সকাল থেকে শুরু করে হরদম কেনাকাটা চলছে মার্কেটে, লাগাতার পণ্যের দাম হাঁকতে ব্যস্ত ক্রেতা-বিক্রেতারা। অথচ যে স্থানে বসে বেচাবিক্রি চলছে, ওই ভবনের স্থায়িত্বই অনিশ্চিত। যেকোনো সময়ই ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে পারে শত মানুষের রুটিরুজির উৎস দোকানসহ মানুষের জীবন। ২০১৩ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশন ৩৪টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। পরে চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল নতুন আরও তিনটি ভবন চিহ্নিত করে। এতে ৩৭টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করে সিটি করপোরেশন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শুধু চিহ্নিত করেই দায়সারা দায়িত্ব পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। তবে ভবন ভাঙতেও নারাজ ওইসব ভবনের মালিকরা। ফলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
জানা যায়, বরিশাল সিটি করপোরেশন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করেছে ২০১৩ সালে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকার মধ্যে রয়েছে, নগরীর কাউনিয়ায় জানুকিসিংহ রোডসংলগ্ন মতি লস্করের ভবন; পূর্ব বগুড়া রোডের কাজি অফিসের পেছনে রবীন্দ্রনাথ সেনের ভবন; আগরপুর রোডের মহিলা কলেজের দক্ষিণ পাশে মনু মিয়ার গং দেব ভবন; ফজলুল হক অ্যাভিনিউর আবদুর রউফ হায়দারের ‘হোটেল বাহাদুর’; সার্কুলার রোডের সৈয়দ মনছুর আহমেদের ভবন; ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়কের (সদর রোড) ফাতেমা খাতুনের ‘শাকুর ম্যানশন’; ঈশ্বরবসু রোডের অ্যাডভোকেট ওশিদা আক্তার চম্পার ‘সৈয়দ মঞ্জিল’; হাসপাতাল রোডের অমৃত কলেজর দক্ষিণ পাশে মান্নান মৃধার ভবন; কালুশাহ সড়কের জালাল আহমেদের ভবন; মেজর এম এ জলিল সড়কের (নবগ্রাম রোড) হাতেম আলী কলেজর হোটেলের পুরাতন ভবন; তাজউদ্দিন ‘ক্ষনিকা’ মেডিকেল কলেজ লেনের মো. ফরিদ উদ্দিনের ভবন; সরকারি বিএম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সুরেন্দ্র ভবন ছাত্রাবাস; বগুড়া রোড মোড়ে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর রোডের সালাম চেয়ারম্যানের পুরাতন ভবনসহ বেশ কিছু ভবন।
কাঠপট্টি এলাকার ব্যবসায়ীদের দাবি, মার্কেটে যুগের পর যুগ ধরে তারা ব্যবসা করে আসছেন। চুন-সুরকির এই ভবনগুলো পুরাতন হওয়া সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ না। একটি মহল পেছনে বসে ষড়যন্ত্র করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাঠপট্টি এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মার্কেট কর্মচারী বলেন, ‘এখন থেকে দু-তিনটি ভবন বেশ পুরাতন। যে কেউ দেখলইে বুঝবে। কিন্তু কতটা ঝুঁকি বলতে পারব না। শুনেছি সিটি করপোরেশন ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করেছে। তাই এখন ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছি।’
অন্যদিকে সরকারি ব্রজমোহন কলেজের (বিএম) সুরেন্দ্র ভবন ছাত্রাবাস যেন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত দাঁড়িয়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। কলেজ কর্র্তৃপক্ষ এবং সিটি করপোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তহীনতায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয়রা এবং ভবনটির পাশে বসবাস করা শিক্ষার্থীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সুরেন্দ্র ভবন ছাত্রাবাসের চারপাশ ভুতুড়ে অবস্থা। নড়বড়ে ভবনটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এই স্থানে আমার টাকাপয়সা কম লাগে বিধায় বসবাস করি। আমাদের কলেজ কর্তৃপক্ষ এটার দিকে নজর দেয় না। শুনেছি প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এ অবস্থায় আছে।’
বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো দ্রুত অপসারণ না করলে ভবিষ্যতে যেকোনো সময় মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের গুরুত্ব বাড়ানো উচিত।’
এ বিষয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের স্থপতি মো. হাসিবুর রহমান টিপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বরিশাল নগরীর মধ্যে ৩৭টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করেছি। এর মধ্যে অধিকাংশ ভবনেই মানুষ বসবাস করছে। এ ছাড়া কয়েকটি ভবনের বাসিন্দা নেই; তারা দূরে থাকেন। সব ভবন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, সিটি করপোরেশন থেকে নোটিস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা আমাদের ডাকে না। অনেকে নোটিস পেয়ে মামলাও করেছেন। কিন্তু ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ; সেগুলোর ব্যাপারে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।’ তবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং আগামী মাসের মধ্যে সদর রোডের ‘শাকুর ম্যানশন’ নামে একটি ভবন ভাঙা হবে।
১০ বছর ধরে বরিশালের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে বসবাস করে আসছে মানুষ, অন্যদিকে চলছে মার্কেট। কিন্তু এই ভবনগুলো ভাঙতে বাধা কোথায়Ñ এমন প্রশ্নের উত্তরে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ ফারুক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভবনগুলো ভাঙতে আমাদের কোথাও বাধা নেই। ভাঙতে পারব। আমরা চলতি বছর নতুনভাবে তালিকা তৈরি করেছি। ভবন মালিকদের নোটিস দিয়েছি। এখন আমরা ব্যবস্থা নেব। বর্তমানে আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চিকিৎসার জন্য ভারতে আছেন। তিনি বরিশালে আসামাত্রই আমরা ভবনগুলো ভাঙার ব্যবস্থা করব।’