টিকতে হলে বাড়াতে হবে যাত্রীসেবা

রাজধানীবাসীর মধ্যে দিন দিন বাড়ছে মেট্রোরেলের চাহিদা। চলাচলের সময়সূচি বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উড়ালপথে চলাচল করছে বিদ্যুৎচালিত এই ট্রেন। এরই মধ্যে আবার তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদেরও চাপ দেখা যাচ্ছে মেট্রোরেলে। আগারগাঁও থেকে উত্তরা পর্যন্ত স্টেশনগুলোতে পিক আওয়ার এবং অফ পিক আওয়ারে আগের চেয়ে যাত্রীর চাপ বেড়েছে। ভাড়া কিছুটা বেশি দিয়ে হলেও যাত্রীদের অনেকেই তীব্র গরম থেকে স্বস্তি পেতে স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় মেট্রোরেল ব্যবহার করছেন। আর এতে করে বৃহত্তর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে চলাচলকারী বাসগুলোতে যাত্রী সংকট দেখা দিচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মেট্রোরেলের প্রভাবে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে চলাচলকারী বাসগুলোতে স্বল্প দূরত্বের যাত্রী এরই মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে। মূলত চলাচলের সময়সূচি বাড়িয়ে দেওয়ায় মিরপুর এলাকার যাত্রীরা মেট্রোরেল ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছেন। আর মিরপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পুরো অংশ চালু হলে মিরপুরগামী বাসে আরও বেশি যাত্রী সংকট দেখা যাবে।

সম্প্রতি আগারগাঁও থেকে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকার বাসস্ট্যান্ডগুলো ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ স্ট্যান্ডে যাত্রীদের অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকছে বাসগুলো। একসময় মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীদের যে চাপ ছিল তা আর আগের মতো নেই। অন্যদিকে মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোর যাত্রীর চাপ আগের চেয়ে বাড়তে দেখা গেছে।

মেট্রোরেলের আগারগাঁও স্টেশনে কথা হয় যাত্রী মো. সুমনের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বাসা মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায়। আগারগাঁও থেকে মিরপুরের গণপরিবহনে যাতায়াত করলে তীব্র গরম সইতে হবে। সেই সঙ্গে লক্কড় ঝক্কড় বাসে চড়া খুবই কষ্টকর। তাই ২০ টাকার টিকিট কেটে মিরপুর যাব মেট্রোরেলের এসি কোচে। খুব অল্প সময়ে গন্তব্য পৌঁছাতে ভালোই লাগে।’

মেট্রোরেলের মিরপুর ১০ নম্বর স্টেশনের আরেক যাত্রী মো. পুর্বান আলী বলেন, ‘বাসে চলাচল করতে ভালো লাগে না। স্বল্প দূরত্বে রিকশায় যাতায়াত করা হতো। কিন্তু মিরপুরের স্টেশনগুলো চালু হওয়ার পর মেট্রোরেলে চলাচল করা হয়। আর এই গরমে কম সময়ে পৌঁছাতে মেট্রোরেলই এখন ভরসা।’

বাসে না উঠে চলাচলের ক্ষেত্রে মেট্রোরেলের র‌্যাপিড পাস ব্যবহার করেন মিরপুরের বাসিন্দা মো. দীন ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিরপুর এলাকায় স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় আগের মতো বাসে ওঠা হয় না। এখন দ্রুত যাতায়াতের জন্য মেট্রোরেলে আসা-যাওয়া করা হয়। তবে মতিঝিল পর্যন্ত লাইন চালু হলে আরও সুবিধা হতো।’

মিরপুর এলাকায় চলাচল করা অছিম পরিবহনের একটি বাসের চালকের সহকারী (হেলপার) মো. শাহীন বলেন, ‘মিরপুর এলাকায় এখন যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। অল্প দূরত্বের বেশিরভাগ যাত্রী মেট্রোরেলে উঠে যাচ্ছে। দিন শেষে বাসের মালিককে জমার টাকা দিতেও সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। সামনে আরও বড় রকমের সমস্যা হতে পারে মেট্রোরেলের সব অংশ চালু হলে।’

প্রায় একই ধরনের তথ্য জানান তানজীল পরিবহনের একটি বাসের হেলপার মো. তানভীর। তিনি বলেন, ‘মিরপুর এলাকায় স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ যাত্রী কমেছে। চোখের সামনে দিয়ে মেট্রোরেল এক সঙ্গে শত শত যাত্রী নিয়ে যাচ্ছে। সামনে আরও যাত্রী সংকটে পড়বে এই রোডের বাসগুলো।’

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাসের ও সেবার মান বাড়িয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হবে বলে মনে করছেন বাস মালিকরা। এ প্রসঙ্গে বিহঙ্গ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেট্রোরেলে যাত্রী গেলে আমাদের আর কী করার থাকে। মেট্রোরেলের পুরো অংশ চালু হলে একটা শঙ্কা তো থাকেই। তাছাড়া আমাদের এমন অনেক বাস আছে, যেগুলোর ফ্যান ও বসার সিটে নানারকম সমস্যা আছে। সেগুলো ঠিক করা হবে। আর যেসব বাস চলাচলে অনুপযোগী, সেগুলোর বদলে নতুন বাস নামাব। কারণ এত কিছুর পরও কিছু যাত্রী তো থাকবে যারা বাস দিয়ে চলাচল করবে। তাদের কথা বিবেচনা করে হলেও আমাদের এই পরিবর্তন আনতে হবে।’

এ বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘মেট্রোরেল পুরোদমে চালু হলে মিরপুর এলাকায় চলাচল করা বাসে যাত্রী কমার শঙ্কা আগে থেকেই ছিল। এখন মেট্রোরেলে যাতায়াত করলেও কিছু অংশের যাত্রী বাস দিয়েও যাতায়াত করবে। সেই যাত্রীদের জন্য আগের থেকে বাসের মান বাড়িয়ে যাত্রীসেবা চালিয়ে যেতে হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এক নেতার কাছ থেকে জানা যায়, যাত্রী সংকটে মিরপুর এলাকায় চলাচলকারী কয়েকটি কোম্পানির বাস এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। মেট্রোরেল পুরোদমে চালু হলে এসব রুটের আরও অনেক কোম্পানির বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন মানুষ যাতায়াতে স্বস্তি খুঁজে। আমাদের সড়কে যেসব গণপরিবহন চলাচল করে সেগুলোর বেশিরভাগের বেহালদশা। ফলে যাতায়াতে কষ্ট পায় যাত্রীরা। অন্যদিকে মেট্রোরেল হলো আরামদায়ক বাহন। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হলে যাত্রীসংখ্যা আরও বাড়বে। সেই সঙ্গে এই এলাকার বাসগুলোর মান যদি না বাড়ায় তাহলে বড় রকমের যাত্রী সংকটে পড়বে এসব বাস কোম্পানি।’