মণিপুরে মন্ত্রীর বাড়িতে আগুন

জাতিগত দাঙ্গাকবলিত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মণিপুর রাজ্যের ইম্ফলে কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রাজকুমার রঞ্জন সিংয়ের বাড়িতে আবার হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। তবে এ সময় মন্ত্রী বা তার পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে ছিলেন না। এ নিয়ে ওই প্রতিমন্ত্রীর বাড়িতে দ্বিতীয় দফায় হামলার ঘটনা ঘটে।

গতকালের ঘটনার পর রঞ্জন সিং ভারতের একটি সংবাদ সংস্থাকে জানান, তিনি বর্তমানে দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যে আছেন। ফলে তিনি বা তার পরিবারের কেউই আহত হননি। দুর্বৃত্তরা পেট্রলবোমা নিয়ে হামলা চালিয়েছিল। হামলায় তার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে মে মাসের শেষ সপ্তাহে ইম্ফলের পাশে বিষ্ণুপুর জেলায় রঞ্জন সিংয়ের অপর একটি বাড়িতে হামলা চালানো হয়। সে সময় তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা ওই বাড়িতে ছিলেন। তবে তারা আক্রান্ত হননি।

গতকাল মন্ত্রীর নিরাপত্তা দলের এক সদস্য জানিয়েছেন, হামলার সময় উত্তেজিত জনতা চারদিক থেকে বাড়িটি লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে। প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ বাড়িটিতে হামলা চালিয়েছে এবং হামলাকারীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা তাদের বাধা দিতে পারেননি বলে জানিয়েছেন নিরাপত্তা দলের কমান্ডার দিনেশ^র সিং।

মণিপুরের ৩৬ লাখ জনগোষ্ঠীর ৫৩ শতাংশই মেইতেই জাতিগোষ্ঠীর সদস্য, যারা মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বী বা হিন্দু সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত। এদের অধিকাংশেরই বসবাস ইম্ফল উপত্যকায়। রাজ্যটির বাকি ৪৭ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে কুকি ও নাগারা প্রধান, তারা পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা।

১৯৮৯ সালে মণিপুরের শাসক ভারতের যুক্তরাজ্য ব্যবস্থায় যোগ দেওয়ার পর থেকে রাজ্যটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। কিন্তু গত মাসে শুরু হওয়া জাতিগত দাঙ্গা ও সহিংস পরিস্থিতি গত কয়েক বছরের মধ্যে সেখানে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

মূলত বিভিন্ন আইনি অধিকার নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেইদের সঙ্গে নাগা এবং কুকি সম্প্রদায়ের সহিংসতা ও দাঙ্গা চলছে। মন্ত্রী রঞ্জন সিং এই দাঙ্গা থামাতে দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছিলেন বলে জানিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম।

জাতিগত দাঙ্গার কারণে ভারতের পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এ রাজ্যটিতে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চরম উত্তেজনা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। এ পর্যন্ত অনেকগুলো দাঙ্গার ঘটনায় এরই মধ্যে সেখানে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সব গোষ্ঠীকে শান্তি বজায় রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। মণিপুর রাজ্যের সাধারণ নাগরিকেরা জানাচ্ছেন, সেখানে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

রাজ্যে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার গত সপ্তাহে দাঙ্গার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘উপায়ান্তর’ না পেলে ‘দেখামাত্র গুলি করার’ নির্দেশ জারি করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি করা হলেও মণিপুরে অস্থিতিশীলতা দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে এবং পরিস্থিতি জটিলই রয়ে গেছে।

জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় ও প্রান্তিক এই জনপদে দশকের পর দশক ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, সহিংসতা ও প্রান্তিকীকরণের রাজনীতি সেখানকার মূল সংকট হয়েই থেকে গেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতে ‘প্রিন্সলি স্টেট’ হিসেবে যে রাজ্যগুলোর মর্যাদা ছিল, তার একটি মণিপুর। কাশ্মীরের মতো ভারত স্বাধীন হওয়ার পরপরই মণিপুরও ভারতে যুক্ত হয়নি; বরং ১৯৪৯ সালে তারা ভারতের যুক্তরাজ্য ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। মণিপুরের শাসক মহারাজা বুদ্ধচরণ ভারত সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি সই করেন। আর তা থেকেই ওই রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদের আন্দোলনেরও সূত্রপাত।

তবে গত সপ্তাহে শুরু হওয়া দাঙ্গা ও সহিংস পরিস্থিতি কয়েক বছরের মধ্যে সেখানে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।