রাজধানীর পাশাপাশি চট্টগ্রাম, রংপুর, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ ও বগুড়ার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ ও বগুড়ায় ২ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার না থাকায় হাসপাতালের সাধারণ রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
নোংরা পরিবেশে চমেকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা : চট্টগ্রামে একদিনে নতুন করে আরও ৭৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে নতুন করে আক্রান্তদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৩৭ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৩৭ জন ভর্তি হয়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যায়নি কেউ। এ নিয়ে চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে গত ১ জানুয়ারি থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭ জনই শিশু।
রবিবার চমেক হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা। শৌচাগারের দরজা খোলা। ভাসছে মলমূত্র। মেঝেতে চলছে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা। তাদের পাশেই ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। নোংরা পরিবেশে সাধারণ রোগীর সঙ্গে রেখেই ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা চলছে। শয্যা না পেয়ে অনেক ডেঙ্গু রোগীর স্থান হয়েছে ওয়ার্ডের মেঝেতে। তাদের মধ্যে অনেকে মশারি ছাড়াই থাকছেন।
নগরের এনায়েতবাজার এলাকার বাসিন্দা আবদুল গফুর। পেশায় তিনি রিকশাচালক। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৮ জুলাই রাতে ভর্তি হয়েছেন ১৪ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডে। গফুর অভিযোগ করে বলেন, ‘সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ৪০ নম্বরে চিকিৎসাধীন আছি। একজন চিকিৎসকেরও দেখা পাচ্ছি না।’
ডেঙ্গু রোগীর চলমান ঊর্ধ্বমুখী হার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আগামীতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ। এদিকে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অবনতির দিকে গেলেও চমেক হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য চালু করা হয়নি আলাদা কোনো কর্নার। নোংরা পরিবেশে চলছে ডেঙ্গু রোগীদের সেবা। হাসপাতালের ভর্তি হওয়া কিছু রোগী চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগও করেছেন। তবে চমেক কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কোনো কর্নার চালু না হওয়া প্রসঙ্গে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান বলেন, ‘জায়গার অভাবে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কর্নার চালু করা যায়নি। বিষয়টি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকেও জানিয়েছি। হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু কর্নার করতে বিভাগীয় পরিচালককে প্রস্তাব দিয়েছি। ডেঙ্গু রোগীর চলমান ঊর্ধ্বমুখী হার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আগামীতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।’
রমেকে ভর্তি রোগী সবই ঢাকা থেকে আসা : রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (রমেক) ডেঙ্গু চিকিৎসায় আলাদা কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেই। তবে এক রোগীর মৃত্যুতে কিছুটা তৎপর হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের রমেকের নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলার মেডিসিন ওয়ার্ডের ৩ নম্বর এবং ৬ নম্বর ইউনিটের কর্নার অংশে চিকিৎসা দিতে দেখা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৭ রোগী ভর্তিসহ এ হাসপাতালে বর্তমানে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে। রমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে রংপুরে ডেঙ্গু রোগীর প্রায় সব রোগীই ঈদে ঢাকা থেকে আসা মানুষ।
গতকাল মঙ্গলবার হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, সাধারণ রোগীদের ইউনিটের পাশেই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে আলাদা ইউনিট স্থাপনের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল প্রশাসন। আলাদা ওয়ার্ড না থাকায় আতঙ্কে আছেন চিকিৎসা নিতে আসা অন্য রোগী ও তাদের স্বজনরা।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মাহফুজ রহমান জানান, ভর্তি হওয়া রোগীর মধ্যে রংপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস করা মানুষ নেই বললেই চলে। এসব রোগীদের যথাযথভাবে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে।
রমেক পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী জানান, হাসপাতালে যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের কাছ থেকে আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি। যদি কেউ অভিযোগ করেন তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। এছাড়াও ডেঙ্গু রোগীদের বিশেষ নজরে রাখারও আশ্বাস দেন তিনি।
রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, মশার উপদ্রব কমাতে সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন ওষুধ স্প্রে দিয়ে ছিটানোর কার্যক্রম বর্ষার কারণে কিছু কিছু জায়গায় বন্ধ রয়েছে। তবে আমরা দ্রুত সব জায়গায় মশা নিধন স্প্রে দেওয়া শুরু করব।
ফরিদপুরের বিভিন্ন হাসপাতালে ৬১ রোগী : গত কয়েক দিনে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় অর্ধশতাধিক রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে ৬ জন।
ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মহা. এনামুল হক জানান, এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে তাদের চিকিৎসা করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ডে ভাগ করে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে।
ফরিদপুর জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর ফরিদপুর জেলায় সর্বমোট ১১৩ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন। তার মধ্য ৫২ জন রোগী ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেছেন। ফরিদপুরে বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন ৬১জন।
ময়মনসিংহ মেডিকেলে ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু, একজনের মৃত্যু : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে আসমা বেগম (৫০) নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার বিকেল পৌনে ৬টার দিকে তিনি মারা যান। পুরান ঢাকা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আসমা সোমবার বিকেলে এই হাসপাতালে ভর্তি হন।
ডাক্তার ফরহাদ হোসেন হীরা জানান, সম্প্রতি ডেঙ্গু রোগী আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় আজ (গতকাল) থেকে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সকাল থেকে ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ১৭ জন পুরুষ ও ৮ জন নারীর রোগীর জন্য বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজনে তা আরও বাড়ানো হবে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছে তিনজন। এ নিয়ে হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে মোট ২৭ জন ডেঙ্গু রোগী।
এদিকে, গতকাল সকালে ময়মনসিংহ নগরীকে মশক ও ডেঙ্গুমুক্ত রাখতে মশক নিধন ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। এ সময় সিটি মেয়র বলেন, আমরা নগরীকে মশক ও ডেঙ্গুমুক্ত রাখতে ক্র্যাশ প্রোগ্রামের পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
বগুড়ায় বৃদ্ধের মৃত্যু : জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাফিজার রহমান (৭৫) নামের এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া হাফিজার রহমান নন্দীগ্রাম উপজেলার কুমিড়ার বাসিন্দা। দুপুরে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শফিক আমিন কাজল। বর্তমানে বগুড়ায় ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বগুড়ায় বর্তমানে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ২ জন এবং শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।