মুভি রিভিউ

একটি ভ্রুণ হত্যা কিংবা ইচ্ছের স্বাধীনতা

রোমানিয়া, পূর্ব ইউরোপের একটি দেশ, সাবেক সোভিয়েত ওয়ারশ জোটভুক্ত। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে কমিউনিস্ট পার্টির ভিত্তি ধীরে ধীরে আলগা হতে শুরু করে। কিছুটা দায় হয়তো গর্বাচেভের গ্লাস্তনস্ত, পেরেস্ত্রোইকার কিন্তু অনেকটাই সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে দীর্ঘকাল ব্যক্তিশাসন, একনায়কতন্ত্র, কঠোর নজরদারি— যা দেশগুলোকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। ভিতরে ভিতরে অসন্তোষ বাড়ছিল, ফলে ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপজুড়ে গণঅভ্যুত্থান শুরু হলে প্রায় একযোগেই ওই সকল দেশে সমাজতন্ত্রের পতন হয়। ১৯৬৫ সালে রোমানিয়ায় নিকোলাস চসেস্কু ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে এক ডিক্রির মাধ্যমে রোমানিয়ায় ভ্রুণহত্যা (অ্যাবোরশন) নিষিদ্ধ করেন। চসেস্কু’র শাসনের শেষের দিকে একটি বেআইনি অ্যাবোরশন সংগঠনের ঘটনাই ‘৪ মাস ৩ সপ্তাহ ২ দিন’ চলচ্চিত্রটির উপজীব্য।

ওতেলিয়া এবং গাব্রিটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া দুই বন্ধু যারা ডরমেটরিতে একই রুমে থাকে। ছবির শুরুতে দেখি দুজন ব্যাগ গোছাচ্ছে, উদ্বিগ্নভাবে কথা বলছে, স্পষ্টতই ক’দিনের জন্য বাইরে কোথাও যাবে। কিন্তু কেন এবং কোথায় সেটা বোঝা যায় না। আমরা পরবর্তীকালে আবিষ্কার করব তারা একটি হোটেলে উঠবে, গোপনীয়ভাবে গাব্রিটার অ্যাবোরশন করার প্রয়োজনে— যখন রোমানিয়ায় অ্যাবোরশন নিষিদ্ধ। গাব্রিটার অ্যাবোরশন করাতে রাজি হয় বেবে নামের একজন ডাক্তার, সেটা অদ্ভুত এবং বিকৃত এক শর্তে— তরুণীদ্বয়কে সম্ভোগের বিনিময়ে। চরিত্রটি খানিকটা অব্যাখ্যেয়, ডাক্তারটিকে অন্যসময় অতটা লোলুপ মনে হয় না বরং কিছু ক্ষেত্রে সহায়তাপরায়নই মনে হয়, কেননা জেল ঝুঁকি সত্ত্বেও কাজটি করেন।

৪ মাস ৩ সপ্তাহ ২ দিন- এর ন্যারেটিভস একরৈখিক এবং সরল। পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান মুনজিও’র ঝোঁক ঘটনার বয়ানের দিকে নয় বরং একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে চরিত্রগুলো কী প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে তার উপর। মূল ঘটনা না দেখিয়ে, ঘটনার প্রভাব অন্যদের উপর কী তাই দেখান পরিচালক। চলচ্চিত্রটির বিভিন্ন দৃশ্য পরম্পরায় আমরা তা আবিষ্কার করি। ধরা যাক সে দৃশ্যটির কথা, হোটেলে তরুণীদ্বয় যখন মিস্টার বেবে'র শর্ত মানতে বাধ্য হয় এবং শর্তানুযায়ী ওতেলিয়া এবং বেবে সঙ্গমরত পর্দায় আমরা দেখি গাব্রিটাকে অসহায় পায়চারিরত হোটেল লবিতে কিংবা টয়লেটে এক কোণে ঘাপটি মেরে বসে থাকতে। চোখেমুখে তার অসহায়ত্ব এবং অপরাধবোধ। তার প্রিয় বন্ধুর সম্ভ্রমহানির দায় তো তারই। কিংবা অপর একটি দৃশ্যে, ন্যারেটিভসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ, যখন গাব্রিটার অ্যাবোরশন ঘটনা ঘটছে পরিচালক তা দেখান না। আমরা তখন পর্দায় দেখি ওতেলিয়াকে, তার প্রেমিকের বাড়িতে, প্রেমিকের মায়ের জন্মদিন অনুষ্ঠানে। যদিও দুটো ক্ষেত্রেই দর্শক পরিচালক যা দেখান না তাই যেন দেখে, কল্পনায়।

চলচ্চিত্রটি কি অ্যাবোরশনকে নৈতিক ভিত্তি দেয়? অনেকগুলো অ্যাবোরশন বিরোধি সংগঠন থেকে এই অভিযোগ উত্থাপিত হয়। কিন্তু ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে এতে কোন বক্তব্য দেয়ার প্রচেষ্টা নেই বরং একজন মানুষের কর্মের স্বাধীনতা প্রশ্নে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ দেয় চলচ্চিত্রটি, উত্থাপন করে কিছু প্রশ্ন। একজন মানুষ নিজের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো কি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিতে পারে? সমাজ, রাষ্ট্র এবং আইন একজন মানুষকে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কিংবা কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করা উচিত? এই প্রশ্ন উত্থাপন কিংবা বিশ্লেষণে কোন উচ্চকিত ব্যাপার নেই, দূর থেকে নিরাবেগ পর্যবেক্ষণ মাত্র। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিচালক ব্যবহার করেন ওয়াইড অ্যাঙ্গেল দীর্ঘ শট। শটগুলোর মাঝে ইন্টারকাটের ব্যবহার নেই বললেই চলে, নেই চরিত্রগুলোকে ক্লোজ-আপে ধরার চেষ্টা, কেবল নির্মোহভাবে দেখে যাওয়া। চলচ্চিত্রটির একেবারে শেষ শটে প্রথমবারের মত কেন্দ্রীয় চরিত্র ওতেলিয়াকে সরাসরি ক্যামেরার দিকে বলা ভাল দর্শকের দিকে তাকাতে দেখি। তার চোখে অনেকগুলো প্রশ্ন— তাদের জীবনে যা ঘটল তা কেন? আমরা যারা এতক্ষণ ধরে চলচ্চিত্রটি দেখলাম এ বিষয়ে আমাদের ভাবনাই বা কী? দর্শকদের চরিত্রের সাথে একাত্ম করার প্রচেষ্টা, সংযোগ স্থাপন— যা বাধ্য করে দর্শককে ভাবতে।

প্রেমিক আদি’র মায়ের জন্মদিনে মা-বাবার বন্ধুদের সাথে খাবার টেবিলে ওতেলিয়ার কথোপকথনের দৃশ্যটির কথা ভাবা যাক। বন্ধুরা সকলে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ভুক্ত। ওতেলিয়ার সাথে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে ওনারা তার মা-বাবাকে আমজনতা হিসেবে অভিহিত করেন এবং তাদের নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্য করেন। এই কথোপকথনের মাধ্যমে আমরা তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সমাজের ইন্টেলেজেন্সিয়া সম্প্রদায়ের জাত্যাভিমান, সমাজে বিদ্যমান শ্রেণীদ্বন্দ্ব, ভাঙ্গন আর ক্ষয়িষ্ণু দিকটির আভাস পাই। এই বিভেদ এবং অসন্তোষের শিকড় যে অনেক গভীরে ছিল চলচ্চিত্রটি যে সময়ের ঘটনা বর্ণনা করে তার দুই বছরের মাথায় রোমানিয়ায় সমাজতন্ত্রের পতন তাই নির্দেশ করে। কিংবা ওতেলিয়ার সাথে আদি’র কথোপকথনের দৃশ্যটির কথাও বিবেচনা করা যায়। ওতেলিয়া আদিকে জানায় সে গাব্রিটাকে অ্যাবোরশনে সাহায্য করছে। আদি তাকে বলে সে উচিত কাজ করছে না। ওতেলিয়া তখন পাল্টা প্রশ্ন করে— ব্যাপারটা আমার ক্ষেত্রে হলে তুমি কী করতে? আদি কোন উত্তর দিতে পারে না। বস্তুত আদি হচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিভূ, ঝড়-ঝাপ্টা এড়িয়ে নিরাপদে চলতে শেখা একজন।

৪ মাস ৩ সপ্তাহ ২ দিন বন্ধুত্বের গল্পও। গাব্রিটার অ্যাবোরশনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল কাজই (হোটেল ঠিক করা, বেবের সাথে যোগাযোগ, অন্যান্য জোগারপাতি) করে ওতেলিয়া। এমনকি বন্ধুর প্রয়োজনে তাকে ধর্ষিতা হওয়াও মেনে নিতে হয়। এমন প্রগাঢ় একং অটল বন্ধুত্ব বিরল। চলচ্চিত্রটি ওতেলিয়া এবং গাব্রিটার জীবনের একটি দিন দেখায়। তাদের মানসিক অবস্থার সাথে সাযুজ্য রেখেই আমরা পুরো চলচ্চিত্রটিতে কোনও উজ্বল আলোর ব্যাবহার দেখি না। আউটডোর দৃশ্যায়নের ক্ষেত্রে দেখি মেঘলা আকাশ এবং ইনডোর দৃশ্যায়নে সর্বত্রই অনুজ্বল আলো। একটি দমবন্ধ পরিবেশ চিত্রায়নে পরিচালক অসামান্য কুশলতার স্বাক্ষর রাখেন।

ক্রিশ্চিয়ান মুনজিও, ক্রিস্ট পুই, কর্ণেলি পরম্বুই প্রভৃতি সমসাময়িক কিছু পরিচালক মিলে রোমানিয়ার চলচ্চিত্রকে সারা বিশ্বে নতুন ভাবে উপস্থাপন করছেন। দ্য ডেথ অব মিস্টার লাজারেস্কু, ১২:০৮ ইস্ট অব বুখারেস্ট, ৪ মাস ৩ সপ্তাহ ২ দিন, পুলিশ; অ্যাডজেক্টিভ প্রভৃতি চলচ্চিত্রগুলো বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয় যা রোমানিয়ার চলচ্চিত্রকে একটি ভিন্ন মাত্রা দেয়। এদের হাত ধরে রোমানিয়ার চলচ্চিত্র নতুন যাত্রা শুরু করে যা এখন রোমানিয়ান নিউ ওয়েভ নামে পরিচিত। ক্রিশ্চিয়ান মুনজিও’র ৪ মাস ৩ সপ্তাহ ২ দিন ওই আন্দোলনের পথিকৃৎ একটি চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটি ২০০৭ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাম-দ’র পুরষ্কার লাভ করে। এছাড়া অসংখ্যা চলচ্চিত্র উৎসবে পুরষ্কৃত হয়। প্রখ্যাত অনেক সমালোচক চলচ্চিত্রটিকে ২০০৭ সালের সেরা চলচ্চিত্রের মর্যাদা দিয়েছে।