নারীর অলৌকিক শক্তির মানদন্ড

গুণ এবং বিষয়গত দিক থেকে রংপুরের নাথ গীতিকা আমাদের লোকসাহিত্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের মাটির সঙ্গে যার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়।

নাথ গীতিকা সাহিত্যে সমাজ বাস্তবতার চিত্র স্পষ্টভাবে চিত্রিত। এ গীতিকায় নারী চরিত্রের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার সার্থক পরিচয় পাওয়া যায়। নাথ গীতিকার একটি কবিতায় যে বর্ণনা মেলে, বলা যায় তা তৎকালীন সমাজ বাস্তবতার একটি নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ মসৃণ দলিল। কবিতাটির বর্ণনা এভাবে

প্রথমে করিল বিভা মহিচন্দ্রের দুহিতা

যাহার রূপে মগ্ন হইল স্বর্গের দেবতা॥

জামাতাকে দেখিয়া আনন্দ নরপতি

যৌতুকে করিল দান মদন মোহন হাতি॥

তাহার পাছে করে বিভা নেহালচন্দ্রের ঝি

দেবতাক জিনিয়া কন্যার রূপ কব কি॥

কন্যা বর দেখিয়া তুষ্ট হইল রাজন

যৌতুকে করিল দান রজত কাঞ্চন॥

শ্বেত নেত বস্ত্র দিল আর জামা জোড়া

চড়িয়া বেড়াইতে দিল তাজিনামে ঘোড়া॥

জলপথের দিল মান্য নৌকা জলকর

যাহার উপরে আছে সুবর্ণের ঘর॥

তাহার পাছে করিল বিভা হরিচন্দ্রের কন্যা

পৃথিবীর মধ্যে সেহি রূপে গুণে ধন্যা॥

হরিচন্দের কন্যা অদুনা তাহার নাম

শচীরতি রম্ভা জিনি রূপে অনুপম॥

অরুণ জিনিয়া মুখ চন্দ্র শশধর

ধ্যান ভঙ্গ হয় কত দেখিয়া মুনিবর॥

কন্যা পাত্র দেখি রাজার মনেতে কৌতুক

ছোট কন্যা পদুনাক করিল যৌতুক।।

----- ------   ----------

তিন বিভা করিল রাজা পাইল চারি নারী॥ 

এ কবিতার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নাথ গীতিকার সেই সমাজব্যবস্থা আজকের যুগেও বিন্দুমাত্র পরিবর্তিত না হয়ে এখনো প্রবহমান আছে। নারী জীবনের রূপ সৌন্দর্যকে আজকের যুগের মতো নাথ যুগের লোকরাও পণ্য হিসেবে গণ্য করত।

অন্যদিকে জ্ঞানার্জনের জন্য বৈরাগ্য গ্রহণ করা ছিল নাথ সম্প্রদায়ের লোক মানসের জীবনদর্শন। নাথ গীতিকা থেকে উদ্ধৃত করছি :

যে জন করিতে চাহে স্ত্রী লয়া ঘর

জ্ঞান সাধিতে না পারিবে না হবে অমর॥

নারী পুরী ছাড়িয়া যদি হয় দেশান্তরী 

তবে সে তাহাকে আমি জ্ঞান দিতে পারি॥

নাথ গীতিকায় নারী চরিত্রগুলোকে অলৌকিক শক্তির মানদ-ে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু তার পরও সংসার জীবনের বাস্তবক্ষেত্র থেকে কিছু নারী চরিত্রকে তুলে আনা হয়েছে। কোমলময়ী নারীজীবনে একবার ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হলে সে বন্ধনের বাইরের কঠিন জগতে সে আর ফিরে যেতে চায় না। আমাদের সংসার জীবনের বাস্তব নারী হৃদয়ের এক চিরন্তন আদর্শ। আর এই আদর্শই ব্যক্ত হয়েছে অদুনা-পদুনা নামক দুই নারী চরিত্রের মধ্য দিয়ে। নারী হৃদয় ভা-ারের সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিয়ে তার মনোজগতে ধরে রাখতে চায় কাক্সিক্ষত মানুষকে। নাথ গীতিকায় নারী হৃদয়ের শেষ অবলম্বনটুকু হলো তাদের হৃদয়ের আকুল অনুনয় এবং মিনতি

না যাইও রাজা না যাইও রাজা দূর দেশান্তর

কার লাগি বান্ধিলাম শতীল মন্দির ঘর॥

বান্ধিলাম বাঙ্গালা ঘর নাহি পড়ে কালি।

এমন বয়সে ছাড়ি যাও আমার বৃথা গাভুরালি॥

নিজের স্বপনে রাজা হব দরশন।

পালঙ্কে ফেনাইব হস্ত নাই প্রাণের ধন।।

নাথ গীতিকায় উল্লেখ আছে, দরবেশ-সন্ন্যাসী তাদের সিদ্ধি লাভের পথে কোনো নারীকে সঙ্গী হিসেবে নিতে পারে না। কিন্তু সন্ন্যাস জীবনের আদর্শের সঙ্গে স্ত্রী পরিচিত নয়। তাই স্বামীর সঙ্গলাভের প্রত্যাশা নারীর কচি মন থেকেও সীমাহীন আকুতি হিসেবে বেরিয়ে আসে। এ আকুতিতে সন্ন্যাস হৃদয় সিক্ত হলেও অন্তরায় হয়ে থাকে তার আদর্শ। তাই নিরুপায় স্বামী স্ত্রীকে বাঘের ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখতে চায়। তার পরও স্ত্রীর শিশুসুলভ কচি মন দমে থাকতে চায় না। গীতিকা মধ্যে তার প্রকাশ

খায়না কেনে বনের বাঘে তাকে নাই ডর।

নিস্কলন্ধে মরণ হউক স্বামীর পদতল।’  

এখানে স্বামীর সাহচর্যে স্ত্রী তার মরণকেও মেনে নিতে প্রস্তুত। রংপুরের নাথ গীতিকার এ চিত্র যে আমাদের বাস্তব নারী হৃদয়েরই অনুরণিত রূপ এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।        

আমরা রংপুরের নাথ গীতিকা থেকে যেসব তথ্য পেয়ে থাকি, সেগুলো আমাদের বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনের সাক্ষী। এর মধ্যে সামাজিক-পারিবারিক বিষয়গুলো আমাদের সবচেয়ে চোখে পড়ে। নাথ সাহিত্যের গীতিকাগুলোতেই তা প্রকাশ পেয়েছে। নাথ সাহিত্যে প্রাপ্ত গীতিকা থেকে অতীতের বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতের নিদর্শন মেলে, যা বাংলা লোকসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছে। যাতে ফুটে উঠেছে লোকায়ত বাংলার আদিম পরিচয়।

লেখক : শিক্ষাবিদ