রাজধানীর বাজারগুলোতে বছরজুড়ে মৌসুমি সবজির দাম ওঠানামার মধ্যে থাকে। বাজারে অন্যান্য সবজি যখন ৬০-৮০ টাকা নিচে পাওয়া মুশকিল, তখন কম আয়ের মানুষের কাছে ২৫-৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া পেঁপে আশীর্বাদ হয়ে আসে। তবে চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলের দিকে অন্য সব সবজির সঙ্গে হঠাৎ করেই পেঁপের দামে উত্তাপ বাড়ে। প্রতি কেজি কাঁচা পেঁপে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়; যা গত বছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ৩০-৩৫ টাকায়। তবে বছরের নতুন পেঁপে বাজারে আসায় ২০ টাকা কমে বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁপে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজির কারণে বরাবর কৃষককে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে। এদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে সবাই ঠকছে। এ ছাড়া সরকারের বাজার তদারকির অভাবে মধ্যস্বত্বভোগী দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
জানা যায়, কৃষক থেকে তিন হাত ঘুরে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছায় পেঁপে। এ সময়ের মধ্যে প্রতি কেজি পেঁপের দাম কৃষক পর্যায়ে ২০-২২ টাকায় বিক্রি হয়ে ফড়িয়া পর্যায়ে আসে। কেজিপ্রতি ৫ টাকা লাভে ফড়িয়ারা বিক্রি করে থাকেন পাইকারদের কাছে। পাইকাররা আরও ৪-৫ টাকা লাভে প্রতি কেজি পেঁপে খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করেন; অর্থাৎ খুচরা ব্যবসায়ী ৩২ টাকায় কিনে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি করেন ৬০ টাকা করে।
বরিশালের বাবুগঞ্জের পেঁপেচাষি সিদ্দিক জানান, ১ দশকের বেশি সময় ধরে তিনি কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। অন্যান্য আবাদের থেকে তুলনামূলক খরচ কম হওয়ায় ৫ বছর ধরে পেঁপে চাষ করছেন। ভালো মানের পেঁপে হলে ভালো দর পেয়ে থাকেন। এবার প্রায় ১ বিঘা জমিতে তিনি পেঁপের আবাদ করেছেন। ফলন পুরোপুরি এখনো আসেনি। তবে নতুন ফলনে প্রথম চালান তিনি স্থানীয় পাইকারদের কাছে বিক্রি করেছেন প্রতি মণ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়।
একই এলাকার লিটন নামের আরেক চাষি জানান, পেঁপের বাজারদর হয় দুইভাবে। এর মানে ভালো এমন পেঁপের মণ বিক্রি হয় সাড় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। আর কিছুটা খারাপ মানের পেঁপের মণ বিক্রি হয় ৬০০ থেকে সাড়ে ৬০০ টাকায়।
মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, টাউনহল বাজার ও এর আশপাশের মহল্লার দোকান ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য সবজির মতো পেঁপের বাজারও তেতে আছে। প্রতি কেজি কাঁচা পেঁপে কিনতে ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে ৬০ টাকা। অথচ একই পেঁপে পাল্লা হিসেবে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৬০ টাকায়, যা কেজি দরে দাম পড়ে ৩০-৩২ টাকার মধ্যে।
পাইকার ও খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বেশি। তার ওপর স্থানীয় হাট থেকে শুরু করে খুচরা পর্যায়ের বাজার পর্যন্ত সব স্তরে নামে-বেনামে চাঁদা দিতে হয়। এতে পণ্যের দাম ডাবল পড়ে যায়।
কারওয়ান বাজারের পেঁপে ব্যবসায়ী বাচ্চু (ছদ্ম নাম) ক্ষেপে যান। একপর্যায়ে চাঁদাবাজিকে দায়ী করে পেঁপেসহ সব সবজির দাম বাড়ার বিষয় স্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দফায় দফায় চাঁদা দিতে হয়, যা ব্যবসা করি, দিন শেষে হিসাব করে দেখি লাভের অংশ চাঁদাবাজারা খেয়ে নিচ্ছে।’
সবজির দাম বাড়ার নেপথ্যে চাঁদাবাজিকে দায়ী করেন মোহাম্মদপুর এলাকায় ভ্যানে সবজি বিক্রি করা আলমগীর নামের আরেক ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, দৈনিক ২০০-৩০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। সবজি বিক্রি করার আগেই স্থানীয় কিছু লাইনম্যান রয়েছে তারা এসে প্রত্যেক ব্যবসায়ীর থেকে চাঁদার টাকা নিয়ে যায়।
ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলনে, বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি রয়েছে। বাজারে কোনো সবজি ৫০ টাকার নিচে নেই। পেঁপের দাম ৬০ টাকা হওয়া অস্বাভাবিক। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বরাবর বলে আসছি, কৃষকের সঙ্গে ভোক্তার সরাসরি সংযোগ করার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে ভোক্তা ও কৃষক দুজনই বাঁচবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি বন্ধে সরকারের নজরদারি বাড়ানো দরকার। কিন্তু সরকারের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে বিষয়গুলো নিয়ে সরকার উদাসীন।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তরের জেলা যশোরে সব থেকে বেশি পেঁপে উৎপাদন হয়। এর পর ঢাকা জেলার অবস্থান। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৩ হাজার ৯২৪ হেক্টর জমিতে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৬৭৯ টন পেঁপে উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে যশোর অঞ্চলে ২ হাজার ৮৩৭ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৬ হাজার টন পেঁপে উৎপাদন হয়েছে। এরপর ঢাকা অঞ্চলে ২ হাজার ২৭ হেক্টর জমিতে ৭৫ হাজার টন পেঁপে উৎপাদন হয়েছে।