ডা. সংযুক্তা সাহা দুষলেন সেন্ট্রাল হাসপাতালকে

এবার মাহবুবা রহমান আঁখি ও তার নবজাতকের মৃত্যুর জন্য সেন্ট্রাল হাসপাতালকে দায়ী করলেন আঁখির চিকিৎসক ও এই হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সংযুক্তা সাহা।

এই চিকিৎসক দাবি করেছেন, কুমিল্লা থেকে আসা আঁখিকে সন্তান প্রসবের জন্য যখন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখন তিনি দেশে ছিলেন না। আঁখিকে ভর্তি ও অস্ত্রোপচারের ব্যাপারে তার সঙ্গে কেউ যোগাযোগও করেননি। এমনকি চিকিৎসার ব্যাপারে মৌখিক বা লিখিত কোনো ধরনের সম্মতিও নেওয়া হয়নি।

ডা. সংযুক্তা সাহা সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন করেছেন, ‘যে মানুষটা দেশেই নেই, তার নাম করে কেন রোগী ভর্তি করবেন? এটা কার স্বার্থে? আমি যদি অপারেশন না করি, যদি না-ই থাকি, তাহলে রোগী ভর্তি করালেন কোন আক্কেলে? এটা অবশ্যই একটা বেআইনি ব্যবস্থা। এ ঘটনার জন্য একমাত্র দায়ী সেন্ট্রাল হাসপাতাল।’

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর পরীবাগে নিজের বাসায় সাংবাদিকদের ডেকে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন এই চিকিৎসক। তিনি প্রকৃত দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবিও জানান।

প্রসবব্যথা উঠলে গত ৯ জুন মধ্যরাতে কুমিল্লা থেকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে আঁখিকে নিয়ে আসে তার পরিবার। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুটি ওইদিনই মারা যায়। সংকটাপন্ন অবস্থায় আঁখিকে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত রবিবার দুপুরে তার মৃত্যু হয়।

সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ মা ও নবজাতকের চিকিৎসায় হাসপাতালের গাফিলতির কথা স্বীকার করলেও তারা এর জন্য মূলত ডা. সংযুক্তা সাহাকে দায়ী করেন। এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। এমন অবস্থায় গতকাল প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন এই চিকিৎসক ও নির্দোষ দাবি করে নিজের অবস্থানের কথা তুলে ধরেন।

ডা. সংযুক্তা সাহা বলেন, সেন্ট্রাল হাসপাতালে আমি ২০০৭ সাল থেকে কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। কোনো চিকিৎসকের অধীনে রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে নিজস্ব কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা এখানে নেই। বরং বছরের পর বছর ধরে কোনো চিকিৎসকের ‘লিখিত সম্মতি না নিয়েই’ রোগী ভর্তি করা হয়। গত ১০ জুন আঁখিকে ভর্তির সময় আমার কাছ থেকে মৌখিক বা লিখিত কোনো সম্মতি গ্রহণ করা হয়নি।

এই চিকিৎসক বলেন, আঁখির ভর্তির সময় আমি দুবাইয়ের উদ্দেশে বাংলাদেশ ছেড়েছি। তারপরও আমার নামে রোগী ভর্তি করা হাসপাতালের অসদাচরণ এবং অপরাধমূলক পদক্ষেপ। এটা তারা করেছে আমার সুনামকে বেআইনিভাবে পুঁজি করে কিছু আর্থিক লাভের জন্য। এটা রোগীদের বিভ্রান্ত করার জঘন্য কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। নিজেদের গাফিলতি লুকানোর জন্য আমার নামে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

আঁখি তার নিয়মিত রোগী ছিলেন না বলেও জানান ডা. সংযুক্তা সাহা। তিনি বলেন, একজন মহিলা গর্ভাবস্থায় নিয়মিতভাবে একজন চিকিৎসকের অধীনে পরামর্শ নিয়ে থাকেন। অর্থাৎ প্রতি মাসে অন্তত একবার চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নিশ্চিত হন যে, মা ও আসন্ন সন্তান উভয়ই স্বাস্থ্যগতভাবে ঠিক আছেন। আঁখি মার্চে দুবার এসেছিলেন। এর বাইরে বিগত তিন মাসে তিনি কখনো পরামর্শের জন্য আসেননি।

এ ব্যাপারে এই চিকিৎসক আরও বলেন, প্রয়াত আঁখি কুমিল্লায় বসবাসরত ছিলেন এবং সেখানে গর্ভাবস্থায় ডেলিভারির জন্য স্থানীয় হাসপাতালে শরণাপন্ন হয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে ব্যর্থ হওয়ার পর সেদিন সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তির জন্য আসেন।

এই চিকিৎসক আরও বলেন, এই মিথ্যা তথ্যও ছড়ানো হয়েছে যে, আমি ভিডিও কলের মাধ্যমে অপারেশন তদারকি করছিলাম। অথচ আমি তখন ভূমি থেকে ৩৬ হাজার ফুট উঁচুতে বিমানে অবস্থান করছিলাম। আমার ২৩ বছরের পেশাগত জীবনে কখনো ভিডিও কলের মাধ্যমে অপারেশন করিনি।

মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর কারণে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, আমার এক্ষেত্রে কোনো দোষ নেই। সেন্ট্রাল হাসপাতাল স্বপ্রণোদিত হয়ে আমার উপস্থিতি নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে। এই নীতিবিবর্জিত কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আমি আইনি পদক্ষেপ নেব।

হাসপাতালে ভর্তির আগে বা পরে তার সঙ্গে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ কোনো যোগাযোগ করেনি বলে জানান ডা. সংযুক্তা সাহা। তিনি বলেন, ওনাদের এই কথার সপক্ষে একটি হলেও প্রমাণ হাজির করুক। তাদের কথা যদি বিন্দুমাত্র সত্য হয়ে থাকে, তা হলে তারা কল রেকর্ড হাজির করুক।

এই চিকিৎসক বলেন, তারা (হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ) আমার বেশি রোগী দেখা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। অথচ আমি নিজের ব্যক্তিগত জীবন বিসর্জন দিয়ে এত বছর যখন রাত-বিরাতে রোগী দেখেছি, তখন ওনারা আমার এই ত্যাগ, বিসর্জন নিয়েই গর্ব করতেন এবং আরও রোগী দেখতে উদ্বুদ্ধ করতেন।

বাংলাদেশে এখন সিজারিয়ান বেসরকারি হাসপাতালে জন্মের জন্য একটি রুটিন পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে বলে জানান এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশে সব প্রতিকূলতার বিপরীতে বিপুল সংখ্যক নবজাতক শিশুর সফল স্বাভাবিক প্রসবের জন্য বেশি পরিচিত। দীর্ঘ ২৩ বছরের কর্মজীবনে সফলভাবে বহু সংখ্যক স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করিয়েছি। কোনো অভিযোগ আসেনি। স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের সাফল্যের জন্য বছরের পর বছর ধরে অসাধারণ কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। সন্তান প্রসবে সিজারিয়ানের বিরুদ্ধে আন্দোলনই নিজের পথের কাঁটা হয়েছে। এর কারণ স্বার্থান্বেষী মহলের ব্যবসায়িক ক্ষতি।

হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের ষড়যন্ত্রের কারণে তার বিরুদ্ধে মিডিয়া ট্রায়াল হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে আমার নামে কুৎসা রটানো হচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক।