মাত্র এক মাস আগেই ইউক্রেন যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হয়ে ওঠা বাখমুত শহর দখলে নিয়ে রাশিয়ার নিয়মিত সেনাদের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছিল দেশটির ভাড়াটে আধাসামরিক বাহিনী ওয়াগনার গ্রুপ। যাকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার অন্যতম বড় ধরনের বিজয় হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন অনেকে। ওই জয়ের পর ওয়াগনার গ্রুপকে শুভেচ্ছায় সিক্ত করেছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। বাহিনীটির প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিনসহ যুদ্ধক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা সদস্যদের পুরস্কৃত করার ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। অথচ সেই ওয়াগনার গ্রুপকেই ‘বিশ্বাসঘাতক বিদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে পুতিন বললেন, ওয়াগনার বাহিনী যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা আসলে রাশিয়ার পিঠে ছুরি মারার শামিল। গতকাল শনিবার জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া টেলিভিশন ভাষণে পুতিন বললেন, প্রিগোজিন ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসঘাতকদের কঠোরভাবে দমন করা হবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হচ্ছে, রাশিয়া ও ওয়াগনার গ্রুপের মধ্যকার সম্পর্কের নাটকীয় এ মোড় শুরু হয়েছে গত শুক্রবার ওয়াগনার প্রধান প্রিগোজিনের এক ঘোষণার পর। সেদিন ওয়াগনার প্রধান প্রিগোজিন রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় রোস্তভ-অন-ডন শহর তার নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করেন। বলেন, ওই শহরে অবস্থিত রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের মিলিটারি হেডকোয়ার্টার্সও তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। প্রতিরক্ষা প্রধান সের্গেই শুইগু এবং সেনাপ্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভ তার সঙ্গে দেখা না করলে মস্কোর দিকে যাত্রা শুরু করবেন। গতকাল শনিবার বিকেলে বিবিসি অসমর্থিত সূত্রের বরাতে বলেছে, রোস্তভ-অন-ডন থেকে মস্কোর যে দূরত্ব তার মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে ওয়াগনার গ্রুপের একটি অংশ। সেখানে রুশ সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার থেকে তাদের ওপর গুলিও ছুড়েছে। পাল্টা হামলা হিসেবে সেখানকার একটি তেল শোধনাগার উড়িয়ে দিয়েছে আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা।
এদিকে রক্তপাত এড়াতে রাশিয়ার রাজধানী মস্কো অভিমুখে যাত্রা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন ওয়াগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিন। গতকাল রাতে নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক অডিওবার্তায় এ ঘোষণা দেন তিনি। ওই বার্তায় প্রিগোজিন বলেছেন, মস্কোর দিকে অগ্রসরমাণ তার দলটি থেমে গেছে। রক্তপাত এড়াতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে দিনভর চলা উদ্বেগ-উত্তেজনার আপাত অবসান হলো।
এর আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের ঘনিষ্ঠ বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর মধ্যস্থতায় মস্কো অভিমুখে যাত্রা বন্ধ করতে রাজি হন প্রিগোজিন। লুকাশেঙ্কোকে উদ্ধৃত করে রশিয়া ২৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেলারুশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার পর ওয়াগনার প্রধান প্রিগোজিন মস্কো অভিযান বন্ধ করতে রাজি হন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উত্তেজনা কমাতে সম্ভাব্য একটি গ্রহণযোগ্য উপায় বের করা হবে। পাশাপাশি ওয়াগনার যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পুতিনের সম্মতি নিয়েই লুকাশেঙ্কো ও প্রিগোজিন এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
ওয়াগনার বাহিনীর কথিত এ বিদ্রোহ তাদের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনতে না পারলেও এর মধ্য দিয়ে যে ‘উটকো ঝামেলার’ সৃষ্টি হয়েছে তা প্রেসিডেন্ট পুতিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও ইউক্রেনে তার লক্ষ্যকে একটা কঠোর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অবশ্য কেউ কেউ বলছেন, ইউক্রেনে এখনো চার লাখের মতো রুশ সেনা অবস্থান করায় দেশটির পক্ষে এখনই এই অস্থিরতার কোনো সুফল পাওয়া সম্ভব না।
ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর পাশাপাশি যুদ্ধে লিপ্ত ভাড়াটে ওয়াগনার গ্রুপ। গত মাসে ইউক্রেনের বাখমুত শহর দখলের লড়াইয়ে গ্রুপটি নেতৃত্ব দিয়েছিল। ১০ মাসের মধ্যে ইউক্রেনে সেটি ছিল রাশিয়ার সবচেয়ে বড় জয়। যুদ্ধক্ষেত্রের এই সাফল্যের সুযোগে প্রিগোজিন রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের সমালোচনা শুরু করেন। অবশ্য কয়েকমাস ধরেই তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই এবং জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমোভের বিরুদ্ধে ‘অযোগ্যতার’ অভিযোগ করে আসছিলেন। এর মধ্যে গত শুক্রবার তিনি তার দলের সৈন্যদের ওপর এক মারাত্মক মিসাইল হামলার অভিযোগ করেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। তিনি তার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে না পারলেও কথিত হামলাকারীদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার শপথ নেন। অবশ্য তার পদক্ষেপ সামরিক অভ্যুত্থান না বলেও দাবি করেন তিনি। কিন্তু ধারাবাহিক কয়েকটি অডিও বার্তায় অত্যন্ত উত্তেজিত স্বরে প্রিগোজিন ধারণা দিয়েছেন, তার ২৫ হাজার মিলিশিয়ার শক্তিশালী একটি দল মস্কোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বকে অপসারণ করার পথে রয়েছে। অবশ্য সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানিয়েছে, এসব বার্তায় তার কণ্ঠস্বর বিভিন্ন রকম মনে হয়েছে এবং সেটি তারা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি।
অন্যদিকে ক্রেমলিন একে সরাসরি বিদ্রোহ হিসেবে দেখছে। গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা ইয়েভগেনি প্রিগোজিন সশস্ত্র বিদ্রোহে লিপ্ত হয়েছেন- এ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে পুতিনের দপ্তর। ক্রেমলিনের নিরাপত্তা বিভাগের এক সূত্রের বরাতে গতকাল সকালে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে মস্কোর সরকারি ভবনগুলো, পরিবহন স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক টেলিভিশন ভাষণে পুতিন বলেন, ওয়াগনার গ্রুপ যা করেছে সেটি ‘বেইমানি’ এবং ‘রাশিয়ার পিঠে ছুরি চালানোর’ মতো। অবশ্য রাশিয়ার সব বাহিনীকে সংহত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পুতিন বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সব নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাশিয়াকে রক্ষা করার কাজে তারা সব কিছু করবেন। প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, রাশিয়ার সমাজকে যারা বিভক্ত করছে তারা কোনোভাবেই শাস্তি এড়াতে পারবে না। ভাষণে পুতিন প্রিগোজিনের নাম উল্লেখ করেননি। তবে ওয়াগনারের ভাড়াটে সৈন্যদের কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার পক্ষে লড়াই করার জন্য তাদের প্রশংসা করেন।
পুতিনের ওই ভাষণের পর এক কথিত অডিওবার্তায় প্রিগোজিন বলেন, মাতৃভূমির বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা সম্বন্ধে, প্রেসিডেন্ট বড় ধরনের ভুল করেছেন। আমরা দেশপ্রেমিক। আমরা যুদ্ধ করছি এবং এখনো করে যাচ্ছি। আমাদের দোষ স্বীকার করতে... প্রেসিডেন্ট যেমনটা চেয়েছেন, এফএসবি (রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা) অথবা অন্য কেউ বা কেউই তেমনটা করতে যাচ্ছে না। কারণ আমরা চাই না আমাদের দেশ আর দুর্নীতি, মিথ্যা ও আমলাতন্ত্রের মধ্য দিয়ে চলুক।
বিবিসি বলছে, এই পরিস্থিতির বিস্তারিত অনেক কিছু এখনো পরিষ্কার হয়নি। রোস্তভ শহরের পর ভরোনেজ শহরের সব সামরিক স্থাপনা দখল করে নিয়েছে ওয়াগনারের সৈন্যরা। অবশ্য ভরোনেজ অঞ্চলের গভর্নর আলেকজান্ডার গুসেভ সতর্ক করে বলেছেন যে সৈন্যদের গতিবিধি নিয়ে অনেক ভুয়া খবর ছড়াচ্ছে। সন্ত্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী ভরোনেজ অঞ্চলে সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এই লড়াইটাকে বিশ্লেষকরা দেখছেন রাশিয়ার ক্ষমতার শীর্ষে থাকা দুজনের লড়াই হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের থিঙ্কট্যাঙ্ক দ্য ইনস্টিটিউট অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) বিশ্বাস করে ইয়েভগিনি প্রিগোজিন ক্রেমলিনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটা জোরপূর্বক পরিবর্তন আনতে চান। তবে ক্রেমলিন এর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তার জন্য ‘সাফল্য পাওয়া কঠিন’ হবে। তবে রোস্তভ-অন-ডন দখলের চেষ্টা যুদ্ধে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। এখানকার সেনাবাহিনী ‘এই মুহূর্তে ইউক্রেন যে পাল্টা আক্রমণ করছে সেটা প্রতিহত করতে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে এবং একই সঙ্গে পুরো ইউক্রেনে রাশিয়ার যৌথ বাহিনীর কমান্ড সেন্টার এখানে। সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ বলছে, শুক্রবারের বিস্ময়কর নাটকীয়তার ফলাফল যা-ই হোক পুতিনকে এ রকম দুর্বল আর কখনই দেখায়নি। এক ঘটনা পুতিনের পেশা জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা, এমনকি এ ধাক্কা তাকে ক্ষমতার মসনদ থেকেও ছিটকে ফেলতে পারে। গার্ডিয়ানের ভাষ্যমতে, যদি প্রিগোজিনের বিদ্রোহের দ্রুত অবসানও হয় তবু কয়েক মাস এই ধাক্কার রেশ থেকে যাবে, যা রাশিয়াকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং পুতিনের নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে। এই বিদ্রোহ পুতিনের ইউক্রেন অভিযানেও বড় দুর্বলতা তৈরি করেছে। বিপরীতে কিয়েভের পাল্টা আক্রমণ সফল করার পথও করে দিয়েছে। রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের লুহানস্ক, দোনেৎস্ক থেকে ওয়াগনার সেনারা সরে যাওয়ায় রুশ প্রতিরক্ষায় দেখা দিতে পারে বড় ধরনের ফাটল।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা পুতিনের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে সামরিক বিশ্লেষক পাভেল ফেলগেনহাউয়ার বলেন, ‘পুতিন তার শাসনামলে সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে পড়েছেন। বর্তমানে তার সামনে যে চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে তা খুবই গুরুতর। এবারই প্রথম সামরিক এবং বেশ কার্যকর কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন তিনি। এমনকি তাকে হয়তো অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইও করতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনের সাংবাদিক নিক প্যাট্রন এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, গত ২৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা পুতিনের রাশিয়ায় এর আগে কখনো এমন চিত্র দেখা যায়নি। তাকে এমন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়নি। নিক প্যাট্রনের মতে, প্রিগোজিন বিদ্রোহে জয়ী না হলেও দুর্বল হবেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। এ দুর্বলতা ঢাকতে পুতিন আগামী কয়েক মাসে নিজের শক্তি প্রমাণের জন্য অযৌক্তিক অনেক কিছু করতে পারেন।