সুদূরতমা
আমাদের অনেক আগের প্রজন্মের কবিরাও
তাঁদের সুদূরতমাকে নিয়ে কবিতা লিখতেন;
আমিও বসেছি লিখতে!
পূর্বসূরিরা যে সুদূরতমাদের নিয়ে কবিতা লিখতেন তাঁদের বাস ছিল হৃদয় ও স্মৃতির অলিন্দে তাঁদেরও বিরহী সুদূরতমা হবার কারণ ছিল জীবনের অনতিক্রম্য বাস্তবতা।
কিন্তু প্রেম মানেই যেহেতু বিরহকাতরতা,
কিংবা অচরিতার্থের বেদনা, অথবা রবীন্দ্রনাথের সোনার হরিণ, আমার যদি সে রকম কোনো সুদূরতমা থাকত তাহলেও আমি তাকে নিয়ে কবিতা লিখতাম না কারণ, কে না জানে বিষয়বস্তুর চর্বিত চর্বণে কবির সার্থকতা নেই!
আমার সূদূরতমাকে আমি চোখে দেখিনি;
সে যেখানে বাস করে, আমিও সে দেশেরই সন্তান কিন্তু এখন আর আমি সেখানকার নাগরিক নই!
এমন যে হবে তা ছিল আমার কল্পনারও অসাধ্য
হয়তো সে কারণেই পূর্বসূরি কবির মতো প্রেমিকার স্তনের আড়ালে থেকে যাওয়া একটি তিলকে আকস্মিক দেখে ফেলার মধুর স্মৃতির মতো আমার সুদূরতমার কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতি নেই!
আমার সুদূরতমাকে অতটা দূরের বাসিন্দা ভাবার কথা ছিল না; অনেক নদী দিয়ে বিভাজিত হলেও বড়ই ছোট্ট আমার সে দেশ যেখানে জন্ম আমার, ইচ্ছের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে নিকটতমা করে ফেলা কোনো ব্যাপারই নয়!
পূর্বসূরি কবির সঙ্গে তাঁর সুদূরতমার
সম্পর্কের ভিত্তিই ছিল চাক্ষুষ পরিচয়;
অথচ আমার সুদূরতমার সঙ্গে চর্মচক্ষে কোনো দিন দেখা হওয়ারই সুযোগ ঘটেনি! পূর্বসূরিদের সুদূরতমাদের অবস্থান বেশি দূরের ছিল না!
অথচ আমার সুদূরতমার কাছে যেতে হলে আমাকে ন্যূনপক্ষে দিতে হবে অতলআন্তিক পাড়ি!
পূর্বসূরিরা তাঁদের সুদূরতমাদের কল্পনায় নিজেদের হৃদয়ের অনেক গভীরে নিয়ে যেতে পারতেন; আমার সুদূরতমাকে অন্তর্জালে নিকটে চাইলে মুহূর্তেই ধরা দেয়, কথা বলে ভিডিও কলে, অনেক অন্তরঙ্গ হয়ে।
পূর্বসূরি এক কবির কথা বলছি যিনি তাঁর সুদূরতমাকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখলেও বাস্তবে তাকে কোনোদিন প্রেম নিবেদন করতে পারেননি। সে যে বেঁচে আছে সে সংবাদটুকু ছাড়া কবির প্রেয়সীর বাস্তব অবস্থানের সব সুন্দরের পুঁজিই ছিল শূন্য, অথচ ভালোবাসার সকল বাস্তবতা কল্পনায় ছিল বলে কল্পনার পুঁজিতেই তাঁর সমৃদ্ধি।
আজ যখন আমার সুদূরতমাকে নিয়ে
কবিতা লিখতে বসেছি তখন মনে হলো
এই পৃথিবীতে আমরা দুজনেই বাস্তব হওয়া সত্ত্বেও আমাদের সম্পর্কটা এক ধরনের অবাস্তবই!
আমার বাস্তব তেমন নয়, হলেও ভার্চুয়াল দেখা পাই তার এখানেই হার হয়ে যায় কল্পনার, কবি তাই খেয়ে যায় মার! একটাই মিল সেকালের কবির ও আমার পাই প্রত্যাখ্যানের বেদনা বারবার; সে ব্যথা প্রকাশে নিতে হয় আশ্রয় আমারও কল্পনার।
ভার্চুয়াল কি রিয়েল, সব প্রত্যাখ্যানেই কি নেই বেদনা অপার, যে ভার দুর্বহ, প্রকাশে নিতে হয় যার আশ্রয় কল্পনার!
এখানেই পেয়ে যাই মিল অতীতের কবির আর আমার!
ব্যায়াম
এতটা ক্ষণ তাই তো আমি তোমাকে নিয়ে ভাবছিলাম
আসলে সেটা আমার ছিল তোমাকে ভোলার ব্যায়াম!
গন্তব্য
যে গন্তব্যে যাব বলে উঠলাম ট্রেনে
কারো তা জানবার দরকার নেই, কী হবে জেনে
যে গন্তব্যে যাব বলে স্টেশনের বোর্ডে লেখা
সেখানে লাইনচ্যুত বগি পড়ে আছে বলে দেখা
গেল সেখানে যাবে না যাওয়া সহসা ট্রেনে
অথচ আর কোনো বাহনের অবহিতি নেই ব্রেনে
সেখানে যাবার!
বাহন পাবার
কথা নয় সহজে, তাতে কী!
গন্তব্যই আসল
আমার যাত্রা তাই গন্তব্যেরই দিকে
না থাকুক সঙ্গে আর কোনো দল!
হয়ে যাক আশা ফিকে
না হোক ঝলমল।
গন্তব্য যে আমার অপার
না থাকুক এমন কারো আর!
অলীক
একটি চূড়ায় রূপালি এক ফুল
অন্য চূড়ায় পাতারা যে আড়াল!
একটি যেনবা এখন ছোঁয়া যায়
অন্য চূড়ায় বিরহ চিরকাল!
স্তব্ধ নিশুতি সুপ্তি চারদিক
অদূরে রূপালি নদীর ঝিকমিক।
পাতার আড়ালে রয়েছে ঢাকা চূড়া
সেটাই অমরা অরূপ ও অলীক!
ভাষাদর্শন
তোমার প্রাকৃতিকতা
অথবা জীবনের উন্মুখতা
যদি আমার কাছে একটু অতিরঞ্জিত
প্রশস্তিই না পেল
তাহলে সারাটা জীবন ধরে
দেখবার সামর্থ্যে আমি কী আর এমন
অভিজ্ঞ হয়ে উঠলাম,
কী শিখলাম ভাষা
আর তুমিই বা কেন সুন্দর হয়ে
এসে দাঁড়ালে ঠিক আমারই সামনে!
নির্বাক, নিশ্চুপ
একবারটি উঁকি মেরেই
ফেলে দিলে ঝাঁপ
ভেবেছিলাম পাবো তোমার
উষ্ণতা উত্তাপ!
এমনি করে ঘুমের দেশে
পারলে হতে, টুপ!
বুঝতে পেরে অবাক আমি
নির্বাক, নিশ্চুপ!