শিল্পকলা একাডেমির আর্ট গ্যালারি অডিটরিয়ামে দেখলাম তরুণ নির্মাতা পান্থ প্রসাদের চলচ্চিত্র ‘সাবিত্রী।’ ২২তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্রটি ‘বাংলাদেশ প্যানোরমা’ বিভাগে প্রতিযোগিতা করেছে। ২৪ জানুয়ারি (বুধবার) বিকাল ৫টায় ছিল চলচ্চিত্রটির প্রিমিয়ার শো।
তুষার আবদুল্লাহ’র কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত সাবিত্রী চলচ্চিত্রে পান্থ প্রসাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন প্রান্তিক সমাজের নারীর ত্যাগ তুলে ধরেছেন। যেখানে স্বাধীনতার ৫০ বছর পর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রেক্ষাপটে সেই প্রান্তিক নারী ও তার যুদ্ধশিশুর এই সমাজে টিকে থাকার সংগ্রামের নিগুঢ় অন্তর্বেদনার গল্প রূপায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ইতোমধ্যে প্রচুর চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, এমনকি ভবিষ্যতেও আরও নতুন মাত্রার চলচ্চিত্র নির্মিত হবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে একজন প্রান্তিক সমাজের নারীর ত্যাগ ও সংগ্রামকে যে দৃষ্টিকোণ থেকে পান্থ প্রসাদ চলচ্চিত্রে রূপায়ন করেছেন, তা এককথায় অসাধারণ। সাবিত্রী চলচ্চিত্রে একজন নারী চা শ্রমিকের জীবনের গল্প বলেছেন পান্থ প্রসাদ। সাবিত্রী একাত্তরের একজন বীরাঙ্গনা, যার একটি যুদ্ধ শিশু রয়েছে। তার নাম মঙ্গল বাউরী।
এছাড়া এই পরিবারের সঙ্গে অত্যন্ত শক্তিশালী ও নির্ভরতার একটি সম্পর্ক রয়েছে আলী আহমেদ নামের একজন মুক্তিযোদ্ধার। জীবনের নানান সংগ্রাম ও চড়াই উতরাইয়ের সময় একাত্তরে পাকবাহিনীর নির্যাতনের শিকার বীরাঙ্গনা সাবিত্রীকে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা নানা ধরনের সহযোগিতা করেন। সাবিত্রী চলচ্চিত্রে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ দেখানো না হলেও মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী যে আফটার ইফেক্ট, অর্থাৎ প্রায় ৫০ বছর পর যখন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়, তখন সাবিত্রী ও তার যুদ্ধশিশু মঙ্গল এবং এই বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী আহমেদের জীবনের ঘটনাবলীকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্নমাত্রায় দৃশ্যায়ন করা হয়েছে।
পান্থ প্রসাদ কার্যত এই তিনটি চরিত্রকে সাবিত্রী সিনেমায় ডিল করেছেন। মূলত বীরাঙ্গনা সাবিত্রী ও তার যুদ্ধশিশু মঙ্গলকে নিয়েই কাহিনীর বিস্তার। স্বাধীনতার অনেক পর দেশে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়, তখন আদালতে সাক্ষী হতে গিয়ে সাবিত্রী ও তার যুদ্ধশিশু মঙ্গল সম্পূর্ণ নতুন এক লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়। স্বাধীনতার এত বছর পরেও সাবিত্রীদের জীবনের এমন নির্মম বাস্তবতা যেন নতুন আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ।
সাবিত্রী সিনেমায় মুক্তিযুদ্ধকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানোর চেষ্টা করেছেন নির্মাতা পান্থ প্রসাদ। চলচ্চিত্রে পান্থ প্রসাদ ভিজুয়াল ল্যাংগুয়েজে একটি চমকপ্রদ গল্প বলার চেষ্টা করেছেন। সাবজেক্টের ওপর পরিমিতিবোধ ও গল্প বলার ঢঙে পান্থ প্রসাদের কারিশমা আমাকে মুগ্ধ করেছে। সিনেমার অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন ড্যানিয়েল ড্যানি ও কমল চন্দ্র দাস। পুরো চলচ্চিত্রে পর্দাজুড়ে চোখ জুড়ানো সব ল্যান্ডস্কেপ, দুর্দান্ত সব শট, বিশেষ করে ঘূর্ণি ও পোকার শট ছিল দুর্দান্ত। ড্যানি ও কমলের যৌথ হাত সাবিত্রী চলচ্চিত্রে যেন ছবির জাদু দেখিয়েছে। জাস্ট আউটস্ট্যান্ডিং।
খুব কথা কম বলে পান্থ প্রসাদ ভিজ্যুয়ালি চলচ্চিত্রটি দেখানোর চেষ্টা করেছেন। পান্থ প্রসাদের গল্প বলার এই বাহারি ঢঙটি আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। যা সাবিত্রী চলচ্চিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। সূর্যোদয়ের দৃশ্য, চা-বাগান, লেক, নদী এবং বিশেষ করে মঙ্গলের জন্মক্ষণের দৃশ্যায়ন এককথায় অসাধারণ সেট ও লোকেশন।
আমার বিবেচনায় সাবিত্রী চলচ্চিত্রের দ্বিতীয় শক্তিশালী দিক হলো ছবির চমৎকার সম্পাদনা। সুজন মাহমুদ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ছবির দৃশ্যগুলো একদম জায়গা মত জোড়া লাগিয়েছেন, যাকে বলে লাফের লাফ খাপ্পের খাপ। সুজনকে এজন্য ক্রেডিট না দিলে স্রেফ অন্যায় করা হবে। সাবিত্রী চলচ্চিত্রের তৃতীয় শক্তিশালী দিক হলো কালার। চোখে শান্তি লাগে সাবিত্রী’তে এমন একটি সফট টোন আমার ভালো লেগেছে। রঙের এই জাদু দেখানোর কৃতিত্বও সুজনের।
সাবিত্রী চলচ্চিত্রের চতুর্থ শক্তিশালী দিক হলো সিনেমার সাউন্ড। সাউন্ডে সুজন দারুণ মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। আদতে চলচ্চিত্রে আমার মতে সিনেমার এডিটিং, সাউন্ড ও কালার নির্মাণে সুজন মাহমুদ সত্যি সত্যিই হ্যাট্রিক করেছেন। পান্থ প্রসাদ ছবিতে আদতে যা দেখাতে চেয়েছেন, সুজন মাহমুদ কার্যত সম্পাদনায়, শব্দশৈলীতে ও রঙবিন্যাসে তাই করে দিয়েছেন। এককথায় চমৎকার কম্বিনেশন। পান্থ-সুজন মানিক জোড়। সাধু সাধু।
সাবিত্রী চলচ্চিত্রের পঞ্চম শক্তিশালী দিক সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও গান। সাত্যকী বন্দোপাধ্যায় সাবিত্রী চলচ্চিত্রে অত্যন্ত কার্যকর বিজিএম করেছেন। চলচ্চিত্রের দুটি গান ‘নাম-রূপ তকমা দিয়া দয়াল গড়াইছো সংসার’ এবং ‘যে যায় সেকি আসলেই যায়, নাকি যাওয়া আসা বলে কিছু নেই’-এর গীতিকার পান্থ প্রসাদ। গান দুটিতে অসাধারণ কণ্ঠ ও সুর দিয়েছেন সাত্যকী বন্দোপাধ্যায়, যা সিনেমার সঙ্গে দারুণ মানিয়েছে।
চলচ্চিত্রের চরিত্রায়ণে পান্থ প্রসাদ বিশেষ যত্নবান ছিলেন। মঙ্গল বাউরী (যুদ্ধশিশু বড়) চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন সৈকত সিদ্দিকী। সৈকত সিদ্দিকীর লম্বা পেটানো শরীর যেন চা শ্রমিক মঙ্গলের দিব্য প্রতিরূপ। সাবিত্রী (বড়) চরিত্রে নারগিস আক্তার ছিলেন দুর্দান্ত। বিশেষ করে তার বেশ কিছু এক্সপ্রেশান এবং চোখের ভাষা যেন সত্যি সত্যি বাংলাদেশের দুঃখী বীরাঙ্গনাদেরই বাস্তব চিত্ররূপ তুলে ধরেছে। সাবিত্রী (ছোট ’৭১) চরিত্রে বৈশাখী ঘোষও দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। তবে এক্সপ্রেশানে কিছু ওভার অ্যাক্টিং চোখে পড়েছে।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউটরের চরিত্রে রোকেয়া প্রাচীর অভিনয়ও মনে রাখার মত। যুদ্ধাপরাধীদের ট্রাইব্যুনালে একজন প্রসিকিউটরকে যে ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তার এক অপূর্ব রূপায়ন যেন রোকেয়া প্রাচীর দুর্দান্ত অভিনয়। চলচ্চিত্রে অতিথি শিল্পী হিসেবে অভিনয় করলেও একটি পূর্ণাঙ্গ চরিত্র যেন ফুটে উঠেছে তার অভিনয়ের ভাষায়। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার (বর্তমান ও ’৭১) চরিত্রে অনন্ত হীরা সাবলীল অভিনয় করেছেন। যদিও কমান্ডারের কস্টিউম নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত আমার আছে। সাবিত্রীর বাবা চরিত্রে বৈদ্যনাথের অভিনয় আমার হৃদয় ছুঁয়েছে। এছাড়া হরিবালা চরিত্রে হাসিমুন বাওয়া ও নিতাই চরিত্রে শ্যামল বাউরীর অভিনয় আমার ভালো লেগেছে।
সিনেমার এন্ডিংয়ে দেখা যায় সাবিত্রী ও মঙ্গল ট্রেনে শ্রীমঙ্গল থেকে ঢাকা শহরে যাচ্ছে, যা দেখে দর্শক বুঝতে পারে সাবিত্রী আদতে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আদালতে সাক্ষী দিতেই শহরে যাচ্ছে। সাবিত্রী চলচ্চিত্রের লোকেশন সুন্দর, ক্যামেরার মুভমেন্ট সুন্দর, আর সবচেয়ে সুন্দর পান্থ প্রসাদের ভিজ্যুয়ালি গল্প বলার ল্যাংগুয়েজ। চলচ্চিত্রের চমৎকার টাইটেল করেছেন রহমান আজাদ এবং ইংরেজি সাব-টাইটেল করেছেন সয়রা মাহমুদ।
এতক্ষণ সাবিত্রী চলচ্চিত্রে মুগ্ধ হবার বিষয়গুলো বললাম। এবার এই ছবির কিছু নেগেটিভ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ না করলে হয়তো এই সংক্ষিপ্ত আলোচনাটি একপাক্ষিক হয়ে যাবে। তার আগে বলে রাখি, একটা চলচ্চিত্র প্রথম দেখাতেই আমি কোনো ধরনের সমালোচনা করতে পারি না, এমনকি করিও না। সেই অধিকারও আমার নেই। একটি চলচ্চিত্র বেশ কয়েকবার দেখার পর সেই চলচ্চিত্রটি আমার কেমন লাগল, সেই চলচ্চিত্রের বিষয়-আশয় কী, পাত্রপাত্রী কারা, অভিনয় কেমন লাগল, গল্প বলার ভঙ্গি কেমন চিত্মাকর্ষক হলো, সাবজেক্ট বা কনটেন্ট কী নিয়ে ডিল করল এসব নিয়ে আমি অনেক ভাবনা চিন্তা করি।
সেই চলচ্চিত্রের ফটোগ্রাফি কেমন লাগল, বিজিএম কেমন লাগল, মিউজিক কেমন, কান কতটা আরাম পেল, চোখ কতটা মুগ্ধ হলো, লোকেশন কেমন, ছবিতে চরিত্রায়ন কেমন হয়েছে, সেট কেমন হয়েছে, কস্টিউম কেমন মানানসই ছিল, গ্রাফিক্স, অ্যানিমেশানের ব্যবহার কতটা চমকপ্রদ হলো, আফটার ইফেক্টস কেমন লাগল, সাব-টাইটেল কতটা প্রপার হলো, এরকম অসংখ্য বিষয়-আশয়ের একটি জটিল পরিক্রমা আমার মাথায় চক্কর দেয়। এসবের আলোকে চলচ্চিত্রটি নিয়ে আমি কেবল আমার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা ব্যাপারগুলো সাদামাটাভাবে বলতে পারি। সেই বিবেচনায় সাবিত্রী নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো কথা বলার সময় হয়নি। বরং সাবিত্রী চলচ্চিত্রে পান্থ প্রসাদকে আমি দীর্ঘদিন নানান মাত্রায়, নানান ভঙ্গিতে, নানান অযুহাতে অবর্জাবেশনে রাখার অঙ্গীকার করি।
পান্থ প্রসাদের গল্প বলার ঢঙটি যদিও একটু ধীরলয়ের। এটি কখনও কখনও আমাকে মনোটোনাস হতে আচ্ছন্ন করে। আবার কখনও মনে হয়, ধীরগতি ও ধীরলয়ের কারণেই হয়তো দীর্ঘ ৫০ বছর আগের গল্পটি বর্তমান সময়ে নতুন মাত্রা পেল। দর্শকদের মনে হতে পারে দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে আমরা গল্পটি পর্দায় দেখছি। এ যেন সত্যিকার বাংলাদেশের বাস্তব চিত্রকেই মাত্র ১১১ মিনিটে পান্থ প্রসাদ দেখিয়ে দিলেন। 'সাবিত্রী' যেন আমাদের এক জাদুবাস্তবতার টোটাল ঘেরাটোপে আটকে রাখে। কখনও বা সেখানে একাত্তর সাল কখনও বা সেখানে বর্তমানকাল, যেন এক ঘোরলাগা ভিজ্যুয়াল।
কখনও কখনও পান্থ প্রসাদের দীর্ঘ দীর্ঘ শটগুলো গল্পের একেবারে ভেতরে ডুব দিতে বা অনুপ্রবেশ করতে আমাদের যেমন উসকানি দেয়। তেমনি আবার একই সময়ে এসব দীর্ঘ শট দর্শকদের মনোসংযোগে বিপত্তির কারণও হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। তাই আমি বলব, পান্থ প্রসাদ যেন দীর্ঘ শটগুলো নিয়ে আরেকটু লজিক্যাল ভাবনা পুনর্বিবেচনা করেন। পাখি উড়বে, কিন্তু কতক্ষণ ধরে উড়বে, গাড়ি চলবে, কিন্তু কতক্ষণ ধরে চলবে, প্রাকৃতিক নৈসর্গ ক্যামেরায় কতক্ষণ ধরে দেখানো হবে, এই বিষয়গুলোতে পান্থকে আরেকটু চিন্তাশীল প্রয়োগে যত্নবান হবার পরামর্শ রইল। সবমিলিয়ে এককথায় 'সাবিত্রী' একটি কমপ্লিট ঘেরাটোপে চলচ্চিত্র।
পান্থ প্রসাদ চলচ্চিত্রটি উৎসর্গ করেছেন তার সিনেমাগুরু বিশিষ্ট নির্মাতা মোরশেদুল ইসলামকে। সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত ‘সাবিত্রী’খুব শিগগির সিনেমাহলে মুক্তি পাবে। আমি মনে করি, ‘সাবিত্রী’ চলচ্চিত্রটি দর্শকদের একটি ভিন্নমাত্রার চিন্তার খোরাক জোগাবে এবং ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে এ ধরনের ভিন্নমাত্রার বা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে চলচ্চিত্র বানানোর প্রেরণা হিসেবে নতুন নির্মাতাদের বিপুল উৎসাহ দেবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
পরিমিতিবোধ ও নতুন মাত্রার চলচ্চিত্র উপহার দেবার জন্য তরুণ নির্মাতা পান্থ প্রসাদকে আমার অন্তর নিংড়ানো শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। ‘সাবিত্রী’ টিমের সবাইকে শুভেচ্ছা। জয়তু বাংলা সিনেমা।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
নিয়ন্ত্রণ হারালে যা ঘটবে তার জন্য আমি ভীত
বিড়াল আটক
পুত্রবধূকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে নিজেও ভর্তি রাজা তৃতীয় চার্লস
একাশিতে মার্টিন স্করসেসি