জ্যৈষ্ঠ মাসে আম-জাম-কাঁঠাল-কলা-লিচু-জামরুল প্রভৃতি রসালো ফলে সয়লাব থাকে দেশের বাজার। শুধু যে জ্যৈষ্ঠ মাসেই রসালো ফল পাওয়া যায় তা কিন্তু নয়। আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসেও এসব ফল বাজারে পাওয়া যায়। আমের কিছু জাত আশ্বিনেও পাওয়া যায়, বিশেষ করে ফজলি আম।
রসালো সব ফলের মাস জ্যৈষ্ঠ। এ মাসকে তাই বলা উচিত রসের মাস; কিন্তু ভুল করে পত্রিকান্তরে লেখা হয় ‘মধুমাস’। যদিও মধুমাসের সঙ্গে জ্যৈষ্ঠের কোনো সম্পর্ক নেই, আছে চৈত্র মাসের। ফলের মিষ্টতার সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে এই ভুল শব্দবন্ধ (ফ্রেইজ) চালু হয়ে থাকবে। ফাল্গুন-চৈত্র প্রতিস্থাপিত হয়েছে জ্যৈষ্ঠে। মিডিয়ার আজব সব ভেল্কির মধ্যে এটা একটা।
এ সময়ে বিদেশি ফলকে পাশে ঠেলে বাজার দখলে রেখেছে মৌসুমি ফল। কী নেই এখন ফলের বাজারে! চারদিকে রসালো ফলের ম ম গন্ধ। বেচাকেনাও চলছে হরদম। দাম নাগালে থাকায় অধিকাংশ ক্রেতাকে আষাঢ় মাসেও রসালো ফল কিনতে ব্যস্ত দেখা যায়। ব্যবসায়ীরাও বিক্রিতে সন্তুষ্ট।
পাইকারি ও খুচরা বাজারে অবশ্য ফলের দামে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা যায়। পাইকারি আড়তের তুলনায় খুচরা বাজারগুলোতে অধিকাংশ ফল দুইগুণ-তিনগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রচলিত, অপ্রচলিত ও সম্ভাবনাময় বিদেশি ফলসহ প্রায় ৭৮ জাতের ফলের আবাদ হয়। দশ জেলায় সবচেয়ে বেশি ফল উৎপাদিত হয়। জেলাগুলো হলোÑ দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও ঝিনাইদহ।
২০২০-২১ অর্থবছরে ২৩ লাখ ৫০ হাজার টন এবং আম চাষের আওতাধীন জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৮৬ হাজার একর। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৪ লাখ ৬৮ হাজার টন আমের উৎপাদন হয়েছে। চলতি বছরও এর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩-২৪ লাখ টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ম্যাংগো প্রজেক্টের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ফলের মৌসুম এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময়ে প্রচুর দেশি ফল থাকে। বিদেশি ফলের কদর কম থাকে। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত যেহেতু দেশি ফল তেমন পাওয়া যায় না, সে সময়ে আপেল, মাল্টা প্রভৃতি ফল আমদানি করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমের চাহিদার কথা চিন্তা করে বছরজুড়ে আমচাষের কয়েকটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। কাতিমন জাতের আমের ফলন হয় অক্টোবর এবং জানুয়ারিতে। এ জাতের আম প্রায় সাড়ে ৫০০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হচ্ছে। বারী-১১ জাতের আমচাষের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ জাতের আমের ফলন বছরে তিনবার হয়। আমচাষ লাভজনক হওয়ায় রাজশাহী, নওগাঁ এবং অন্য জেলাগুলোতে আমচাষের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৩ লাখ ৫০ হাজার টন ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৪ লাখ ৬৮ হাজার টন আমের উৎপাদন হয়েছে। চলতি বছরও এর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩-২৪ লাখ টন।’
ঢাকার কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল বাজার, মোহাম্মদপুর টাউনহল মার্কেট ও ঢাকার পাইকারি বাজার পুরান ঢাকার বাদামতলী ফলের আড়ত ঘুরে দেখা যায়, নানা জাতের আম, কাঁঠাল, জাম, আনারস, তালের শাঁস, লিচু, লটকনসহ দেশি ফল বিক্রি হচ্ছে দেদার।
খুচরা বাজারে কাঁঠালের দাম আকার অনুপাতে ১০০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা। মান ও জাত ভেদে প্রতি কেজি আম বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ১১০ টাকায়। হাড়িভাঙা ৬০-৭৫, ল্যাংড়া, ক্ষিরসা, রুপালি আম ৭০-৮৫, বারি-৪ ৮০, গোপালভোগ ৯০-১১০, হিমসাগর ১০০ টাকা। প্রতি কেজি জাম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ২১০ টাকায়, বড় সাইজের আনারসের জোড়া ৭০-১০০, লিচুর মৌসুম শেষের দিকে হওয়ায় বোম্বাই লিচু ১০০ পিস বিক্রি হচ্ছে ৫৫০-৬০০, চায়না লিচু থ্রি ৭০০-৭৫০ টাকা। প্রতি পিস তাল (তিন কোষ) ২৫ থেকে ৩০ টাকা। আগামী দুই মাস বাজারে আম পাওয়া গেলেও ওই সময়ে অধিকাংশ ফলের মৌসুম শেষের দিকে থাকবে। তখন ফলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
কারওয়ান বাজারের আম ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী ১০-১২ দিন আমের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে। এরপর আমের দাম বাড়তির দিকে যাবে। কেননা গরমের কারণে রাজশাহী অঞ্চলের সব আম বাজারে চলে এসেছে। গরম কম থাকলে আম বাজারে আরও এক মাস থাকত।’
বাদামতলী ফলের আড়ত ঘুরে দেখা যায়, ২৮-৩২ টাকায় লক্ষণভোগ আম কিনছেন ক্রেতারা। এটার দামই সবচেয়ে কম। বাকি সব আমের কেজি ৩৫ টাকার ওপরে। কোনো কোনো আমের কেজি পাইকারিতেই ৯০ টাকা। রুপালি ও হাড়িভাঙা আমের কেজি ৩৫, হিমসাগর ৪৫-৫৫ টাকা। ফ্রলি আম ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
আমানুল্লাহ ফ্রুটসের বিক্রয়কর্মী হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক দিনের মধ্যে আমসহ সব ফলের দাম বেড়ে যাবে। কৃষকের হাতে তেমন আম নেই। সব আম বাজারে চলে এসেছে। আগামী দুই মাস বাজারে আম থাকলেও তা বাড়তি দামেই কিনতে হবে।’
ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রপ্তানিকারক ও আড়তদার ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী শেখ আবদুল করীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই সময়ে আমদানি করা ফল কৃষকের ক্ষতি করবে। এজন্য ফল আমদানি বন্ধ রাখতে হবে। ফলের মৌসুম চলছে। তাই ফলের দাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বাদামতলী ফলের আড়তকে কৃষকের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছি। ৫ শতাংশ হারে কৃষক এখানে এসে সরাসরি তাদের উৎপাদিত ফল বিক্রি করতে পারছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবার প্রচুর ফলের আবাদ হয়েছে। যার ফলে বিশে^ আম উৎপাদনে আমরা সপ্তম স্থানে পৌঁছেছি। দাম নাগালের মধ্যে থাকায় ক্রেতারাও বাজার থেকে নানা ধরনের আম কিনতে পারছে। রুপালি আমের চাহিদা রয়েছে। আম ৬০-৮০ টাকা দরে পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে।’