এবার ডেঙ্গুতে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালের এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকের অবহেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হাবিবা হীরা চৌধুরী নামে ছয় বছরের এক শিশু মারা যাওয়ার অভিযোগ করেছেন মা অ্যাডভোকেট সুফিয়া পারভীন। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে (ক্র্যাব) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই অভিযোগ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সুফিয়া পারভীন বলেন, ‘হীরা আমার একমাত্র সন্তান। মাত্র ছয় বছর বয়সী হীরা পড়ত ওয়াইডব্লিউসি স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে। পাশাপাশি ব্রিটিশ কাউন্সিলে একটি কোর্সও করত। শরীরে জ¦র নিয়ে ৭ জুলাই সেন্ট্রাল হাসপাতালের ৪২২ নম্বর কেবিনে অধ্যাপক ডা. এ এফ এম সেলিমের তত্ত্বাবধানে হীরাকে ভর্তি করা হয়। তার শরীরে ডেঙ্গু ধরা পড়লে প্রথমে স্যালাইনের সঙ্গে জ¦রের ওষুধ প্রয়োগ করেন চিকিৎসকরা। ওই রাতেই হীরাকে স্যালাইনের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। পরে “রোফেসিন” নামক উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয়।’
শিশুটির মা আরও বলেন, ‘এভাবে কয়েক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের পর আমার মেয়ের লিভার ড্যামেজ হতে থাকে। তার পায়খানার সঙ্গে রক্ত আসতে শুরু করে। কিন্তু হাসপাতালে বিষয়টি জানানোর জন্য নার্স ছাড়া কাউকে পাওয়া যায়নি। চারটি ফ্লোরের জন্য একজন ডিউটি ডাক্তার থাকেন। বসেন সপ্তম তলায়, খুঁজতে গেলে বেশিরভাগ সময় পাওয়া যায় না। অধ্যাপক সেলিম ভর্তির পর থেকে মাত্র তিনবার রোগীর কাছে এসেছেন।’
সুফিয়া পারভীন বলেন, ‘১০ জুলাই রাতে ডাক্তার আমার মেয়েকে দেখতে এসে তার ব্লাড প্রেশার ও পালস পাচ্ছিলেন না। এরপর আমাদের বলেন, রোগীর অবস্থা ভালো না। তাকে জরুরি ভিত্তিতে পিআইসিইউ সাপোর্ট দিতে হবে। সেই ব্যবস্থা সেন্ট্রাল হাসপাতালে নেই। তাদের পরামর্শে আমার সন্তানকে রাত ১১টার দিকে মহাখালী ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে বেশ কিছু পরীক্ষার মধ্যে ফেরিটিন নামক একটি পরীক্ষা দেওয়া হয়। যেখানে একজন শিশুর ফেরিটিনের মাত্রা ৭ থেকে ১৪০ থাকার কথা, সেখানে হীরার ফেরিটিন ধরা পড়ে ২১ হাজার ৪৮৩। শ্বাস, হার্টসহ অন্যান্য সমস্যা দেখা দেয়। এ রিপোর্ট দেখেই সেখানকার চিকিৎসকরা বিড়বিড় করে বলে বসেন, সব তো শেষ করে নিয়ে আসছেন। রোগীর লিভার ফাংশন পুরো শেষ হয়ে গেছে। তারপর পিআইসিইউ নিয়ে চেষ্টা শুরু করেন তারা। কিন্তু আমার মেয়েকে আর বাঁচাতে পারেননি।’
তিনি হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের এ ধরনের অবহেলার জন্য তাদের শাস্তি দাবি করেন। এই অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এম এ কাসেম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। এমন কোনো অভিযোগও পাইনি। একটা মিটিংয়ে আছি। পরে কথা বলব।’
একইভাবে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মাসুদ পারভেজও এ ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে মন্তব্য করেন। এই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। সবচেয়ে ভালো হয় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বললে।’ তিনি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে পরে এ বিষয়ে জানাবেন বললেও আর জানাননি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় এই হাসপাতালে ৩১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে এ বছর এখানে মোট ভর্তি হয়েছে ২২৩ জন। তবে অধিদপ্তরকে দেওয়া তথ্যে শূন্য মৃত্যু দেখানো হয়েছে।
এর আগে এই হাসপাতালেই গত জুনে ভুল চিকিৎসায় এক মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশে ওই হাসপাতালের সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে সেবা না দিতে নির্দেশ দেয়।