প্রাণ ফিরেছে দুদকে

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫১ এএম

ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে বিএনপির অন্যতম মূল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ। দলটি নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির সঙ্গে আপস না করার ঘোষণা দিয়ে দুর্নীতি দমন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা আনয়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেছিল। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী ও কার্যকর করার কথাও বলেছিল। সরকারের ৬ মাস পর অবশেষে দুদক পুনর্গঠনের ফলে সংস্থাটির প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে।

গত ৩ মার্চ দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার পদত্যাগ করার পর ১৭ আগস্ট নতুন কমিশন গঠন করা হয়েছে। বিগত সাড়ে ৫ মাস কমিশন না থাকায় নতুন দুর্নীতির অনুসন্ধান, মামলা দায়ের, অভিযুক্তদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করা, তদন্ত প্রতিবেদন অনুমোদন করা ও আদালতে চার্জশিট দাখিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ বন্ধ ছিল। দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত কর্মকর্তারা শুধু বিগত কমিশন আমলে অনুমোদনপ্রাপ্ত কাজগুলো চালিয়ে গেছে, তাও ধীরগতিতে।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের আগে ঘোষিত ইশতেহারে দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণকেই সরকারের সর্বপ্রথম অগ্রাধিকারের বিষয়গুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরেন। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে দুর্নীতির সঙ্গে আপস নয়। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য পদ্ধতিগত ও আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। সুশাসনের ভিত্তি হিসেবে আইনের শাসন ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দলটি। এ প্রতিশ্রুতি ভোটারদের কাছে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল।

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১৬ দিনের মাথায় গত ৩ মার্চ তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পর দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেছিলেন নির্বাচিত সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণ ও কাজের সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই তারা পদত্যাগ করেছেন।

বিএনপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার সাড়ে পাঁচ মাসের মাথায় সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রসঙ্গে প্রথমেই সামনে আসে দুদকের নেতৃত্বসংকট। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করা সরকারের জন্য এ দীর্ঘসূত্রতা নানা প্রশ্নের জন্ম দেয় । সরকারের নতুন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি গঠন করতেই ১১০ দিন সময় লেগেছে। এ বিষয়ে গত ২২ জুন প্রজ্ঞাপন জারি হয়। প্রজ্ঞাপনে দুদক চেয়ারম্যান-কমিশনার নিয়োগের সুপারিশ দিতে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সভাপতি করে বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। বাছাই কমিটিকে দুদক কমিশনারের প্রতিটি শূন্যপদের বিপরীতে দুজন করে ব্যক্তির নামের তালিকা প্রণয়ন করে রাষ্ট্রপতির কাছে দিতে বলা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী, কমিশন তিনজন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত হয়। তাদের মধ্য থেকে একজন হন চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনার। সার্চ কমিটি দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে নিয়োগে আগ্রহীদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করে। যা যাচাই-বাছাই শেষে দুদক চেয়ারম্যান-কমিশনার সুপারিশ করে। আর সেই সুপারিশের ভিত্তিতে ১৭ আগস্ট সোমবার নতুন কমিশন গঠন করা হয়।

দুদকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। আর দুই কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। নতুন কমিশন গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদে হাজির হয়ে যোগদান করেছেন। আজ থেকে তারা দুদকে কাজ শুরু করবেন।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন হাইকোর্ট বিভাগের বিচার বিভাগের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ১৯৫৯ সালের ১ মার্চ নওগাঁ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৮৩ সালে জেলা আদালতের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। এরপর ১৯৮৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগের এবং ২০০১ সালে আপিল বিভাগের আইনজীবী হন।

কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া কুমিল্লা জেলার তিতাস উপজেলার বাতাকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে এসএসসি ও ১৯৮১ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি ১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে বিকম অনার্স এবং ১৯৮৫ সালে এমকম ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ড. সাজ্জাদ ভূঁইয়া ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) ট্যাক্স ক্যাডারে যোগদান করেন। তিনি ২০২২ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তাকে ২০২৫ সালের ৪ মে তাকে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে দুদকের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

অপর কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ৮৫ ব্যাচের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ২০১৫ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত কোর্ট অব সেটেলমেন্টের সদস্য (বিচার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০২২ সালের জুলাই মাসে অবসরে যান। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি ভূতাপেক্ষা সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। আর ১৭ আগস্ট তিনি দুদক কমিশনার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।

দীর্ঘদিন ধরে ঝিমিয়ে পড়া দুদকের জন্য নতুন কমিশন গঠনের পর প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। তারা জানিয়েছেন, কমিশন না থাকায় দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রুটিনমাফিক অনুসন্ধান ও তদন্তের কিছু কাজ চালিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু যেসব কাজে কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, সেসব কাজ তারা করতে পারেননি। ফলে সেসব কাজ বন্ধ ছিল। তারা শুধু বিগত কমিশনের অনুমোদনপ্রাপ্ত অনুসন্ধান ও তদন্তের কাজগুলো করেছেন, তাও ধীরগতিতে। কমিশনের অনুপস্থিতিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

দুদকের একজন শীষপর্যায়ের কর্মকর্তা বলেন, ‘কমিশন না থাকায় দুদকের রুটিন কাজগুলো চলেছে। তবে নতুন সরকার একটি ভালো কমিশন দেবে বলে আমরা আশা ছিল। সরকার সার্চ কমিটি গঠন করেছে। এবারই প্রথম সার্চ কমিটি দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার হতে আগ্রহীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করেছে। সরকার চাইলে যে কাউকে চেয়ারম্যান-কমিশনার নিয়োগ দিতে পারত। সরকার একটি স্বচ্ছ ও স্বাধীন কমিশন গঠনের জন্য এটি করেছে।

সংশ্লিষ্টদের বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন নীতি ঘোষিত হয়েছে। সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব করতে হলে দুদককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। আগের সরকারের মামলার পাশাপাশি বর্তমান সরকারের সময়ে অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিএনপি সরকারের সময়ে দুর্নীতি কতটা কমেছে, তা দৃশ্যমান করতে হবে। জনগণ শুধু মামলা দেখতে চায় না, তারা চায় দুর্নীতির সুযোগ কমুক, রাষ্ট্রীয় অর্থ সুরক্ষিত থাকুক এবং ক্ষমতাবান-দুর্বল সবার জন্য একই আইন কার্যকর হোক।

বিএনপির ইশতেহারে অর্থ পাচার বন্ধ ও বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সরকারের সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলো বাস্তবে কত টাকা দেশে ফিরেছে। যদি অর্থ ফেরতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য না হয়, তাহলে শুধু মামলা বা সম্পদ জব্দের সংখ্যা দিয়ে অর্থ পাচারবিরোধী সাফল্য দাবি করা কঠিন। বিদেশে সম্পদ শনাক্ত করা, ব্যাংক হিসাব জব্দ করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা এক বিষয়; আর অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা আরেক বিষয়।

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন), সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মঈদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, অলরেডি দেরি হয়ে গেছে, যে ক্ষতি হয়ে গেছে, সেটি আর পূরণ হবে না। কিন্তু আগামীতে দুর্নীতি দমন করতে হলে কমিশনকে শক্ত হতে হবে। দুদকের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে আলাদা আদালত করতে হবে। কারণ দুর্নীতির মামলার নিষ্পত্তির হার মাত্র ৫ শতাংশ। নিষ্পত্তির এ গতি দিয়ে দুর্নীতি দমন হবে না। দুর্নীতি দমন করতে হলে দ্রুত বিচার করে সাজা দিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত