উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির কারণে যমুনা নদীতে পানি বাড়ছে। নদীটির অববাহিকায় বেড়েছে ভাঙনও। গতকাল শুক্রবার সিরাজগঞ্জে নতুন করে ৮০ মিটার অংশ যমুনায় ধসে গেছে। যমুনায় বিলীন হয়েছে বাড়িঘর। ভাঙন হুমকিতে রয়েছে শতাধিক স্থাপনা। ধস ঠেকাতে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সিরাজগঞ্জের মতো বগুড়ায় যমুনার পাড়ে ভাঙন আতঙ্কে দিন পার করছে মানুষ।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্টে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যমুনা নদীর পানি ৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ১১ দশমিক ৮২ মিটার ও কাজীপুর মেঘাই ঘাট পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলে জেলার অনেক নিম্নাঞ্চল বন্যার পানিতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস থেকে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে কাজীপুর উপজেলা শহর রক্ষার জন্য তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের প্রচেষ্টায় মেঘাই খেয়াঘাট এলাকায় ৩০০ মিটার স্পার নির্মাণ করা হয়। ২০১২ ও ২০১৩ সালে স্পারটির মূল অংশের ১৫০ মিটার ধসে যায়। পরে স্পারের মাটির অংশটুকু রক্ষায় সিসি ব্লক দিয়ে প্রটেকশন তৈরি করা হয়। এই স্পার বাঁধটির ৩০ মিটার অংশ গতকাল সকালে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। ফলে কাজীপুর সদরে অবস্থিত কাজীপুর থানা কার্যালয়, খাদ্য গুদাম, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, কাজীপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনসহ শতাধিক সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা হুমকির মুখে পড়েছে।
কাজীপুর সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান বিপ্লব জানান, যমুনা নদীতে গত কয়েক দিন ধরে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে এদিন সকালে হঠাৎ করেই মেঘাই ১ নম্বর সলিড স্পার বাঁধ এলাকায় প্রচণ্ড ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হয়ে মুহূর্তের মধ্যে স্পার বাঁধের ৩০ মিটার অংশ নদীতে চলে গেছে।
জালালপুর গ্রামের আলহাজ আলী জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে জালালপুর গ্রামে যমুনা নদীর ভাঙন শুরু হয়। গতকাল সকালে জালালপুর মধ্যপাড়া মহিরের বাড়ির সামনের ৫০ মিটার এলাকা ধসে গিয়ে ১০টি বাড়িঘর যমুনায় বিলীন হয়ে যায়। ফলে ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ আতঙ্কে দিন পার করছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রণজিত কুমার সরকার জানান, উজানে ও দেশের অভ্যন্তরে ভারী বৃষ্টির কারণে কয়েক দিন ধরেই যমুনায় পানি বাড়ছে। এতে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে নদীতীরবর্তী এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। আরও দুই-তিন দিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, কাজীপুর মেঘাই স্পার বাঁধ ধসে যাওয়ার খবর পেয়েই বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ধস ঠেকানোর কাজ শুরু করা হয়। দুপুর নাগাদ ভাঙন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ওই এলাকা এখন ঝুঁকিমুক্ত। অন্যদিকে শাহজাদপুর উপজেলার জালালপুরে ভাঙন এলাকায়ও বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, ওখানকার ভাঙনও দ্রুত রোধ হবে।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি আগামী পাঁচ দিন অব্যাহত থাকবে। তবে ১৫ দিনের মধ্যে বড় কোনো বন্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই বলে নিশ্চিত করেছে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড। অন্যদিকে উপজেলার প্রায় ১২২টি চরে পানি উঠতে শুরু করায় ভাঙন আতঙ্ক বেড়েছে।
বগুড়া জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সারিয়াকান্দিতে গত ২২ জুন পর্যন্ত যমুনা নদীর পানি সর্বশেষ সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেদিন পানির উচ্চতা ছিল ১৫ দশমিক ৭৬ মিটার। ২৪ জুন থেকে পানি কমতে শুরু করে। ১ জুলাই পর্যন্ত পানি কমতে থাকে। পরদিন ২ জুলাই থেকে আবারও যমুনা নদীর পানি বাড়া শুরু হয়, ওইদিন পানির উচ্চতা ছিল ১৪ দশমিক ৪৭ মিটার। গতকাল দুপুর ৩টার দিকে যমুনা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১৫ দশমিক ২ মিটার। অর্থাৎ গত সাত দিনে যমুনার পানি ৫৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পানি এখনো বিপদসীমার ১২২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে ফের পানি বেড়ে সারিয়াকান্দি উপজেলার দক্ষিণ শংকরপুর, পূর্বধারাবর্ষা, পশ্চিম ধারাবর্ষা, কেষ্টিয়ারচর, কোমরপুর, চানবাড়ী, মাঝবাড়ী, কালাইহাটা, পেতিবাড়ী, চরমাঝিরা, হাতিয়াবাড়ী, কালিয়ানসহ প্রায় ১২২টি চরের লোকালয়ের চারপাশে পানি উঠতে শুরু করেছে। ফলে সেখানকার বাসিন্দারা পানিবন্দি হতে শুরু করেছে।
বগুড়া জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হক বলেন, আগামী পাঁচ দিন পর্যন্ত যমুনার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে এ যাত্রায় পানি বিপদসীমা অতিক্রম করার শঙ্কা খুবই কম। আশা করা যাচ্ছে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বড় কোনো বন্যা হবে না।
সারিয়াকান্দি ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক বলেন, ‘বন্যা মোকাবিলায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।’