বিদেশ থেকে আমদানি হওয়া পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে নানা কৌশলে যাচাইয়ের মাধ্যমে খালাস হয়। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ বন্দরের নানা পদ্ধতিতে করা যাচাইয়ের স্তর ফাঁকি দিয়ে বিদেশি মদ খালাস করে মুন্সীগঞ্জকেন্দ্রিক একটি চক্র। যাদের নেটওয়ার্ক দুবাই পর্যন্ত বিস্তৃত। গত বছর এ চক্রের মদভর্তি দুটি কনটেইনার জব্দের পর শুরু হয় বিস্তর তদন্ত, আলোচনায় আসে কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভূমিকা। এ ঘটনার অনুসন্ধানে নামে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মদের বড় এ চালান অবৈধভাবে খালাসের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার পর সম্প্রতি সিআইডি বলছে, চট্টগ্রাম বন্দরসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিআইডির সংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, অনুসন্ধানে কাস্টমসের দায়িত্বরত এক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সন্দেহভাজন এ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তার আইপি হ্যাক করার মাধ্যমে ওই চালানের জালিয়াতির কাজটি করা হয়েছে। তবে এর সপক্ষে তিনি যথাযথ তথ্য উপস্থাপন করতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে তার বিষয়ে অধিকতর অনুসন্ধানের প্রয়োজন হলেও সিআইডির এখতিয়ারভুক্ত না হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। পরে ওই কর্মকর্তাসহ অন্য সন্দেহভাজন কর্মকর্তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) অবগত করা হয়েছে।
এদিকে প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানায় অর্থ পাচার আইনে একটি মামলা করেছে সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট। এতে ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চোরাচালানি ও শুল্কসংক্রান্ত অপরাধের মাধ্যমে ৩১ কোটি টাকা লন্ডারিংয়ের অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই কনটেইনার মদ জব্দের ঘটনায় সিআইডি একটি মামলা করেছে। অর্থ পাচার আইনে করা ওই মামলাটির তদন্ত তারাই করছে। এ ছাড়া মদ জব্দের পর র্যাব একটি মামলা করেছিল, সেই মামলা র্যাব তদন্ত করছে।’
সিআইডির করা মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন জাফর আহমেদ, মো. আবু জোবায়ের, এয়ার মোহাম্মদ সুমন, মো. ফিরোজ. মো. মেহেদী হাসান রায়হান, খায়েজ আহমেদ আরিফ, সালাউদ্দিন মিয়া, মো. নাজমুল মোল্লা ও সাইফুল ইসলামসহ অজ্ঞাতনামা আরও ছয়জন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত বছর জুলাই মাসে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা মিথ্যা ঘোষণায় বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ আমদানি করে। তারা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মেসার্স বিএইচকে টেক্সটাইলস লিমিটেড ও হাসি টাইগার কোম্পানি লিমিটেডসহ ইপিজেডে এ ক্যাটাগরির বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র ব্যবহার করে ইমপোর্ট পারমিট (আইপি) নং ও স্ক্যানিং রিপোর্ট জালিয়াতি করে রোভিং মেশিন ববিন আর টেক্সারড ইয়ান অব পলিস্টার নামে এসব মদ খালাস করে। অবৈধভাবে এসব মদ আমদানির মাধ্যমে চক্রটি ৩১ কোটি ৫৮ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।
অর্থ পাচার আইনে করা এ মামলার তদন্ত শেষে চক্রের কার্যক্রমের বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছেন সিআইডির সংশ্লিষ্ট সূত্র।
গত বছর কনটেইনার দুটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে আটক করে র্যাবের একটি দল। সেখান থেকে ৩৬ হাজার ৮১৬ বোতল মদ উদ্ধার করে তারা। পরে ঢাকার ওয়ারীতে তাদের একটি বাড়িতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাওয়া যায়, যার মধ্যে রয়েছে ৯৮ লাখ টাকা, ৪ হাজার ইউরো, ১১ হাজার ইউয়ানসহ কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয়, নেপালি, সিঙ্গাপুরি ও মালয়েশীয় মুদ্রা।
জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে র্যাব জানায়, চক্রটি গত বছরই আরও তিনটি চালানে মিথ্যা ঘোষণায় প্রায় ৪৮ হাজার বোতল বিদেশি মদ এনেছে। তারা বিভিন্ন উপায়ে স্ক্যানিং এড়িয়ে কনটেইনার খালাস করতে সক্ষম হয়েছে। ঢাকার কিছু হোটেল, বার ও ক্লাব এসব মদের ক্রেতা। তাদের আগের চালানগুলো এক দিনের মধ্যেই হোটেল, বার ও ক্লাবগুলো থেকে লোকেরা এসে নিয়েছে। আর রাতের বেলায় কনটেইনার ঢাকায় ঢুকলে রাস্তার মাঝ থেকে ক্লাব বা হোটেলের লোকেরা এসে কনটেইনার খুলে মদ নিয়েছে।
র্যাব জানায়, এ মদ আমদানির হোতা আজিজুল ইসলাম ও তার বড় ছেলে মিজানুর রহমান আশিক দুবাই পালিয়েছেন। দুবাই বসে চক্রের কলকাঠি নাড়ছেন নাসিরউদ্দীন নামে এক ব্যক্তি। দুবাই থেকেই এ মদগুলো আনা হচ্ছিল। এ ঘটনায় র্যাব ছাড়াও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের বিভিন্ন কর্মকর্তা চট্টগ্রাম বন্দর থানায় একাধিক মামলা করেছেন। ওই মামলাগুলো পুলিশ তদন্ত করছে।