৬৫% করদাতাই তথ্য গোপনকারী

মোট জনসংখ্যার ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ ইটিআইএন গ্রহণ করেছে। গত করবর্ষে ইটিআইএন থাকার পরও মোট করদাতার ৬১ দশমিক ১১ শতাংশ নিয়মিত রিটার্ন জমা দেয়নি। যারা রিটার্ন জমা দেয়নি তাদের অর্ধেকের বেশি প্রায় ৬৫ শতাংশই আয় ও সম্পদের তথ্য গোপন করে নিজেদের করযোগ্য আয় নেই, এমন দাবি করেছে। এর মধ্যে (৬৫ শতাংশ) ইটিআইএন নেওয়ার পর একবারের জন্যও রিটার্ন জমা দেয়নি এমন করদাতার সংখ্যা গড়ে ২৫ শতাংশ। বাকিরা গত করবর্ষে রিটার্ন জমা না দিলেও এর আগে সরকারি-বেসরকারি কাজ করতে অনিয়মিতভাবে রিটার্ন জমা দিয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তৈরি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতেই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এনবিআরের কাছে চিঠি পাঠিয়ে কারা রিটার্ন জমা দেয়নি তাদের চিহ্নিত করতে নির্দেশ দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ সামনে রেখে এরই মধ্যে প্রতিটি কর অঞ্চল নিজেদের কর্মকর্তাদের নিয়ে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করেছে। টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা চলতি সপ্তাহ থেকেই ইটিআইএনের সঙ্গে রিটার্ন জমার তথ্য মিলিয়ে দেখবে। কোনো করদাতা রিটার্ন জমা না দিলে তার আয়-ব্যয় ও সম্পদের তথ্যের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। করযোগ্য আয় থাকার পরও রিটার্ন জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট করদাতাকে রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হবে। হিসাব কষে বের করা হবে করদাতা ইটিআইএন গ্রহণের পর থেকে কত করবর্ষ রিটার্ন জমা দেয়নি। এরপর জরিমানাসহ বকেয়া কর পরিশোধ করে রিটার্ন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হবে।

রিটার্নে বড় ধরনের তথ্য গোপন করার প্রমাণ পাওয়া গেলে আরও বিস্তারিত তদন্তের জন্য এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)-এ ফাইল পাঠানো হবে। এখানে তথ্য গোপনের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর রাজস্ব ফাঁকিবাজ করদাতার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। তার পরিবারের সদস্যদের রিটার্নের তথ্যও খতিয়ে দেখা হবে। কর এজেন্ট নিয়োগের পর রিটার্নের তথ্য খতিয়ে দেখতে তাদের সহায়তা নেওয়া হবে। তবে কোনো করদাতা কোনোভাবেই রিটার্ন জমা না দিলে তার কর সার্কেল থেকে রিটার্ন ফাইল খুলে দেওয়া হবে। এরপর বকেয়া ও নিয়মিত কর আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট করদাতার হিসাব জব্দ করা হবে। আভিজাত্যপূর্ণ এলাকার বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট এবং বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের রিটার্ন জমার তথ্য টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন। 

এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো এনবিআরের লোকবলের স্বল্পতা রয়েছে। এছাড়া এনবিআরের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও পুরোপুরি হয়নি। তাই সব করদাতার ইটিআইএন ধরে রিটার্ন জমা দিয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা বেশ কঠিন হবে। তবে সীমিত আকারেও যদি এনবিআর তথ্য গোপন করে রিটার্ন জমা দেয়নি এমন করদাতা বের করে শাস্তির আওতায় আনতে পারে তবে অন্যরা এনবিআরের নজরে পড়ার ভয়ে নিয়মিত কর পরিশোধ করে রিটার্ন জমা দিতে এগিয়ে আসবে। 

এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে মোট ইটিআইএন ধারীর সংখ্যা ৯০ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে গত করবর্ষে রিটার্ন জমা দিয়েছে প্রায় ৫৫ লাখ করদাতা।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা যায়, যারা ইটিআইএন নেওয়ার পরও রিটার্ন জমা দেয়নি তাদের রিটার্ন খতিয়ে দেখা গিয়েছে, অনেকে স্ত্রী, সন্তান বা পরিচিতজনের নামে ব্যবসা এবংস্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ করেছে। ব্যবসা থেকে আয় করা অর্থ এসব ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণেই ব্যয় করা হয়েছে। একইভাবে ব্যাংকের হিসাবও এদের নির্দেশেই পরিচালিত হয়েছে। অন্যের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করে অনেকে অর্থপাচারের মতো জঘন্য কাজ করেছে। এনবিআরের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কম থাকায় এসব ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা বেশিরভাগ সময়ই সম্ভব হয় না। 

ইটিআইএন নিয়ে করযোগ্য আয় থাকার পরও রিটার্ন জমা দেয়নি এমন করদাতাদের অনেকে উপজেলা পর্যায়ে বসবাস করে। এরা বছরের পর বছর রিটার্ন জমা না দিয়েও এনবিআরের নজরদারির বাইরেই থাকছে। চলতি অর্থবছরে উপজেলা পর্যায়ে নতুন করে ১৫টির বেশি রাজস্ব দপ্তর স্থাপন করতে করযোগ্য ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে  অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এনবিআরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, মোটা দাগে সব ইটিআইএনধারীর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক এবং নিয়মমাফিক রিটার্ন জমা না দিলে আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও রিটার্ন জমা না দেন তাহলে সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তা আয়কর অধ্যাদেশের ৮৪ ধারা অনুযায়ী কর নির্ধারণ করে কর নথি চালু করতে পারেন। করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও রিটার্ন জমা না দিলে আয়কর আইন অনুযায়ী জরিমানা, সরল সুদ ও বিলম্ব সুদ আরোপের বিধান রয়েছে।

এর মধ্যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে আয়কর অধ্যাদেশের অনুযায়ী জরিমানা, অতিরিক্ত সরল সুদ এবং বিলম্ব সুদ দিতে হবে। আয়কর অধ্যাদেশে বলা আছে, করদাতা যদি কোনো কারণ ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ে রিটার্ন দাখিল না করেন, আবার এজন্য অনুমোদনও না নেন, সেজন্য তার পূর্ববর্তী বছর প্রদেয় করের ১০ শতাংশ অর্থ জরিমানা হবে। সেই সঙ্গে যতদিন দেরি হবে, প্রতিদিনের জন্য বাড়তি মাশুল গুনতে হবে। দেরিতে রিটার্ন জমা দিলেও ৪ শতাংশ বিলম্ব সুদ দিতে হবে।

প্রসঙ্গত, চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি আদায় করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।