসার পোকামাকড় তাড়ানোর জন্য বারিধারার ‘ডিসিএস অরগানাইজেশন লিমিটেড’ পেস্ট কন্ট্রোল কোম্পানিকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন। ওই কোম্পানির কর্মীরা ২ জুন বাসায় বালাইনাশক দিয়ে যায়। ওই পরিবার বাসায় ওঠার পর সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েন। ৪ জুন সকালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় মোবারক হোসেনের ৯ বছর বয়সী ছেলে শাহিল মোবারত জায়ান। পরে রাতে মারা যায় তার ভাই ১৫ বছর বয়সী শায়েন মোবারত জাহিন। এ ঘটনায় ভাটারা থানায় মামলা করেন দুই শিশুর বাবা মোবারক হোসেন। সেই মামলায় ৫ জুন রাতে ডিসিএসকর্মী টিটু মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়।