নির্বাচনী বছরে গ্রামের উন্নয়নে ১২ প্রকল্প

শেষ মুহূর্তে এসে সরকার গ্রামের প্রকল্পগুলোকে প্রাধান্য দিচ্ছে। অর্থবছরের শেষ একনেকে অনুমোদন হওয়া প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই গ্রাম অঞ্চলের উন্নয়ন কেন্দ্র করে। গতকাল মঙ্গলবার ১৬টি প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ২৪ হাজার ৩৬২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১২ হাজার ৮৭৩ কোটি ১১ লাখ, বৈদেশিক ঋণ থেকে ১১ হাজার ৪৭২ কোটি ৮৮ লাখ এবং সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ১৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা পাওয়া যাবে।

গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানান পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম। এ সময় পরিকল্পনা বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।

একনেকে অনুমোদন হওয়া প্রকল্পগুলো তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৬টি প্রকল্পের মধ্যে ১২টি প্রকল্পই গ্রামের উন্নয়নে। ২৪ হাজার কোটির প্রকল্পের মধ্যে ১৯ হাজার ৬৫৪ কোটিই এ খাতের জন্য দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প উপজেলা পর্যায়ে নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। স্থানীয় সরকার বিভাগের এ প্রকল্পটির ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। এতে সরকারের অর্থায়ন ১ হাজার ৫৪ কোটি, বাকি ৫ হাজার ২৯১ কোটি টাকা ঋণ দেবে এডিবি ও এফডি। দেশের আট বিভাগের ৪৮টি জেলার ৮৭টি উপজেলার ৮৮টি পৌরসভায় এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

ডিজেল বাদ দিয়ে সৌরবিদ্যুতে সেচব্যবস্থা চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর :পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, দেশের সব সেচ পাম্পে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, প্রতি বছর ৮১ লাখ লিটার ডিজেল সেচকাজে খরচ হয়। তাই সেচকাজে ডিজেল যাতে ব্যবহার করতে না হয়, সেজন্য সোলার প্যানেল স্থাপন করতে হবে। কেউ যদি বেসরকারিভাবে সোলার প্যানেল স্থাপন করতে চায়, তাহলে কর মওকুফসহ সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সৌর প্যানেল তৈরির সময় একটু উঁচু করে স্থাপন করতে হবে। এর নিচে বিভিন্ন সবজি, মসলা এবং মাছ চাষ করা যায় কি না, বিষয়টি দেখতে কৃষিমন্ত্রীকে নির্দেশনা দেন তিনি। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সবাইকে একযোগে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মানুষ কষ্ট ভোগ করছে। তাদের জন্য মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে।

পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান জানান, বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে হাওর অঞ্চলে শেড নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারি অফিস বা প্রকল্প বাস্তবায়নে কম জমি ব্যবহারে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বৈদেশিক সহায়তার ব্যবহার বাড়ানোর নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান ডলার সংকট সময়ে বৈদেশিক ঋণ বাড়ানো দরকার।

একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পগুলো হলো ‘সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্পের মাধ্যমে কৃষি সেচ (দ্বিতীয় সংশোধিত)’, ‘বিসিএস (কর) একাডেমির ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’, ‘জার্মানির বার্লিনে বাংলাদেশ চ্যান্সারি কমপ্লেক্স নির্মাণ (প্রথম সংশোধন)’, ‘সুনামগঞ্জ-মদনপুর-দিরাই-শাল্লা-জলসুখা-আজমিরিগঞ্জ-হবিগঞ্জ মহাসড়কের শাল্লা-জলসুখা সড়কাংশ নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত)’, ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পথচারী আন্ডারপাস প্রকল্প’, ‘তৃতীয় নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নতীকরণ (সেক্টর) (তৃতীয় সংশোধিত)’, ‘নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন’, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের ঈশ্বরদী-পার্বতীপুর সেকশনের স্টেশনগুলোর সিগন্যালিং ও ইন্টারলকিং ব্যবস্থার প্রতিস্থাপন ও আধুনিকীকরণ’।

এ ছাড়া ‘ইকোনমিক এক্সেলেরেশন অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ফর নিট (আর্ন)’, ‘খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প (প্রথম সংশোধিত)’, ‘রুরাল কানেকটিভিটি ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (আরসিআইপি) (প্রথম সংশোধন)’, ‘চট্টগ্রাম বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ’, ‘গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পাঁচপীর বাজার-চিলমারী উপজেলা সদর দপ্তরের সঙ্গে সংযোগকারী সড়কে তিস্তা নদীর ওপর ১৪৯০ মিটার দীর্ঘ পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ (তৃতীয় সংশোধন)’, রাজশাহী বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ’, ‘নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন’, ‘গ্রামীণ মাটির রাস্তাগুলো টেকসইকরণের লক্ষ্যে হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি)করণ (দ্বিতীয় পর্যায়) (প্রথম সংশোধিত)’। এ ছাড়া একনেক সভায় আলোচনার জন্য ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশন পুনর্বাসন (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পটি তোলা হয়েছিল।

ঘি খাওয়ার জন্য ঋণ নিইনি : ঘি খাওয়ার জন্য বিদেশি ঋণ নেওয়া হচ্ছে না উল্লেখ করে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, ‘উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা-স্বাস্থ্যের সুবিধা বৃদ্ধির জন্য আমরা বিদেশি ঋণ নিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ভালো ব্যবহার করতে পারলে বিদেশি ঋণের ইতিবাচক প্রভাব বেশি। তাই সবসময় তিনি বিদেশি ঋণ নেওয়ার পক্ষে বলেও জানান। কারণ বিদেশ থেকে ৩ শতাংশ সুদের ঋণ পাওয়া যায়। যেটা দেশীয় ব্যাংক থেকে নিলে ৭-৮ শতাংশ সুদে নিতে হয়। তাই বিদেশি ঋণকে ব্যয়সাশ্রয়ী বলছেন প্রতিমন্ত্রী।

আইএমএফের রিজার্ভের হিসাব নিয়ে ড. শামসুল বলেন, ‘এখানে বিশাল কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছে এমন কিছু নয়। অর্থনীতিবিদদের পরামর্শেই সাত বিলিয়ন ডলার আমরা উন্নয়ন তহবিলে ঋণ দিয়েছিলাম। আইএমএফ বলছে, এ অর্থ রিজার্ভের হিসাবে না আনতে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এটা তো আমাদের সম্পদ, আমরা ঋণ হিসেবে দিয়েছি। তাই এটা বাদ দিলে রিজার্ভের পরিমাণ হবে ২৪ বিলিয়ন ডলার। যা দিয়ে সাড়ে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। এটা নিরাপদ।’

অর্থ পাচারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পাচার এত সহজ নয়। এটা বলার জন্য বলা হয়। রিজার্ভের অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তো তাদের ধরে ফেলা হতো।’