সারের বাড়তি দাম, মন্ত্রী বলছেন ‘ষড়যন্ত্র’

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫১ এএম

সারা দেশের কৃষকদের সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। নজরদারি বাড়ানোসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েও দামে লাগাম টানা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দাবি করেছেন এটি একটি ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’। সারের কোনো সংকট না থাকলেও সরবরাহ চেইনে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে।

দেশ রূপান্তরের কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, রাজশাহী, নাটোর, ময়মনসিংহ, শেরপুরসহ কয়েকটি জেলার প্রতিনিধিরা কৃষক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা এবং কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সারের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ইউরিয়া, টিএপি, ডিএপি ও এমওপি সার কেনার ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি ৪ টাকা থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম দিতে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) হিসাব করলে ২শ থেকে শুরু করে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে কৃষককে। কোনো কোনো জেলায় এর চেয়েও বেশি দামে সার বিক্রির খবর পাওয়া গেছে।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘আমি ৫ বিঘা জমিতে আমন রোপণ করেছি। প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ইউরিয়া ১৫শ টাকা এবং ডিএপি প্রতি বস্তা ১৪শ টাকা দরে কিনেছি। কয়েক দোকান ঘুরে এই দামে সার কিনতে হয়েছে।’

অথচ সরকারের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা। সে অনুযায়ী ইউরিয়াতে বস্তাপ্রতি ১৫০ টাকা বা কেজিতে ৩ টাকা এবং ডিএপিতে বস্তাপ্রতি ৩৫০ টাকা বা কেজিপ্রতি ৭ টাকা বেশি খরচ করতে হয়েছে কৃষককে।

এছাড়া সরকার প্রতি বস্তা টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা বা কেজি ২৭ টাকা এবং এমওপি প্রতি বস্তা ১ হাজার টাকা বা প্রতি কেজি ২০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। সারা দেশে নির্ধারিত দামে সার বিক্রি হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না।

দিনাজপুর সদর উপজেলার কমলপুর গ্রামের কৃষক আকবর আলী বলেন, বাজারে প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলারের দোকান থেকে সার পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে প্রতি কেজি ইউরিয়া ৪০ টাকা কেজি দরে কিনেছি। তিনি বলেন, জমিতে ধান রোপণ করা হচ্ছে। এখন সার ছিটাতে হবে। সময় মতো সার ছিটাতে না পারলে ক্ষতি হয়ে যাবে। আমরা সার ডিলারদের কাছে বারবার গিয়ে ঘুরে আসছি।

এই পরিস্থিতি শুধু কুড়িগ্রাম বা দিনাজপুরের নয়, সারা দেশের। কৃষি মন্ত্রণালয় এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু মাঠে খুব বেশি ইতিবাচক ফল নেই। এই বিষয়ে গতকাল কৃষি মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘সার নিয়ে মাঠে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে, এটা একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। তিনি বলেন, গত বছরের চেয়ে বেশি সারের মজুদ আমাদের কাছে আছে। অনেক জায়গায় সরকারি গুদামে সার রাখার জায়গা নেই। সার নিয়ে নতুন একটি নীতিমালা করেছি। সেজন্য যারা বঞ্চিত হবেন বলে মনে করছেন, তারা সমস্যা করছেন। যেহেতু আমাদের কাছে সার আছে, তাই ষড়যন্ত্র নিয়ে ভয় নেই। আমি বলব যারা এসব করছেন ‘এগুলো ভালো না, এগুলো করবেন না।’

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক ডিলার রয়েছেন যারা বরাদ্দকৃত সার উত্তোলন না করেই মাঠে সংকটের কথা বলছেন। অনেকে আবার তাদের বরাদ্দ খুচরা বিক্রেতা বা অন্য কোনো প্রতিনিধির কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। কিছু অসাধু ডিলার রয়েছেন যারা সিন্ডিকেট করে মাঠে অস্থিরতা তৈরি করছেন। আওয়ামী লীগ আমলের ডিলারশিপ পাওয়া কিছু ব্যক্তি মনে করছেন তাদের ডিলারশিপ থাকবে না, তারাও এর সঙ্গে জড়িত। এর সঙ্গে রয়েছে বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারদের মধ্যে রেষারেষি। এছাড়া চা বাগানের জন্য বরাদ্দ না থাকলেও নিয়মিত সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে সেখানে সার যাচ্ছে। অনেক কৃষক আছেন যারা শঙ্কা থেকে আগাম আলু চাষের জন্য সার কিনে মজুদ করছেন।

অনদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জানিয়েছে, নতুন নীতিমালার কারণে খুচরা বিক্রেতাদের বাতিল করা হবে বলে যে আলোচনা রয়েছে সেটাও প্রভাব ফেলছে। কিন্তু যাদের লাইসেন্স ঠিক নেই, একজনের লাইসেন্স দিয়ে অন্যজন ব্যবসা করছেন এমন সমস্যাযুক্ত খুচরা বিক্রেতা ছাড়া বাকিদের কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সারা দেশে এদের নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এসব কারণেই সারের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

ফলে কৃষক অনেক ক্ষেত্রেই ডিলারের কাছে সার কিনতে গেলেই বলা হচ্ছে সার নেই, বরাদ্দ কম। সরকার পর্যাপ্ত মজুদের কথা বললেও সারা দেশের ডিলাররা বলছেন, তাদের বরাদ্দ কম দেওয়া হচ্ছে। অথচ সরকার সারের বরাদ্দ বছরের শুরুতেই নির্ধারণ করে এবং সে অনুযায়ী প্রতি মাসেই সার বরাদ্দ প্রদান করছে।

কুড়িগ্রাম ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সার ডিলার শামসুল ইসলাম ম-ল দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়া যাচ্ছে। তিনি জানান, বস্তায় সরকারি মূল্য লিখা রয়েছে, ফলে বেশি দামে বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই।

একই অভিযোগ করেন ময়মনসিংহ জেলা ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাবুল। তিনিও বলেন, সারের সরবরাহ ও বরাদ্দ কম। 

এদিকে সবচেয়ে চড়া দামে সার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে রাজশাহীতে। রাজশাহী প্রতিনিধি আহসান হাবিব অপু জানান, প্রতি বস্তা টিএসপি কিনতে হচ্ছে ১৭শ থেকে ১৮শ টাকায়, ডিএপি ১৭শ থেকে ২১শ টাকা, এমওপি কিনতে খরচ করতে হচ্ছে ১২শ টাকা।

দেশ রূপান্তরের নাটোর প্রতিনিধি মো. আব্দুল হাকিম জানান, সার কিনতে হলে প্রকারভেদে বস্তাপ্রতি ৩শ থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে। সিংড়া উপজেলার কৃষক মো. হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, ডিলারের কাছে গেলে সার পাওয়া যায় না। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে বাড়তি দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে।

 সেখানকার সারের ডিলার নাজমুল হোসেন সরকার বলেন, চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম থাকায় মাঝে মধ্যে সারের ক্রাইসিস দেখা দিচ্ছে। কিছু কৃষক অগ্রিম সার কেনায় কৃত্রিম সংকট দেখা দিচ্ছে।

কৃষক, ডিলার দুজনের কথাতেই সার নিয়ে সমস্যার কথা থাকলেও নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান জানান, ‘আমন আবাদ শুরু হয়েছে মাত্র। কোথাও সারের কোনো সংকট নেই, সমস্যা নেই। অনিয়ম হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে সারা দেশের কিছু কিছু ডিলার সারের বাজারে অস্থিরতা তৈরি বা বাড়তি দাম নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন তার একটি প্রমাণ মেলে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) এক জরুরি সতর্কীকরণ চিঠি থেকে। এতে বলা হয়েছে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির খবর পাওয়া যাচ্ছে যা অনাকক্সিক্ষত। ডিলারশিপ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার স্বার্থে তাদের নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিত করতে সতর্ক করা হয়েছে।

বিএফএ চেয়ারম্যানের দেওয়া এই চিঠিতে বলা হয়েছে, জেলাগুলোতে ডিলার বা খুচরা বিক্রেতারা যাতে বেশি দাম না নিতে পারেন সেজন্য প্রতিটি জেলা কমিটিকে নজরদারি করতে বলা হয়েছে। ডিলারদের নির্ধারিত সময়ে সার উত্তোলন করে স্ব স্ব গুদামে মজুদ নিশ্চিত করে কৃষকের কাছে সারের সরবরাহ পৌঁছে দেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার সম্প্রতি সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫ (সংশোধিত) বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিয়েছে। যেখানে খুচরা বিক্রেতাদের বিলুপ্ত করা হয়েছে। এতে করে তারা ঢাকাসহ সারা দেশেই প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। এটাও সারের বাজারে অস্থিরতা তৈরির একটি কারণ। ধান উৎপাদনের বৃহত্তর এই মৌসুমের মধ্যেই এই নীতিমালার বাস্তবায়ন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য থেকে জানা গেছে, চলতি মাসের ৯ তারিখ পর্যন্ত সরকারের কাছে ৫ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ৫৩ হাজার মে.টন টিএসপি, ৩ লাখ ৯০ হাজার মে.টন ডিএপি এবং ১ লাখ ৯৬ হাজার মে.টন এমওপি সারের মজুদ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার এই চারটি সারে ভর্তুকি প্রদান করে থাকে। তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকেই তৈরি হওয়া সংকটে সরকারের সারের আমদানি বাধার মুখে পড়ে। এদিকে গ্যাসের সংকটের কারণে একটি বাদে ইউরিয়া উৎপাদনকারী বাকি কারখানাগুলোর উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে সরকার।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, নিরাপত্তা মজুদ না থাকলেও সরকারের কাছে যা সার রয়েছে তাতে করে আমন মৌসুমে কোনো সংকট তৈরি হবে না। তবে বোরো মৌসুমে এটা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এই অনিশ্চয়তা কাটানোর মতো সারের মজুদ এখনো সরকারের কাছে নেই।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন নীতিমালা নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য ছাড়ানো হচ্ছে। যা মাঠে বিশৃৃঙ্খলা তৈরি করছে। ডিলারদের মধ্যে কিছু সমস্যা রয়েছে এগুলো আমরা কঠোর মনিটরিং শুরু করেছি। এছাড়া গতকাল ৬৪ জেলার কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা করেছি। তাদের মনিটরিংয়ে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি সতর্ক করা হয়েছে অস্থিরতা তৈরিতে কারও কারও সংযোগ থাকলে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘যেসব ডিলার বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছেন তাদের অনেকের লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে এবং সামনে যারা চিহ্নিত হবেন তাদেরও ছাড় দেওয়া হবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত