দেশে নারীর চেয়ে পুরুষ রক্তদাতা ৯ গুণ বেশি

দেশে বছরে মোট রক্তের চাহিদা ১৩ লাখ ব্যাগ। কিন্তু সংগ্রহ হচ্ছে ৯ লাখ ব্যাগ, অর্থাৎ ঘাটতি থেকে যাচ্ছে ৪ লাখ ব্যাগ। এর মধ্যে স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতার মাধ্যমে আসছে ৩২ শতাংশ। বাকি রক্ত আসছে রিপ্লেসমেন্ট ডোনার বা রোগীর আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনের মাধ্যমে এবং পার্টি ডোনার বা যে রোগী রক্ত নেবে, তার লোকজনের থেকে সমপরিমাণ যেকোনো গ্রুপের রক্তদানের মাধ্যমে।

এমন তথ্য জানিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শেখ সাইফুল ইসলাম শাহীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা বা ভলান্টিয়ার ডোনার খুবই কম। গত বছর ছিল ৩১ শতাংশ, এবার ৩২ শতাংশ হয়েছে। অথচ বিশে্ব অনেক দেশে স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতার সংখ্যা শতভাগ। আমাদের দেশে বেশি পার্টি বা রিলেটিভ ডোনার। আমাদের স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা বাড়াতে হবে। তাহলে রক্তের সমস্যা হবে না।’

এই প্রেক্ষাপটে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব রক্তদাতা দিবস রক্তের ঘাটতি রয়েই গেছে : জাতীয় পর্যায়ে সারা দেশে এখনো বছরে ৪ লাখ ব্যাগ রক্তের ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছে বিএসএমএমইউ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, স্বেচ্ছায় রক্ত দেওয়ার জন্য অনেক মানুষের আগ্রহ আছে। কিন্তু সমন্বয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না।

এ ব্যাপারে ডা. শেখ সাইফুল ইসলাম শাহীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে ‘সেন্ট্রাল ব্লাড ডোনেশন সিস্টেম’ দরকার। তাহলে রক্তের সঠিক সরবরাহ হবে, রক্তের অপচয় হবে না। এখন অনেক সেন্টারে রক্ত কম, অথচ তাদের চাহিদা বেশি। অনেক সেন্টারে রক্ত বেশি, তারা সরবরাহ করতে পারছে না। আবার অনেক সেন্টার আছে রক্তই পাচ্ছে না।

চাহিদা অনুপাতে রক্ত সংগ্রহ কম হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রমের সংগঠক (কোয়ান্টাম ল্যাব) শামীমা নাসরিন মুন্নী। তিনি জানান, ল্যাব ও ক্যাম্প মিলে তাদের বছরে ৬০-৬৫ হাজার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ হয়। কিন্তু ১ লাখ ২২ হাজারের বেশি গ্রাহক গত বছরে রক্ত চেয়েছে। সন্ধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ ইউনিটের অফিস ব্যবস্থাপক আগবুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ ইউনিট প্রতি বছর ৪-৫ হাজার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করতে পারে। গোটা দেশে সন্ধানী সংগ্রহ করতে পারে ৪০-৪৫ হাজার ব্যাগ। অথচ এর বিপরীতে চাহিদা তিন গুণ বেশি। সমস্যা হচ্ছে রক্ত সরবরাহব্যবস্থা ভালো নয়, দুর্বল। সে কারণে সঠিকভাবে এই সেবা মানুষকে দিতে পারি না।’

নিয়মিত রক্তদাতা ৬% : দেশে নিয়মিত রক্তদাতার সংখ্যা খুবই কম বলে জানিয়েছেন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সংগঠক শামীমা নাসরিন মুন্নী। তিনি জানান, দেশে রক্তদাতা বেড়েছে। কিন্তু নিয়মিত রক্তদান করার অভ্যাস বাড়েনি। যেমন গত পাঁচ বছরে (২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত) কোয়ান্টাম ল্যাব ও ক্যাম্পে রক্ত দান করেছেন ৩ লাখ ১ হাজার ৮৯২ জন। তাদের মধ্যে নিয়মিত রক্তদাতা ছিলেন মাত্র ১৮ হাজার ৩৯৩ জন, যা মোট রক্তদাতার মাত্র ৬ শতাংশ। এ সময় নতুন রক্তদাতা ছিলেন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪০৪ জন এবং একবার রক্ত দান করেছেন ১ লাখ ৩১ হাজার ১১ জন।

নারীর চেয়ে পুরুষ ৯ গুণ বেশি : দেশে নারীর চেয়ে পুরুষ রক্তদাতা অনেক বেশি বলে জানিয়েছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২৩ বছরে (২০০০-৩১ মে ২০২৩ সাল) তাদের ল্যাবে ও ক্যাম্পে রক্তদান করেছেন ৪৮ হাজার ৯১১ জন। বিপরীতে এ সময় (২০০০-১০ জুন ২০২৩ সাল) পুরুষ রক্তদাতার সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ২৬ হাজার ১০৭; অর্থাৎ নারী রক্তদাতার চেয়ে পুরুষ রক্তদাতা ৯ গুণ বেশি।

এ ব্যাপারে আগবুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে পুরুষ রক্তদাতা বেশি। মোট রক্তদাতার ৭০ শতাংশ পুরুষ ও ৩০ শতাংশ নারী। অথচ নারী-পুরুষ সবাই রক্ত দিতে পারেন। তবে নারীদের ক্ষেত্রে রক্তদানে কিছুটা বাধা আছে। যেমন ঋতুস্রাবের সময়, গর্ভাবস্থায় ও অস্ত্রোপচার হলে তিনি রক্ত দিতে পারবেন না।

বেশি চাহিদা তিন গ্রুপের : দেশে তিন গ্রুপের রক্তের চাহিদা বেশি বলে জানায় সন্ধানী ঢাকা মেডিকেল কলেজ ইউনিট। সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, মোট আট গ্রুপের রক্তের মধ্যে ও পজিটিভ, বি পজিটিভ ও এ পজিটিভ রক্তের চাহিদা ও সংগ্রহ বেশি। সে তুলনায় এবি পজিটিভ রক্তের কিছুটা সংকট আছে। এরপর এ নেগেটিভ, বি নেগেটিভ এবং ও নেগেটিভ রক্তের চাহিদা কিছুটা কম। সবচেয়ে কম চাহিদা এবি নেগেটিভ রক্তের এবং এই গ্রুপের রক্তদাতার সংখ্যাও কম। যেমন সন্ধানী এই গ্রুপের রক্ত বছরে ২০-৩০ ব্যাগের বেশি সংগ্রহ করতে পারে না, রক্তের জন্য রোগীও পান না।

রক্তদানে শরীরে রক্ত ঘাটতির সুযোগ নেই : শামীমা নাসরিন মুন্নী বলেন, একজন সুস্থ মানুষ, তার বয়স যদি ১৮ বছর হয় এবং তার ওজন যদি পুরুষদের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৫০ কেজি ও নারীদের ক্ষেত্রে ৪৫ কেজি হয় ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকেন, তাহলে চার মাস পর পর বছরে তিনবার রক্ত দিতে পারেন। রক্তদানের ফলে তার শরীরে রক্ত ঘাটতির কোনো সুযোগ নেই। কারণ একজন ৫০ কেজি ওজনের মানুষের শরীরে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ এমএল রক্ত থাকে। কিন্তু তার প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রয়োজন হয় ৫০ এমএল; অর্থাৎ প্রতি কেজিতে ২৬ এমএল পরিমাণ অতিরিক্ত রক্ত থাকে। ফলে যে কেউ অনায়াসে রক্ত দিতে পারেন। কারণ রক্তদাতার শরীর থেকে এক ব্যাগ বা সর্বোচ্চ ৩৫০-৪৫০ এমএল পরিমাণ রক্ত নেই, যা অতিরিক্ত রক্তেরও খুব সামান্য একটা অংশ।

এই সংগঠক বলেন, যারা নিয়মিত রক্তদান করেন, তাদের শারীরিক সুস্থতা অনেক বেড়ে যায়। তাদের রক্ত উৎপাদনের যে বোনম্যারো, সেটা রক্ত উৎপাদনে আরও সচল হয়, নতুন নতুন রক্তকণিকা তৈরিতে উদ্দীপ্ত হয়। যারা নিয়মিত রক্তদান করেন, তাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যানসার সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যায়। যারা রক্ত দান করেন, তাদের বিনা মূল্যে পাঁচটি রোগের পরীক্ষা করা হয়। এগুলো হলো হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া ও এইচআইভি এইডস।

বিশ্ব রক্তদাতা দিবস : বিশে্বর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘রক্ত দিন, প্লাজমা দিন, প্রায়ই দিন, জীবন বাঁচান’। দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীতে আইইউবি মিলনায়তনে স্বেচ্ছা রক্তদাতা ও থ্যালাসেমিয়া রক্তগ্রহীতাদের মিলনমেলা ও সেমিনারের আয়োজন করেছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন।