নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গিদের নামে থাকা প্রায় ৪৫০ মামলা সামলাচ্ছেন একজন বিচারক। স্পর্শকাতর মামলায় পাঁচ বছর ধরে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করছেন একজন ভারপ্রাপ্ত কৌঁসুলি। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ও সাক্ষীদের নেই গানম্যান কিংবা বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। অন্যদিকে আছে সাক্ষীর গরহাজিরা, লোকবলের ঘাটতি। এমন পরিস্থিতি নিয়েই চলছে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম।
২০১৮ সালের এপ্রিলে ঢাকার আদালত এলাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের আটতলায় যাত্রা শুরু করে এ ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বিশেষ করে জঙ্গি কার্যক্রমের মতো চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর মামলার বিচার চলে এ আদালতে। প্রতিটি কর্মদিবসে গড়ে পাঁচ থেকে সাতটি মামলার শুনানি হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, প্রায় ৫০০-এর মতো মামলা দিয়ে শুরু হওয়া এ ট্রাইব্যুনালে উল্লেখযোগ্য হারে মামলা নিষ্পত্তি যেমন হচ্ছে, তেমনি প্রতিনিয়ত নতুন মামলাও যুক্ত হচ্ছে। ফলে আদালতে চাপও বাড়ছে। সাক্ষী না আসায় অনেক মামলা অনিষ্পন্ন থাকছে বছরের পর বছর। আবার সাক্ষী ও প্রমাণের ঘাটতিতে আসামিদের বড় একটা অংশ খালাস পায় বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।
সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও জঙ্গিবাদের মতো অপরাধে অভিযুক্ত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিতের লক্ষ্যে ২০০৯ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইন করে সরকার। এর আলোকে ঢাকাসহ সাতটি বিভাগীয় শহরে সাতটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে গঠন করা হয়। এই মুহূর্তে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ৪৪১টি মামলা বিচারাধীন। সাতটি ট্রাইব্যুনালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা ঢাকার ট্রাইব্যুনালে। যার প্রায় সবই জঙ্গি হামলা, হত্যা ও জঙ্গি কার্যক্রমের অভিযোগের মামলা। গুলশানে হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা, লেখক অভিজিৎ রায়, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন, ইউএসএআইডির কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বী তনয়, পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে বোমা হামলার মতো আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলার শুনানি ও বিচার হয়েছে। এখন কল্যাণপুরে জাহাজ বিল্ডিংয়ে জঙ্গি আস্তনা মামলা, ব্লগার নাজিমুদ্দিন হত্যা মামলাসহ বেশ কিছু আলোচিত মামলার বিচারকাজ চলছে। ট্রাইব্যুনালে নিয়মিত মামলা শুনানিকারী আইনজীবীদের অভিমত, গুরুত্বপূর্ণ এ আদালতের বিচার কার্যক্রমের গতি আরও বাড়াতে হলে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
গত ২৬ মে দেশ রূপান্তর অনলাইনে ‘ঢাকার ৪০ ফৌজদারি আদালতে নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই’ শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ ট্রাইব্যুনালে আসামিদের জন্য নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকা এবং ঝুঁকি নিয়ে বিচারকাজ পরিচালনার বিষয়টি উঠে আসে। গত সপ্তাহে এ আদালতে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে।
সাক্ষীর গরহাজিরায় বিচারের দীর্ঘসূত্রতা: নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি রাজধানীর মধ্য পীরেরবাগ শিমুলতলা এলাকা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীর চার সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ আনা হয়। তদন্ত শেষে ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ১০ জনকে, যাদের ৬ জনই পুলিশ সদস্য। কিন্তু অভিযোগপত্র গঠনের সাত বছরের বেশি সময়ে একজন সাক্ষীও হাজির করা সম্ভব হয়নি। ফলে আট বছরের বেশি সময় ধরে মামলাটি অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের ভারপ্রাপ্ত কৌঁসুলি মো. গোলাম ছারোয়ার খান জাকির দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলার সময় সাক্ষীর যে ঠিকানা দেওয়া হয়, পরে তার ঠিকানা পরিবর্তন হয়। ফলে সমন পাঠালে তা ফেরত আসে। এ ছাড়া পুলিশের সাক্ষীদের বিষয়ে খোঁজ নিলে দেখা যায় কেউ বদলি হয়ে গেছেন। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বারবার তাগিদ দিলেও সাড়া মেলে না। অনেক সাক্ষীকে টেলিফোন করে সাক্ষ্য দিতে অনুরোধ করলেও নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে আসতে চান না তারা।
তিনি জানান, মামলার দীর্ঘসূত্রতায় অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে যান। অনেকে পলাতক হন।
পাঁচ বছর ধরেই ভারপ্রাপ্ত কৌঁসুলি : সচরাচর গুরুত্বপূর্ণ আদালতগুলোতে রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত বা সহকারী কৌঁসুলি রাখা হলেও এ আদালতে ভারপ্রাপ্ত কৌঁসুলিকেই সব দায়িত্ব পালন করতে হয়। অন্যদিকে স্পর্শকাতর মামলার এ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে গানম্যান বা নিরাপত্তা সুবিধাও এখন পর্যন্ত নেই। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েও সাড়া মেলেনি বলে জানা গেছে।
ভারপ্রাপ্ত কৌঁসুলি গোলাম ছারোয়ার জাকির বলেন, ‘নিরাপত্তা বেষ্টনী হওয়ায় কিছুটা নির্ভার হয়ে কাজ করতে পারছি। কিন্তু সার্বিকভাবে একপ্রকার নিরাপত্তাহীনতা ও চাপ নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে। অনেক সাক্ষী একই কারণে সাক্ষ্য দিতে আসেন না।’
আদালতসংশ্লিষ্টরা বলেন, ট্রাইব্যুনালের ৪৫০ মামলার বিচারকাজ চালাতে বিচারক আইনজীবীর বাইরে পর্যাপ্ত লোকবলের ঘাটতি রয়েছে। আদালতে একজন জারিকারক ও অফিস সহায়ক থাকলেও তারা কাজ করেন আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে। এ ছাড়া উমেদার, সেরেস্তাদার ও অফিস সহকারীসহ আরও বেশ কিছু পদে লোকবল প্রয়োজন।
আদালতের একাধিক কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলার ফাইল রক্ষণাবেক্ষণ, দেখভাল করাসহ অফিস সহায়ক কাজে লোকবলের ঘাটতিতে অন্যদের কাজের চাপ নিতে হচ্ছে বেশি। সার্বিক বিষয়ে জানতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলেও সাড়া মেলেনি।
ঢাকার মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলা যেমন বাড়ছে, তেমনি নিষ্পত্তিও কিন্তু হচ্ছে। সামনে হয়তো আরও মামলা বাড়বে। এখন সরকার যদি প্রয়োজন মনে করে তাহলে আরেকটি ট্রাইব্যুনালের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’ পিপি এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে তিনি প্রয়োজনবোধে কথা বলবেন বলে জানান তিনি।