রোগীদের উত্ত্যক্ত করে ভিডিও করেন ইউটিউবাররা

টিপ টিপ বৃষ্টির মধ্যেই পাবনা মানসিক হাসপাতাল প্রাঙ্গণে শত শত মানুষের ভিড়। ফটকে থাকা নিরাপত্তারক্ষী আনসার সদস্যদের টাকা দিয়ে নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ প্রবেশ করছেন ভেতরে। চিড়িয়াখানার মতো রোগীদের কক্ষের সামনে বারান্দাজুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন দর্শনার্থীরা। কেউ রোগীদের ডাকছেন, টিটকারি করছেন, কেউবা ঘরে বন্দি রোগীদের সঙ্গে গল্প-আড্ডায় মেতেছেন। উৎসুক দর্শনার্থীদের হাঁকডাকে বিভ্রান্ত হচ্ছেন কিছু রোগী। দর্শনার্থীদের পাশাপাশি এসেছেন ইউটিউবাররাও। তাদের কর্মকা- আরও উদ্বেগজনক। তারা মানসিক রোগীদের অসুস্থ অপ্রকৃতস্থ আচরণের ভিডিও করে সামাজিকমাধ্যমে ছেড়ে দিচ্ছেন। এতে রোগীর পাশাপাশি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন তাদের পরিবারও।

সম্প্রতি পাবনার মানসিক হাসপাতালে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। এক দর্শনার্থী জানান, পাবনায় তেমন বিনোদন কেন্দ্র নেই। ঈদ উপলক্ষে বন্ধু স্বজনরা মিলে এখানে এসেছেন। আনসারদের ১০০ টাকা করে দিয়ে তারা ভেতরে ঢুকেছেন। পাগলদের কর্মকা- দেখে আনন্দ পাওয়া যায়।

পাবনা মানসিক হাসপাতালের সাবেক আবাসিক চিকিৎসক ও নওগাঁ মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি) মাসুদ রানা সরকার বলেন, মানসিক হাসপাতালে দর্শনার্থীদের প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। দর্শনার্থীরা রোগীদের সঙ্গে দুষ্টামি করেন, চিড়িয়াখানার বন্দি বানর, হনুমানের মতো আচরণ করেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের লুকিয়ে তাদের বিড়ি-সিগারেট দেন, গান গাওয়ান ভিডিও লাইভ করেন। এটি চরম অমানবিক আচরণ। পাশাপাশি রোগীদের জন্যও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে তাদের অসুস্থতা বেড়ে যেতে পারে।

পাবনা হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার নেটওয়ার্কের সভাপতি আব্দুল মতীন খান বলেন, মানসিক হাসপাতালকে চিড়িয়াখানার মতো বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার অমানবিকতার চরম বহিঃপ্রকাশ। মানসিক রোগীরা আমাদের মতোই মানুষ। কিন্তু তথাকথিত সুস্থ সমাজের যেসব মানুষ মানসিক রোগীদের দেখে আনন্দ খোঁজেন, তাদের মানসিকতাই তো বিকৃত। যারা এই অসহায় মানুষদের নিয়ে বাণিজ্য করছেন, তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা উচিত।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, পাবনা মানসিক হাসপাতাল একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। এখানে বহির্বিভাগে সাধারণ ও অন্তঃবিভাগে জটিল মানসিক রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। মানসিক রোগীরা অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে, তাদের পারিপাশির্^ক সামাজিক দুশ্চিন্তা, উত্তেজনা থেকে দূরে রাখতে মানসিক হাসপাতালকে সংরক্ষিত এলাকা বিবেচনা করে সেখানে বহিরাগত সাধারণের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেই বাধ্যবাধকতা সম্পূর্ণ রূপে প্রতিপালন করতে নিরাপত্তায় আনসার সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারাই হাসপাতালে উৎকোচের বিনিময়ে বহিরাগত দর্শনার্থী প্রবেশ করাচ্ছে। হাসপাতালের কিছু কর্মচারীর বিরুদ্ধেও এতে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।

হাসপাতালের মূল ফটকে নিরপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের কাছে টাকা নিয়ে বহিরাগত প্রবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বিষয়টি স্বীকারও করেন। আবদুল জলিল নামের কর্তব্যরত এক আনসার সদস্য বলেন, ঈদ উপলক্ষে লোকজন বেড়াতে আসছেন। সবাই একটু হাসপাতালের ভেতরটা দেখতে চান। যিনি যা দিচ্ছেন, তা নিয়েই একটু সুযোগ  দেওয়া হচ্ছে। কারণ ঢুকতে না দিলেও লোকজন ঝগড়া বাধায়। ঝামেলা হয়। তাই এ ব্যবস্থা।

মূল ফটকের পাশেই হাসপাতালের গাড়ি রাখার গ্যারেজ। সেখানেও দেখা গেল আরেক আনসার সদস্য চেয়ার টেবিল পেতে বসে আসেন। দর্শনার্থীদের মোটরসাইকেল পার্কিং করে ২০ টাকার বিনিময়ে লাগানো হচ্ছে টোকেন। সেখানে থাকা আনসার সদস্য রেজাউল জানান, হাসপাতালে আসা দর্শনার্থীদের মোটরসাইকেল পার্কিংয়ের জন্য তারা টাকা নেন। সারা দিনে যা হয় তা সবাই মিলে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন।

পাবনা মানসিক হাসপাতালের মনস্তত্ববিদ মো. মোজাহার আলী জানান, আনসার সদস্যরা প্রকাশ্যে এসব বাণিজ্য করে আসছে। কর্তৃপক্ষ তাদের নিষেধ করলে দুর্ব্যবহার করে, বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। তারা কাউকেই তোয়াক্কা করে না। আমরা বিষয়টি আনসারের সদর থানা কর্মকর্তাকে জানিয়েছি।

এ বিষয়ে পাবনা মানসিক হাসপাতালের প্রধান সহকারী আহসান হাবিব বলেন, পার্কিংয়ের বিনিময়ে টাকা নেওয়ার কোনো বৈধতা আনসার সদস্যদের নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পার্র্কিংয়ের জন্য কোনো ইজারাও দেয়নি। কোনো ধরনের অনুমোদনও নেই।

পাবনা মানসিক হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার আঞ্জুমান-ই-ফেরদৌস বলেন, ‘দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধে আমরা বহু চেষ্টা করেছি। কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। মানুষ জেনারেল হাসপাতাল দেখতে যায় না, সব আগ্রহ এখানেই। তবে আমরা বিষয়টি নিয়ে আরও কঠোর হওয়ার চেষ্টা করছি।’

এ বিষয়ে আনসার ও ভিডিপির জেলা কমান্ড্যান্ট মো. সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, মানসিক হাসপাতালে অর্থের বিনিময়ে দর্শনার্থী প্রবেশ করানো, পার্কিং বাণিজ্যের অভিযোগগুলো গুরুতর। বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।