মাগুরা জেলার মহম্মদপুরের রাজাপুর গ্রামের নয়ন মোল্যা, ইকতিয়ার মোল্যা, রেহেনা বেগম ও আজিজ মোল্যারা সবাই পেশায় দিনমজুর ও ভ্যানচালক। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) দ্বিতীয় পর্যায়ের মজুরির টাকার অপেক্ষায় ছিলেন এসব শ্রমজীবী। সেই টাকা এলো মোবাইল ব্যাংকিংয়ে। বিস্ময়করভাবে সেই প্রাপ্য টাকার সঙ্গে অনেকে ১০ গুণ টাকাও পেলেন। আনন্দে শ্রমজীবী মানুষগুলো টাকা তুলেও ফেলেছেন। এখন সেই টাকাই গলার কাঁটা হয়ে গেছে। কারণ, বাড়তি এ টাকা আদায়ের জন্য এখন তাদের ধড়পাকড় করা হচ্ছে। এটা শুধু মাগুরার চিত্র নয়; এ ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন জেলার ১০টি ভিন্ন ভিন্ন উপজেলায়।
সম্প্রতি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় এ মজুরির টাকা বিতরণ করা হয়। উপকারভোগীদের শ্রম মজুরি গভর্নমেন্ট টু পারসন (জিটুপি) পদ্ধতিতে পরিশোধ করা হয়। মজুরিভোগীরা সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে মোবাইল আর্থিক সেবা নগদের মাধ্যমে ৭ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত কাজের মজুরি পাওয়ার কথা। আর এখানেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রির ভুলে মোবাইল অ্যাকাউন্টে চলে গেছে প্রায় ১০ গুণ টাকা।
যদিও মন্ত্রণালয় বলছে, ভুলটা তাদেরই। আইবাস সিস্টেমের ভুলের কারণে দশমিক বাদ পড়ায় এমনটি ঘটেছে। যে শ্রমিক ৩১৭২.০৫ টাকা পেতেন, মন্ত্রণালয়ের ভুলে দশমিক বাদ পড়ায় নগদ অ্যাকাউন্টে পৌঁছেছে ৩ লাখ ১৭ হাজার ২০৫ টাকা। এদিকে শ্রমজীবীদের মধ্যে যারা অর্থ উত্তোলন করেছেন, অধিকাংশই তা খরচ করে ফেলেছেন। এখন তাদের টাকা ফেরত দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মোটা অঙ্কের এ টাকা খরচ করে ফেরত দিতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হতদরিদ্র সুবিধাভোগীরা। তারা জানিয়েছেন, তারা আয় করে কিস্তিতে শোধ করবেন। একসঙ্গে তারা এত টাকা দিতে পারবেন না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মিজানুর রহমানের কাছে এ ভুলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ২৫ জুন আমার কাছে তথ্য আসে, আইবাস সিস্টেমে সমস্যা হয়েছিল। জানার সঙ্গে সঙ্গে সেটি বন্ধ করে দিয়েছি। যে পরিমাণ টাকা চলে গেছে তার ৮৫ শতাংশ ইউএনও, চেয়ারম্যান বা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এগুলো সমন্বয় করা হচ্ছে। আশা করি শতভাগ সমন্বয় হয়ে যাবে।’
তিনি বলেন, যেহেতু তারা (উপকারভোগীরা) নিয়মিত সুবিধাপ্রাপ্ত। তাদের কাছ থেকে সহজেই টাকা উত্তোলন করা গেছে। একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। মূল ঘটনা তারা বের করে আমাকে রিপোর্ট দেবে। আগামীতে যাতে এ ধরনের ভুল না হয় সেটি নিশ্চিত করা হবে।
১০ উপজেলায় ৯ হাজার ৮৪৬ জন শ্রমিকের বিপরীতে চাহিদা এসেছিল ৮ কোটি ৫৩ লাখ ১০ হাজার টাকা। এ চাহিদাপত্রের কপি দেশ রূপান্তরের হাতে আছে। এরপর সরকারের দিক থেকে প্রতি এক হাজারে ৭ টাকা ক্যাশআউট চার্জ যোগ করা হয়। ফলে এ অঙ্ক দাঁড়ায় ৮ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৪৭২ টাকা। কিন্তু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ভুলের কারণে আসলে শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ৮২ কোটি ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার ৪২৭ টাকা।
চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপচিালক মো. মিজানুর রহমানের স্বাক্ষরে ৮২ কোটি ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার ৪২৭ টাকার কথা উল্লেখ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দেওয়া হয়। এ চিঠির কপি দেশ রূপান্তরের হাতে রয়েছে। পরে এই একই অঙ্ক উল্লেখ করে তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোর কাছে টাকা ছাড় করার জন্য চিঠি পায়।
অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, ডেটা এন্ট্রির গড়বড়ের কারণেই সরকারের এত বেশি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের একাধিক উপপরিচালক এবং পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে এক্সেল ফাইলে ডেটা এন্ট্রি দেওয়া হয়, সেখানে দশমিকের পরও দুই ঘর ছিল। কিন্তু যে এক্সেল ফাইলসহ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সরকারের অনুমোদনের জন্য তোলে সেখানে কোনো দশমিকের ঘর ছিল না। অনেক শ্রমিকের মূল পাওনা ছিল ২ হাজার ৮১৯ দশমিক ৬ টাকা। কিন্তু তিনি পেয়ে গেছেন ২৮ হাজার ১৯৬ টাকা।
গত ২৫ জুন ডাক বিভাগের মোবাইল আর্থিক সেবা নগদের মাধ্যমে এ টাকা বিতরণ করা হয়। এ বিতরণের কিছুক্ষণের মধ্যেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর তাদের ভুলের বিষয়টি বুঝতে পারে এবং মজুরি বিতরণ হওয়া অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করার জন্য নগদকে নির্দেশ দেয়। তারপর থেকে ওই অ্যাকাউন্ট বন্ধ রয়েছে। তবে এরই মধ্যে অনেক অ্যাকাউন্ট থেকে বেশ কিছু টাকা ক্যাশআউট হয়ে গেছে।
মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রামানন্দ পাল বলেন, ‘টাকা ফেরত আনার বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর চিঠি দিয়েছে। সেই আলোকে আমরা ইউপি চেয়ারম্যানদের চিঠি দিয়েছি। অতিরিক্ত টাকা ফেরত আনতে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সহযোগিতায় টাকা ফেরত আনার কাজ চলছে।’
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে নগদের পাবলিক কমিউনিকেশনস বিভাগের প্রধান জাহিদুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের সরকারি বিতরণে কোনো মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানই বিতরণ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট থাকে না। ফলে কাকে কত টাকা দেওয়া হচ্ছে, তা প্রতিষ্ঠানটি আগে জানতে পারে না। বিতরণ সম্পন্ন হলে তারা এসব তথ্য জানতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, এ ভুলের কোনো পর্যায়েই আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। প্রয়োজনে সরকার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি করে বিষয়টি যাচাই করতে পারে।’ নগদ একই সঙ্গেও বলছে যে, প্রায় ১০ গুণ বরাদ্দের ফাইলে মহাপরিচালকের স্বাক্ষর রয়েছে, ফলে তিনিই বলতে পারবেন কোথায় কীভাবে টাকার অঙ্ক এত বেশি হয়েছে।