রিটার্ন দাখিলের স্লিপ জমা দিয়ে ৪০ ধরনের সেবা নিতে হবে। যদি কোনো করদাতার করযোগ্য আয় না থাকে তাকেও ন্যূনতম ২০০০ টাকার কর সরকারি কোষাগারে দিয়ে রিটার্ন দাখিলের স্লিপ সংগ্রহ করে এসব সেবা নিতে হবে। নতুন আয়কর আইনের এ বিধান বাতিলের সুপারিশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটি। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল কমিটিকে খতিয়ে দেখে সাধারণ মানুষ কষ্টে না পড়ে এমন সুপারিশ করতে বলেছেন।
সম্প্রতি ন্যূনতম কর প্রদানের এ বিধান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে বলেও সংসদীয় কমিটির সুপারিশপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ন্যূনতম কর দেওয়ার বিধানসহ নতুন আয়কর আইনের আরও কিছু ধারা বাতিলের সুুপারিশ করেছে এ কমিটি। সুপারিশ প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দেওয়ার পর নতুন আয়কর আইন সংশোধন করে এ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সংশোধিত বিধান প্রস্তাবিত অর্থবিলে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করা হবে।
তবে সংসদীয় কমিটির ন্যূনতম ২০০০ টাকা কর দেওয়ার বিধান বাতিলের সুপারিশের বিপক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটি থেকে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে, আগামী অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এর পরিমাণ ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে অনলাইনে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরধারীর (টিআইএন) সংখ্যা ৮৭ লাখ। প্রতি করবর্ষে আয়কর রিটার্ন দাখিল করে গড়ে ৩২ লাখ করদাতা। ৪০ ধরনের সেবা নিতে আসা ব্যক্তিরা ন্যূনতম ২০০০ টাকা কর প্রদানে সক্ষম হওয়ার কথা। তাই ন্যূনতম এ কর প্রদান করলে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না। আয়কর আইনের এ ধারা কার্যকর করা হলে দেশে রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা এবং কর আদায় বাড়বে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর সূত্র জানায়, অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্যও প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর কাছে ন্যূনতম কর প্রদানের এ ধারার বিপক্ষে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন। তারা জানিয়েছেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন। আইনের এ ধারা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন তারা। সমালোচনা এড়াতে আইনের এ বিধান বাতিল করা প্রয়োজন।
নতুন আয়কর আইনে চিকিৎসা ও ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে বিদেশ ভ্রমণ করলেই আয়কর রিটার্ন জমার সময় সম্পদ বিবরণী দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এখানে করযোগ্য আয় যাই হোক বিদেশ গেলেই ফ্ল্যাট-জমি, আসবাব, ব্যাংক ব্যালান্সসহ যাবতীয় সম্পদের তথ্য জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খুলতে রিটার্ন জমার স্লিপ দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এসব ধারা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
নতুন এ আইনে গুলশান, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় ২০০ বর্গমিটারের ফ্ল্যাট বা ভবনে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ করের পরিমাণ বাড়িয়ে ৬ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। আবাসন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন এ বিধান কার্যকর হলে আবাসন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যা শেষ পর্যন্ত ক্রেতার ওপর পড়বে। ফ্ল্যাট বা ভবনের দাম বাড়বে।
নতুন আয়কর আইনে অংশীদারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিসংঘ এবং তহবিল যাদের বার্ষিক টার্নওভার ২ কোটি টাকার বেশি, তাদের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়। সংসদীয় কমিটির সুপারিশে যা বাড়িয়ে ৩ কোটি টাকা করা হয়েছে। সরকারি সিকিউরিটিজে দুটি শব্দ সংযোজন করে সুপারিশে সঞ্চয়পত্র ও ডিবেঞ্চারের কর ছাড় নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করা হয়েছে।
তবে নতুন আয়কর আইনের অনেক ধারা বাতিলের দাবি উঠলেও তা বাতিলে সুপারিশ করা হয়নি।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজস্ব আদায়ের আইন যুগোপযোগী ও হালনাগাদ করার প্রয়োজন আছে। এমন আইন করা যাবে না যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য কঠিন হয়ে যায়। নতুন আয়কর আইনের যে সব ধারায় আপত্তি এসেছে তা সংশোধন করা প্রয়োজন।
অর্থনীতির বিশ্লেষক এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা ঠিক না।
নতুন আয়কর আইনে কোমল পানীয় শিল্পের (বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রি) ন্যূনতম কর শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। কোমল পানীয় শিল্পের জন্য করের এ হার ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এরই মধ্যে এই খাতে ৫ থেকে ১০ শতাংশ শুল্কের পাশাপাশি ৪৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পরোক্ষ কর (এসডি ও ভ্যাট) ধার্য আছে। যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি নাসের এজাজ বিজয় বলেন, করহার বাড়ানোয় কোমল পানীয়ের দাম ৩০ শতাংশেরও বেশি বাড়বে। এতে কোমল পানীয়ের বাজার কমবে। ব্যবসা করতে না পারলে রাজস্ব আদায় কমবে। করহার বাড়ানোয় দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন না। এ খাতের জন্য ন্যূনতম কর ১ শতাংশ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
আয়কর আইন অনুযায়ী শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা এখন থেকে ডব্লিওপিপিএফ, মিউচুয়াল ফান্ড ও ডিভিডেন্ড থেকে আয়ের ওপর ছাড় পাবেন না। লিভ ফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্স করের আওতায় আনা হয়েছে। প্রণোদনা বোনাস অতিরিক্ত লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। আয়কর আইনে অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ হারে উৎসে কর ধার্য করা হয়েছে।
নতুন আয়কর আইনে শর্ত দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। এখানে অপ্রদর্শিত অর্থ প্লট বা জমি, ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্টসহ বাণিজ্যিক স্থাপনায় বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এ নিয়ে এনবিআর প্রশ্ন না তুললেও অর্থের উৎস নিয়ে দুদকসহ অন্যান্য সংস্থা প্রশ্ন তুলতে পারবে।
আবাসন খাতে উৎসে কর যৌক্তিক করা হয়েছে। একই সঙ্গে গেইন করের হার বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। গেইন কর হিসেবে চুক্তি মূল্যের শতাংশ হিসাবের পাশাপাশি এলাকাভেদে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছে। শতাংশ হিসাব বা নির্দিষ্ট পরিমাণের মধ্যে যা বেশি হবে তাই পরিশোধ করতে হবে। অন্যদিকে ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে হলে এখন থেকে সব এলাকার জন্য প্রতি বর্গমিটারের জন্য ৮০০ টাকা হিসাবে বা চুক্তি মূল্যের ৮ শতাংশের মধ্যে যা বেশি সেটা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে আয়কর আইনে।
নতুন আয়কর আইনে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা, সরল সুদ ও বিলম্ব সুদ আরোপের বিধান রাখা হয়েছে। আয়কর অধ্যাদেশের ১২৪ ধারায় বলা আছে, করদাতা যদি কোনো কারণ ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ে রিটার্ন দাখিল না করেন, আবার এজন্য অনুমোদনও না নেন, সেজন্য তার পূর্ববর্তী বছর প্রদেয় করের ১০ শতাংশ বা ১ হাজার টাকার মধ্যে যেটি বড় অঙ্ক ওই পরিমাণ অর্থ জরিমানা হবে। সেই সঙ্গে যতদিন দেরি হবে, প্রতিদিনের জন্য ৫০ টাকা হারে বাড়তি মাশুলও গুনতে হবে। ৭৩-এ ধারায় বলা আছে, ৩০ নভেম্বরের পর কর কর্মকর্তাদের অনুমতি নিয়ে দেরিতে রিটার্ন জমা দিলেও মাসিক ২ শতাংশ বিলম্ব সুদ দিতে হবে।
নতুন আয়কর আইনে সিনেমা, নাটক, বিজ্ঞাপনে অভিনয় করার জন্য পাওয়া পারিশ্রমিকের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর আরোপ করা হয়েছে। রেডিও-টিভিতে টক-শো, অনুষ্ঠানের সম্মানীর ওপরও এই কর ধার্য থাকছে।