বিচার হয় না বলে থামে না সাংবাদিক হত্যা

দেশে একের পর এক সাংবাদিক হত্যা ও নিপীড়ন চললেও বিচার পেতে অপেক্ষা করতে হয় বছরের পর বছর। হত্যার দু-একটি ঘটনায় ১২ বছরের বেশি সময় পরে বিচারিক আদালতে বিচার মিললেও চূড়ান্ত বিচারের অনেক ক্ষেত্রেই সেটি দীর্ঘায়িত হয়।

দেশে গত সাড়ে সাত বছরে পেশাগত দায়িত্ব পালন কিংবা অন্যভাবে ৯ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। একই সময়ে শারীরিক নির্যাতন, মামলা, হয়রানি ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন অন্তত ১৪০০ সাংবাদিক। মানবাধিকার ও আইনি সহায়তা সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রে বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। আসকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালে ১ জন, ২০১৮ সালে ২ জন, ২০১৯ সালে ১ জন, ২০২০ সালে ১ জন, ২০২১ সালে ১ জন, ২০২২ সালে ১ জন নিহত হন।

সাংবাদিক খুন কিংবা নির্যাতনের বিচার মেলে না এমন প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে সাংবাদিক মহল ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে জামালপুরের বকশীগঞ্জে সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

২০১২ সালের বছর ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে সাংবাদিক দম্পতি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনিকে তাদের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন করা হয়। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ১১ বছরের বেশি সময় পার হলেও আলোচিত এই হত্যার বিচারের দাবিতে এখনো আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করেন সাংবাদিকরা। ইতিমধ্যে এ হত্যা মামলার প্রতিবেদন দিতে গত ২২ মে পর্যন্ত ৯৭ বারের মতো সময় নিয়েছে তদন্ত সংস্থা র‌্যাব।

এই ঘটনার আগে-পরেও সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। কিন্তু গত দুই দশকে বিচারে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে এমন ঘটনার নজির নেই বলে জানান আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দুই-একটি ছাড়া গত ৫০ বছরে দেশে কোনো সাংবাদিক হত্যার চূড়ান্ত বিচার হয়নি। এটির কারণ হতে পারে হয়তো এ বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আর যারা সাংবাদিক হত্যা বা নির্যাতনে অভিযুক্ত তারা সব সরকারের আমলেই প্রভাবশালী এবং সরকারি মদদপুষ্ট লোক। তারা ক্ষমতার শক্তিতে বলীয়ান হয়েই এসব করেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসব ঘটনায় বিচারের জন্য এখন আর শুধু সাংবাদিক সমাজের দাবি তুললেই হবে না, যে সমাজের জন্য সাংবাদিকরা কাজ করেন সেই সমাজ ও নাগরিক প্রতিনিধিদেরও এগিয়ে আসতে হবে।’

ব্লাস্টের (বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট) ট্রাস্টি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেকটা নীতিবিহীন রাজনীতি চলছে। যে কেনো উপায়ে অর্থবিত্ত পদ-পদবি পেতে একটা শ্রেণি উদগ্রীব এবং এজন্য তারা যে কোনো দুষ্কর্ম করতেও তৎপর। আর এটি যখন গণমাধ্যমের কল্যাণে প্রকাশ পায় তখনই তারা সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়ন ও অত্যাচার শুরু করেন। হত্যা করতেও দ্বিধা করেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘মামলার বিচারের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে সরকারপক্ষ বড় কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিচার তো হয়ই না, ন্যায়বিচার তো দূরের কথা। কেন বিচার পেতে এত অপেক্ষা করতে হবে? বিচার ছাড়া কোনো কিছুতে শান্তি আসে না এই সত্যটি সংশ্লিষ্টদের উপলব্ধি করতে হবে।’    

২০০০ সালের ১৬ জুলাই রাতে যশোরে গুলি করে হত্যা করা হয় দৈনিক জনকণ্ঠের সাংবাদিক শামছুর রহমানকে। দুইবার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেওয়ার পর ২০০৫ সালের জুন মাসে অভিযোগ গঠন করা হয়। কিন্তু আসামিপক্ষ মামলার কার্যক্রম বাতিল চেয়ে আবেদন করে হাইকোর্টে। এই আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় এ মামলার বিচারকাজ প্রায় ২৩ বছর ধরে বন্ধ।

১৯৯৮ সালের ৩০ আগস্ট খুন হন যশোরের দৈনিক রানার পত্রিকার সম্পাদক আর এম সাইফুল আলম মুকুল। ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে ২২ জনকে অভিযুক্ত করে যশোরের সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। আসামিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টে মামলাটি স্থগিত হয়ে যায়।

২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি খুলনা প্রেস ক্লাবের সামনে বোমা হামলায় নিহত হন একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক মানিক সাহা। প্রায় ১৩ বছর পর বিচারিক আদালতে এ হত্যা মামলার রায় আসে। মামলাটি এখন হাইকোর্টে বিচারাধীন। বিস্ফোরক মামলা এখনো বিচারাধীন।

২০০৪ সালের ২৭ জুন খুলনার শান্তিধাম এলাকায় সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় নিহত হন দৈনিক ‘জন্মভূমি’ পত্রিকার সম্পাদক ও খুলনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি হুমায়ুন কবির বালু। ২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি হত্যা মামলার রায়ে সাত আসামি খালাস পেয়ে যান। আর বিস্ফোরক মামলায় ২০২১ সালের ১৮ জানুয়ারি ৫ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেয় খুলনার বিচারিক আদালত। হত্যা মামলায় খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে বালুর পরিবারের করা আপিল হাইকোর্টে বিচারাধীন বলে তার পরিবারের সদস্যরা জানান।

২০০৫ সালের ১৭ নভেম্বর দৈনিক সমকালের ফরিদপুর ব্যুরো প্রধান গৌতম দাস হত্যা মামলাটি এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন। ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে শাহজাদপুর এলাকায় সংঘর্ষের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনরত একই পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুল শটগানের গুলিতে নিহত হন। এ মামলার বিচারকাজ এখনো শুরু হয়নি।

আসকের নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতিতে অস্থিরতা চলছে। সংকুচিত গণতন্ত্র আর প্রশ্নবিদ্ধ জনপ্রতিনিধিত্বের কারণে রাজনীতিতে এখন দুর্বৃত্তায়ন হচ্ছে। আর তাদের নেতিবাচক এই দিকটির প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটছে।’

তিনি বলেন, ‘একদিকে সাংবাদিকদের ওপর একের পর এক হত্যা ও নির্যাতন। অন্যদিকে হত্যা নির্যাতন হলেও সহজে বিচার মেলে না। সব মিলিয়ে পরিসংখ্যান যা বলছে এটা তারই প্রতিফলন এবং দীর্ঘদিন ধরে এটি চলে আসছে।’