পটুয়াখালী ও পাশের জেলাগুলোর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার। ৫৮৪ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রকল্পে ভারতীয় ঋণই ছিল ২৬৮ কোটি টাকা। কিন্তু ভারত তাদের পুরো ঋণ বাতিল করায় এখন তা সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নের বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ইতিমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) নমনীয় ঋণের ২৬৮ কোটি টাকা মূলত হাসপাতালের যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ও বাহ্যিক ইলেকট্রোমেকানিক্যাল কাজের জন্য বরাদ্দ ছিল। কিন্তু হাসপাতালের নির্মাণকাজ ২০২১ সালের জুনের মধ্যে শেষ করতে না পারায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ ঋণ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মন্ত্রণালয়ে স্টিয়ারিং কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ খাতগুলোর ব্যয় সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক আবদুর রহিমের মোবাইল ফোন নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রকল্পটির স্থান নির্বাচন করতেই সময় পার হয়েছিল। কাজ শুরু করতেই এক বছর দেরি হয়। এ বিলম্বের কারণেই মূলত ভারতীয় ঋণ বাতিল হয়েছে।
প্রকল্পের তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, প্রকল্পের মূল প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ৬৬ কোটি টাকা বাড়িয়ে নতুন করে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। মেয়াদ দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, এ প্রকল্পটি ২০১৬ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদিত হয়। অনুমোদনের সময় মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। এরপর কাজ শেষ করতে না পারায় আবার মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এ নির্ধারিত সময়েও কাজ শেষ করতে না পারায় ভারতীয় ঋণে প্রকল্পটি না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বর্তমানে প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ৭৫ শতাংশ। অনেক কাজ শেষ হয়ে গেলেও ভারতীয় ঋণের টাকায় যেসব খাত বাস্তবায়নের কথা ছিল, সেগুলোর কোনো কাজই হয়নি। ভারতীয় ঋণের টাকায় মেডিকেল যন্ত্রপাতি, অফিস সরঞ্জাম, অন্য যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র কেনার কথা ছিল। কিন্তু ঋণ বাতিল হওয়ায় কোনোটিই কেনা হয়নি।
এ ছাড়া প্রিন্সিপালের বাসভবন ও পরিচালকের বাসভবন তৈরির কাজের অগ্রগতি শূন্য। একই অবস্থা জিমনেশিয়াম, মসজিদ, বিদ্যুতের সাবস্টেশন, পাম্প হাউজ, গোডাউনসহ ১২টি স্থাপনার কাজে হাতই দিতে পারেনি। তবে ইতিমধ্যে ২৫০ শয্যার মূল হাসপাতাল ভবনটির কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের হোস্টেল নির্মাণের কাজ শতভাগ শেষ হলেও ডাক্তারদের ডরমিটরির কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
প্রকল্পের কাজের ধীরগতির কারণে প্রায় সব খাতেই ব্যয় বেড়েছে সংশোধনী প্রস্তাবে। ৪ দশমিক ৮৭ একর জমির জন্য মূল প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬০ কোটি টাকা, কিন্তু সংশোধনীতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ কোটি টাকা। হাসপাতাল ভবনের অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১৬৪ কোটি টাকা, কিন্তু সংশোধনীতে ২৬ শতাংশ বেড়ে তা হয়েছে ১৭৩ কোটি টাকা। আসবাবপত্র কেনার জন্য অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, কিন্তু সেটি বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি। তবে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি কেনার জন্য অনুমোদিত ব্যয় ছিল ২০৪ কোটি, সেটি কমে হয়েছে ১৭৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় হাসপাতালটির অ্যাকাডেমিক ভবন তৈরির কাজে অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৭৭ কোটি টাকার বেশি, এ ব্যয় ২৬ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয়েছে ১১৬ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি সংশোধনের কারণ হিসেবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এলওসি ঋণ প্রত্যাহারের কারণে সম্পূর্ণ জিওবি (সরকারি) অর্থে প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভারতীয় ক্রেডিট লাইন প্রত্যাহার (ডি-লিস্টিং) করায় প্রকল্প ঋণের অর্থ ২৬৮ কোটি টাকা বাদ পড়েছে প্রকল্প থেকে। তাছাড়া মূল প্রকল্পে ৪ দশমিক ৮৭ একর জমির দাম ছিল ৬০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। কিন্তু জেলা প্রশাসনের বাজারদরে জমির মূল্য প্রাক্কলন করা হয় ৬৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। বর্ধিত ৯ কোটি ১৪ কোটি টাকা সংশোধিত প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জানা গেছে, ডিজাইন বিভাগের নকশা অনুযায়ী আরসিসি গ্রিকাস্ট পাইলের সংখ্যা বৃদ্ধি, নির্মাণস্থলে বালু ভরাট ও আরসিসি ঢালাই করা, গ্রেটবিম ও ছাদের বিমের পুরুত্ব বৃদ্ধি, ফলসসিলিং ও টাইলস কাজ, দুটির স্থলে তিনটি সাবস্টেশন ভবন নির্মাণ এবং আবাসিক ও অনাবাসিক এলাকায় পৃথক জলাধার ও গভীর নলকূপ স্থাপনসহ গণপূর্ত রেট শিডিউল-২০১৮ অনুসরণ করায় নির্মাণ ও পূর্ত কাজে ৪১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয় বেড়েছে।
সংশোধিত ডিপিপিতে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির কারণে পেট্রোল ও লুব্রিকেন্টের জন্য অতিরিক্ত ৮ লাখসহ ১৪ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।
মূল প্রকল্পে আসবাবপত্র খাতের সংস্থান ছিল ১৭ কোটি ৬৩ কোটি টাকা। ওই খাতে গণপূর্ত রেট শিডিউল-২০১৮ অনুযায়ী ২৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকার প্রাক্কলন করা হয়। চিকিৎসা যন্ত্রপাতি (কলেজ ও হাসপাতাল) মূল থাকলে চিকিৎসা ছিল ২০৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। সংশোধিত প্রকল্পে বাজারদর অনুযায়ী যন্ত্রপাতির মূল্যবাবদ ১৭৮ কোটি টাকার প্রাক্কলন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মূল প্রকল্পে এমএসআর খাতের সংস্থান ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। সংশোধিত প্রকল্পে বাজারদর অনুযায়ী তা প্রায় ৫ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে।