চাকরি স্থায়ী করার দাবি এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নতুন কর্মচারী নিয়োগের প্রতিবাদে গতকাল রবিবার প্রায় ৫ ঘণ্টা রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন রেলওয়ের অস্থায়ী শ্রমিকরা। এতে ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেলযোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
দুপুরে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) জাহাঙ্গীর হোসেন এবং অন্য কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকারীদের দাবি মানার আশ্বাস দিলে বেলা আড়াইটার দিকে তারা রেলপথ থেকে সরে যান। এরপর রেল চলাচল স্বাভাবিক হয়। আন্দোলনকারীরা রেলভবনে গিয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সঙ্গে দেখা করে তাদের দাবি উত্থাপন করেন।
এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এফডিসি রেলগেটে রেললাইনের ওপর ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে অস্থায়ী শ্রমিকবৃন্দ’ ব্যানারে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। এ সময় সেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী তিতাস এক্সপ্রেস ট্রেনটি এলে তার সামনে শুয়ে পড়েন তারা। এতে আটকা পড়ে ট্রেনটি। পাশাপাশি কমলাপুর স্টেশনেও সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অন্তত ৩ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে অপেক্ষারত ট্রেনগুলোও আটকা পড়ে।
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাসুদ সারোয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, শ্রমিকদের অবরোধের কারণে রবিবার ৫টি আন্তঃনগর ট্রেন ৩ ঘণ্টা দেরিতে ঢাকা থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে গেছে। ট্রেনগুলো হলোÑ একতা এক্সপ্রেস, কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস, অগ্নিবীণা, চট্টলা ও জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস। বাকি ট্রেনগুলোর ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয়নি। আর ঢাকার কমলাপুরে আসতে ১৫-২০ মিনিট দেরি হয়েছে সুবর্ণ এক্সপ্রেসসহ দুটি ট্রেনের।
রেল চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক হাজার যাত্রী চরম অনিশ্চয়তা আর ভোগান্তিতে পড়েন। তাদেরই একজন আফসানা রহমান, যিনি সিলেটগামী জয়ন্তিকা ট্রেনের যাত্রী ছিলেন।
বেলা ১টার দিকে তিনি জানান, সোয়া ১১টায় তার ট্রেনটি ছাড়ার কথা থাকলেও তখনো স্টেশনে দাঁড়িয়ে রয়েছে শ্রমিক অবরোধের কারণে। তার সঙ্গে তিন ও সাত বছর বয়সী ছোট শিশুদের অস্থিরতা সামলাতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন এই নারী।
আরেক যাত্রী তুষার মিয়া খানিকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, সাধারণ মানুষকে এভাবে জিম্মি করে নিজেদের দাবি আদায় করার এই জঘন্য কাজ কবে বন্ধ হবে?
অসুস্থ বাবাকে দেখতে মৌলভীবাজার যাওয়ার উদ্দেশে ট্রেনে উঠে অবরোধের মুখে পড়েন। ট্রেন কখন ছাড়বে তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগের মধ্যে সময় পার করছিলেন তিনি।
আন্দোলনকারী শ্রমিকদের দাবি, বিজ্ঞাপন দিয়ে সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। যারা ইতিমধ্যে ১২ থেকে ১৪ বছর ধরে রেলে চাকরি করছেন। চুক্তি ছিল ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে তাদের স্থায়ী করা হবে। কিন্তু আজও রেল কর্তৃপক্ষ তাদের স্থায়ী করেনি; বরং তাদের বাদ দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নতুন করে কর্মচারী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
শ্রমিকরা বলেন, বর্তমানে অনেকের বয়স ৩৫-৪০ বছরের মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে অন্য কোথাও চাকরি করার বয়স নেই। রেলওয়েতে আউটসোর্সিং পদ্ধতি চালু করে অস্থায়ী শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করা হয়েছে। তারা এই আউটসোর্সিং প্রথা বাতিল করে নিয়োগবিধি ২০২০ সংশোধন করে আগের মতো চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস বহাল রাখার দাবি জানান।
তবে রেলওয়ের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতিক্রমে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে এসব শ্রমিককে বিভিন্ন সময় নেওয়া হয়েছে। চাকরি বিধি অনুযায়ী তাদের স্থায়ী করার সুযোগ নেই। তাদের যখন নেওয়া হয়েছিল, তখন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চাকরি স্থায়ী করার কোনো শর্তও দেয়নি। এমন অযৌক্তিক দাবি নিয়ে যাত্রীদের জিম্মি করার বিষয়টি দুঃখজনক।
আন্দোলনকারী শ্রমিকদের উদ্দেশে জিএম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আপনাদের আমরা অভিজ্ঞতার সনদ দেব। একই সঙ্গে আউটসোর্সিং কোম্পানিকে আপনাদের নেওয়ার বিষয়ে সুপারিশ করব। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আপনাদের রেলওয়েতে নিয়োগ দেওয়ার ইচ্ছা আছে আমাদের।’