উজানে ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ওইসব এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা করছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এ ছাড়া গঙ্গা, পদ্মা, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমারের পানি সমতল বৃদ্ধি পাওয়ায় ওইসব নদ-নদী অববাহিকায় আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে বিশেষ করে আগামী দুদিনের মধ্যে লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে স্বল্পমেয়াদি বন্যা হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
সাধারণত জুলাই মাসে দেশের ভেতরে এবং উজানে ভারতীয় অংশে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়। সে বিষয়টি উল্লেখ করে আবহাওয়া অধিদপ্তর চলতি মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ মাসে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর-মধ্যাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলে স্বাভাবিক মৌসুমি বন্যা হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলে হঠাৎ পাহাড়ি বন্যা হতে পারে। তবে এসব বন্যা অবশ্য খুব বেশি দিন স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা নেই বলে মনে করছে সংস্থাটি।
গতকাল বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায় বন্যা পরিস্থিতি আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরেকটু খারাপ হবে। এরপর পরিস্থিতি উন্নতি হবে। তবে উত্তরাঞ্চলে কয়েকটি জায়গায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এ ছাড়া মধ্যাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি পেলেও বড় কোনো বন্যার আশঙ্কা নেই।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে। তবে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস থাকায় আগামী ৪৮ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার নদীগুলোর পানি সমতল সময়বিশেষে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদী ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং লালমনিরহাট ও নীলফামারীর কিছু নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
পাউবো জানায়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কুশিয়ারা, মনু-খোয়াই ছাড়া প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে আগামী ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার চলমান বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে। আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারী বৃষ্টির প্রবণতা কমে আসায় পরবর্তী সময়ে চলমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। অন্যদিকে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় ওই নদ-নদীগুলোর পানি সমতল বৃদ্ধি পেতে পারে
সুরমা নদীর পানি বাড়ছেই : সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমলেও সুরমা নদীর পানি এখন বিপদসীমার ওপরে আছে। এখন পানিবন্দি নিম্নাঞ্চলের বেশ কিছু গ্রাম। এসব এলাকায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এদিকে তিন দিন ধরে পানিতে সুনামগঞ্জ তাহিরপুর সড়কের শক্তিয়ার খলা পয়েন্টে ১০০ মিটার সড়ক তলিয়ে বন্ধ রয়েছে যান চলাচল। বন্ধ রয়েছে নিম্নাঞ্চলের গ্রামীণ সড়কগুলোও।
পাউবো তথ্য সুনামগঞ্জ সুরমা নদীর পানি দুপুর থেকে দুই সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তবে গতকালও পানি ধীরগতিতেই বেড়েছে, বৃষ্টিপাতও কম হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৭০ মিলিমিটার।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মামুন হাওলাদার জানান, সুনামগঞ্জ ও ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত গত ২৪ ঘণ্টায় কম হয়েছে, তাই পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। বৃষ্টিপাত কম হলে বন্যা পরিস্থিতি আরও উন্নতি হবে বলে জানিয়েছেন পাউবো কর্মকর্তা।
নেত্রকোনায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত : কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার কংস, সোমেশ্বরী, বৈঠাখালী, মঙ্গলেশ্বরী, গুমাই, ধনু ও উব্দাখালীসহ সব কটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে জেলার নিচু এলাকার বিভিন্ন রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামের বাড়ি জলমগ্ন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সারওয়ার জাহান বলেন, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে জেলার সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে এবং কলমাকান্দায় উব্দাখালী নদীর পানি বিপদসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্ব ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে নেত্রকোনার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।
গাইবান্ধায় সব নদ-নদীর পানি বেড়েছে : বৃষ্টি আর উজানের ঢলে গাইবান্ধায় সবগুলো নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে নতুন নতুন এলাকায় পানি ঢুকতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘটায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তামুখ পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ৪ সেন্টিমিটার, করতোয়ার পানি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাখালী পয়েন্টে ৪৪ সেন্টিমিটার ও তিস্তার পানি সুন্দরগঞ্জ পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে। পানি বৃদ্ধির কারণে সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার চরাঞ্চলে আবারও পানি ঢুকতে শুরু করেছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাফিজুল হক মোবাইল ফোনে বলেন, জেলার সবগুলো নদ-নদীর পানি বেড়েছে। বিকেল থেকে সবগুলো নদীর পানিই বিপদসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
এদিকে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তিস্তার ভাঙন শুরু হয়েছে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর, সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের কুন্দেরপাড়া, বাটিকামরী, পারদিয়ারা, খারজানি, মোল্লারচর ইউনিয়নের বাজে চিথুলিয়া, সিধাই, চিথুলিয়া দিগর, গোপালপুর গ্রামে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
বন্যা, ঝড় ও সাগরে নিম্নচাপের আভাস : চলতি মাসের জন্য দেওয়া পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছে, জুলাইয়ে বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দুটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। যার মধ্যে একটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। এ মাসে দেশের উত্তর-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে একটি বিজলিসহ বজ্রঝড় হতে পারে। আর সারা দেশে তিন থেকে পাঁচটি হালকা বজ্রঝড় হতে পারে।
এ ছাড়া চলতি মাসে বন্যার পাশাপাশি দেশের কয়েকটি জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও আছে। বিচ্ছিন্নভাবে ওই তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সময় দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হতে পারে।