কর্মজীবী নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে আবারও পৃথক ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। গোলাপি রঙের (পিং কালার) এসব বাসে চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নারীরা। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার ১৩টি রুটে ১৪ বাস দিয়ে এ সার্ভিস চালু করেছে সরকার। প্রাথমিকভাবে ঢাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে দুটি এবং বগুড়ায় দুটি বাস চলাচল করবে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে নতুন এ বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এ সময় তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নারী চালক ও কন্ডাক্টর দিয়ে পরিচালিত পিংক বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণপরিবহনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতেও এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মন্ত্রী বলেন, শুধু বাসে ওঠার পর নয়, বাসের জন্য অপেক্ষার সময় এবং বাস থেকে নামার সময়ও নারীদের জন্য নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বাসে ওঠা-নামার সময় হয়রানি, অস্বস্তি কিংবা অনিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি হলে নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারে আগ্রহ কমে যায়। তাই নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শেখ রবিউল আলম বলেন, নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের পরিবহনব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক করতে সরকার কাজ করছে। ফসিল ফুয়েলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) বাসের ব্যবহার বাড়ানো হবে। ঢাকায় মাল্টিমোডাল যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও ইভি বাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি জানান, নারী যাত্রীদের জন্য ১০০টি পিংক কালারের ইলেকট্রিক বাস ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে ৫০টি এবং পর্যায়ক্রমে ১০০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঢাকায় ১০টি রুটে পরিচালিত ১০টি বাসের মধ্যে একটি একতলা এবং ৯টি দ্বিতল বাস। চট্টগ্রামে একটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস এবং বগুড়ায় দুটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিশেষ বাস সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীর ১০৬টি, চট্টগ্রামের ১২টি এবং বগুড়ার ১৬টি সর্বমোট ১৩৪টি স্টপেজে নারী যাত্রীদের পরিবহন সেবা দেওয়া হবে।
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এমপি এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন পারভীন।
সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা ডিপো, বাস ও কাউন্টারের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের পাশাপাশি ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করেছে বিআরটিসি। সম্প্রতি বিআরটিসি ও ‘সহজ’ ডটকমের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় নির্ধারিত মহিলা বাস সার্ভিসে ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে বাসে ওঠার আগে টিকিট সংগ্রহের প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে এবং যাত্রীদের অপেক্ষার সময় ও কাউন্টার নির্ভরতা কমবে। এ ছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে ৩টি বাসে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা এবং ১টি বাসে ওয়াইফাই সুবিধা চালু করা হয়েছে। প্রতিটি বাসে ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) সংযোজন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব প্রযুক্তি সব বাসে সম্প্রসারণ করা হবে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও গাজীপুরের যেসব রুটে চলে ‘মহিলা বাস সার্ভিস’
নতুনবাজার (কোকাকোলা)-মতিঝিল রুটের বাস স্টপেজ : কোকাকোলা, নতুনবাজার, উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, আবুল হোটেল, মালিবাগ, কাকরাইল, পল্টন, গুলিস্তান, মতিঝিল। তালতলা-মতিঝিল রুটের বাস স্টপেজ : তালতলা, খিলগাঁও রেলগেট, বাসাবো, বৌদ্ধমন্দির, মুগদা, কমলাপুর রেলস্টেশন, আরামবাগ, শাপলা চত্বর, সচিবালয়। ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার-জিপিও রুটের বাস স্টপেজ : ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার, বাঁশেরপুল, কাজলা, যাত্রাবাড়ী, জনপথ মোড় (সায়দাবাদ), ওয়ারী (বলধা গার্ডেন), গুলিস্তান, পল্টন, সচিবালয়, মৎস্যভবন। মিরপুর ১০-মতিঝিল রুটের বাস স্টপেজ : মিরপুর-১০, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদগেট, কলাবাগান, শাহবাগ, পল্টন, মতিঝিল। মিরপুর-মতিঝিল রুটের বাস স্টপেজ : মিরপুর-১২, মিরপুর-১০, মিরপুর-১, টেকনিক্যাল, শ্যামলী, ফার্মগেট, শাহবাগ, গুলিস্তান, মতিঝিল। মিরপুর ১২- মতিঝিল রুটের বাস স্টপেজ : মিরপুর-১২, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ফার্মগেট, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব, গুলিস্তান, মতিঝিল। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা রুটের বাস স্টপেজ : চাষাঢ়া, শিবুমার্কেট, স্টেডিয়াম, ঝালকুড়ি, ভূঁইগড়, সাইনবোর্ড, রায়েরবাগ, শনিরআখড়া, টিকাটুলী, গুলিস্তান, মতিঝিল। মোহাম্মদপুর-মতিঝিল রুটের বাস স্টপেজ : মোহাম্মদপুর, শংকর, ঝিগাতলা, ধানমন্ডি-১৫, সিটি কলেজ, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ, পল্টন মতিঝিল, কমলাপুর। আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল রুটের বাস স্টপেজ : আব্দুল্লাহপুর, আজমপুর, এয়ারপোর্ট, খিলক্ষেত, বিশ্বরোড, কুর্মিটোলা, বনানী, মহাখালী, ফার্মগেট, শাহবাগ, মৎস্যভবন, প্রেস ক্লাব, গুলিস্তান, মতিঝিল।
গাজীপুর-বিমানবন্দর রুটের বাস স্টপেজ : গাজীপুর শিববাড়ী, গাজীপুর চৌরাস্তা, মালেকের বাড়ী, বোর্ডবাজার, গাজীপুরা, কলেজগেট, স্টেশন রোড, আব্দুল্লাহপুর, আজমপুর, বিমানবন্দর। বগুড়ার শেরপুর-মাটিডালি রুটের বাস স্টপেজ : আরডিএ স্কুল, নয়মাইল মোড়, শা. উপ. গেট, বি-ব্লক-মাঝিরা, বনানী, সাতমাথা, মহিলা কলেজ, মাটিডালি। বগুড়ার বনানী-মোকামতলা স্ট্যান্ড রুটের বাস স্টপেজ : বনানী, সাতমাথা, মহিলা কলেজ, মাটিডালি মোড়, টিএমএসএস হাসপাতাল, মহাস্থান বাজার, মোকামতলা স্ট্যান্ড।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কালুরঘাট-পতেঙ্গা রুটের বাস স্টপেজ : কালুরঘাট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ২নং গেইট, জিইসি মোড়, লালখানবাজার, টাইগারপাস, দেওয়ানহাট, চৌমুহনী, আগ্রাবাদ, বারেকবিল্ডিং, ফ্রিপোর্ট, কাঠগড়, পতেঙ্গা।
আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নগরের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র এলাকায় বেলুন উড়িয়ে ‘মহিলা বাস সার্ভিস’-এর উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ। বিআরটিসি সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম নগরে দুটি বাস দিয়ে এ সার্ভিসের যাত্রা শুরু হয়েছে। এর একটি দ্বিতল বাস। এতে আসন রয়েছে ৭৫টি। অন্য বাসটিতে আসন রয়েছে ৪৫টি। দ্বিতল বাসে একজন চালক ও দুজন সহকারী থাকবেন। অন্য বাসটিতে থাকবেন একজন চালক ও একজন সহকারী। বাসগুলো প্রায় ২২ থেকে ২৫ কিলোমিটার রুটে চলাচল করবে। কালুরঘাট থেকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা পর্যন্ত ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা। আর কালুরঘাট বা কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ভাড়া ৬৮ টাকা।
সুমাইয়া নামে এক যাত্রী বলেন, ‘বাসের জন্য অপেক্ষার সময় নারীদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, বাসের মধ্যে অস্বস্তির পরিবেশ হয়। এ কারণে নিরাপদ যাতায়াতের প্রয়োজনে নারীবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা সরকারের একটা ভালো উদ্যোগ।’ এ সময় উদ্বোধনী বাসে উঠে পতেঙ্গা যাচ্ছিলেন দিলুয়ারা খানম নামে এক নারী। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় বাসে আসন পাওয়া যায় না। দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যেতে হয়। বাসের ভেতর ভিড়ের মধ্যে অনেক সময় খারাপ স্পর্শের শিকার হতে হয়। নারীদের জন্য দেওয়া বাসে উঠে এসব হয়রানির মুখে এখন আর পড়তে হবে না।’
ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি বগুড়াতেও বিআরটিসির বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু হয়েছে। ননএসি দুটি বাসেই ভাড়া পড়বে প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা।
মঙ্গলবার বিআরটিসির ট্রেনিং গ্রাউন্ড চত্বরে বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা ও আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্ত হয় বগুড়া। উদ্বোধন শেষে বাসটি ডিপো ছেড়ে এগোতে শুরু করে তিনমাথা রেলগেট এলাকার সরকারি আজিজুল হক কলেজের সামনে পর্যন্ত, সেখান থেকে ঘুরিয়ে আবার ডিপোতে এসে উদ্বোধনী কার্যক্রম শেষ হয়। এই বাসে চালকের আসনে ছিলেন খাদিজাতুল কোবরা।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা বলেন, এটি কেবল ঢাকা, চট্টগ্রাম বা বগুড়ার বিষয় নয়; পর্যায়ক্রমে পুরো বাংলাদেশেই এ সেবা চালু হবে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের কথা চিন্তা করে তাদের নিরাপদ যাতায়াত ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রী দিয়েছিলেন, এটি তারই বাস্তবায়ন। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে হলে নারী-পুরুষ সবাইকে সমানভাবে কাজ করতে হবে। প্রতিদিন সকালে কর্মক্ষেত্র কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্দেশে বের হয়ে গণপরিবহনে ওঠা মানেই নারীদের জন্য এক ধরনের যুদ্ধ। সেই ভোগান্তির দৃশ্যপট বদলাতেই নতুন এ উদ্যোগ।
বাসে ওঠার অনুভূতি জানিয়ে শিক্ষিকা মমতাজ বলেন, আমরা গণপরিবহনে যখন ছেলেদের সঙ্গে যাতায়াত করি, অনেক ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ এই বাস সার্ভিস চালুর ফলে আমরা কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব। তবে বগুড়ার বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য দুটি বাস অনেক কম, সরকার বাস সংখ্যা আরও বাড়াবে বলে আশা করি। শিক্ষার্থী তিথি সরকার বলে, প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ বাস মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য এটা অনেক বড় অবদান রাখবে।
চালক তাসলিমা পারভীন সাথী বলেন, মূলত নারীদের নিরাপত্তার জন্যই এ ব্যবস্থা। কারণ সাধারণ বাসে নারীদের যে হয়রানির শিকার হতে হয়, তা আমরাও অনুভব করেছি। এখানে নারী চালক ও স্টাফ থাকায় কোনো অসুবিধা হবে না।
বিআরটিসির প্রশিক্ষক সুবর্ণা খাতুন জানান, বিআরএসপি প্রজেক্টের মাধ্যমে সার্কুলার দিয়ে প্রায় ৫০০ জনের মধ্য থেকে বাছাই করে দক্ষ প্রশিক্ষক ও চালক তৈরি করা হয়েছে। বগুড়াতেও বাস সংখ্যা বাড়ানো হলে সার্ভিস দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ও দক্ষ নারী চালক আমাদের প্রস্তুত আছে।
বাসগুলোর পরিচালনা পদ্ধতি ও স্থায়িত্ব নিয়ে বিআরটিসি বগুড়া বাস ডিপোর ম্যানেজার শাহিনুল ইসলাম বলেন, চাহিদার সাপেক্ষে মন্ত্রণালয় থেকে আরও বাস সরবরাহ করা হলে অন্যান্য রুটেও চালু করা হবে।