মনিরুল ইসলাম। কিশোরগঞ্জে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি-স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী। স্বাক্ষরশৈলী এবং পরীক্ষামূলক কৌশলগুলোর জন্য এচিংয়ে একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব তিনি। শিল্পে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য ¯স্পেনের দুটি শীর্ষ সম্মাননা ক্রস অফ অফিসার অফ দ্য অর্ডার অফ কুইন ইসাবেলা (২০১০) এবং কমান্ডার ¯স্প্যানিশ অর্ডার অফ মেরিট (২০১৮) পেয়েছেন। ১৯৯৯ সালে মাতৃভূমি থেকে পান একুশে পদক। বরেণ্য আঁকিয়ে মনিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরে এসেছিলেন আড্ডা দিতে। আড্ডাবাজ হিসেবে ছিলেন- সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, সিনিয়র সহ-সম্পাদক মোহসীনা লাইজু, হেড অফ ইভেন্ট অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং শিমুল সালাহ্ উদ্দিন, সহ-সম্পাদক সাঈদ জুবেরী এবং ক্যামেরার পেছনে ছিলেন ডিজিটাল প্রযোজক লিটু হাসান। গ্রন্থনা : চিত্রশিল্পী মোবারক হোসেন জীয়ন ও বিনোদন সম্পাদক মাসিদ রণ
শিমুল সালাহ্ উদ্দিন : আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে আপনার সুদীর্ঘ পথ চলা। আর্ট ইনস্টিটিউটের শিক্ষকতা করাকালীন -স্পেন সরকারের বৃত্তি নিয়ে পড়তে গিয়েছিলেন -স্পেনে। সেখানে কাটিয়েছেন ৪০ বছর। আড্ডার শুরুতেই জানতে চাইব, আপনার শৈশবের কথা।
মনিরুল ইসলাম : আমার জন্ম ১৭ আগস্ট ১৯৪৩ সালে জামালপুরের ইসলামপুরে। কিন্তু পৈতৃক ভিটা চাঁদপুরে বাবার চাকরি সূত্রে। কিন্তু শৈশব কেটেছে কিশোরগঞ্জে । ছাত্র হিসেবে আমি খুব দুর্বল ছিলাম। ১৯৫৮ সালে কিশোরগঞ্জ রামেন্দু হাই স্কুল থেকে প্রথম ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিই। ৩ সাবজেক্টে ফেল করেছিলাম (কথা শুনেই সবার অট্টহাসি)। স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন জগদীশ চন্দ্র বসু। একবার আমি উনার কার্টুন আঁকছিলাম, খবর পেয়ে তো ভয়ংকর রাগ করলেন। পরে অবশ্য যখন জানতে পারলেন, বিখ্যাত মানুষদেরই কার্টুন আঁকা হয়, তখন উনি কাছে ডেকে বলেছিলেন- (জীবনে আর্টিস্ট হইতে হইব।)
কার্বন পেপারে সুই দিয়ে লিখে নকল করতাম। একটা পরীক্ষার ঘটনা বলি। নকল হিসেবে ৩২টা রচনা নিয়ে গেলাম। দেখলাম, পরীক্ষায় একটাও কমন পড়ে নাই। তখন আর কী করা? বানিয়ে লিখে দিয়ে আসলাম!
লেখা শুরু করেছিলাম মনের মাধুরী দিয়ে। কোনো ফরম্যাট নাই, আমি যেমন দেখেছি সেইরকম লিখলাম সন্ধ্যায় গরু যায় ধুলা ওড়ে, পরিবেশটা ঘোলা হয়ে যায়। ধুলা আর ধোঁয়া মিশে হোরাইজেন্টাল লাইন তৈরি হয়। গ্রামের মহিলারা একধরনের কাপড় পরেন গ্যাম্বুজ রঙের একবারে কটকটা রঙ। যে রঙ প্রকৃতিতে কম দেখা যায়। এদিকে বাচ্চারা মেঘনায় ছুপ ছাপ করে পড়ছে এইসব লিখতে লিখতে একটি রচনা লিখে খাতা শেষ করে ফেলছি। পড়াশুনা করতাম না তো? সারা দিন ঘুরে বেড়াতাম, ঘুড়ি ওড়াতাম। কয়েকদিন পরপর নরসুন্দা নদীতে মাছ ধরতাম ।
তাপস রায়হান : আপনার ছবি আঁকার শুরুটা কীভাবে হলো?
মনিরুল ইসলাম : যখন ঘুড়ি বানাইতাম তখন কাগজ কেটে সুন্দর নকশা বানাইতাম। রিকশার বডিতে ছবি আঁকতাম। লোকজন খুব সম্মান করত। দেখলেই বলত, এই যে আর্টিস্ট? এই বলে তারা আমাকে রিকশাই তুলত। কোনো ভাড়া নিত না। এই যে সম্মান, যেটা আমি একুশে পদক পাওয়ার পরও পাই নাই। আর্ট কলেজে পড়ার ইচ্ছা ছিল। যার কারণে ২ বার ফেল করার পর সিরিয়াস হইছিলাম। কারণ যেভাবেই হোক আর্ট কলেজে ভর্তি হতে হবে।
শিমুল সালাহ্ উদ্দিন : বাড়িতে রাজি করালেন কীভাবে?
মনিরুল ইসলাম : না, রাজি করাতে হয় নাই। যেহেতু কথা শুনতাম না, পড়তে চাইতাম না। ছবি আঁকায় আগ্রহ দেখে বাড়ি থেকে আর বাধা দেয় নাই।
সাঈদ জুবেরী : আপনার আর্ট কলেজ জীবন আর প্র্রেম নিয়ে কিছু বলেন?
মনিরুল ইসলাম : প্রেম আজকের মতো ছিল না সেই যুগে। তখন চারুকলায় যে মেয়েরা পড়ত তারা আসত সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে। ছবি আঁকা তো লাক্সারি ব্যাপার। আসলে শিল্প কখনোই সস্তা ছিল না। এক সময় রাজারা নিজেদের ও পরিবারবর্গের ছবি আঁকাতেন শিল্পীদের দিয়ে। এখনো উচ্চবিত্তের কাছে, করপোরেট ব্যবসায়ীদের কাছে ছবি বিক্রি হয়। আবেদিন স্যার সবসময় আমাদের বলতেন, কখনো ক্লাসমেটদের সঙ্গে প্রেম করবি না? তিনি সবসময় স্যুট পরে, ফরমাল ড্রেসে আসতেন। একটা বক্স ওয়াগন গাড়ি, অলিভ রঙের শার্ট, সাদা রঙের প্যান্ট চমৎকার আয়রন করা।
সাঈদ জুবেরী : আপনি তো -স্পেনসহ ইউরোপের আর্ট কলেজে গেছেন। সেখানের অ্যাকাডেমিক সিস্টেম ও আর্টের প্রসেস নিয়ে একটু বলবেন?
মনিরুল ইসলাম : অ্যাকাডেমিক সিস্টেম বলতে যদি এককথায় বলি, আমরা ইউরোপিয়ান আর্টকেই কপি করতেছি এখনো। গত ৫০ বছর ধরে আমাদের যে সিলেবাস পড়ানো হচ্ছে সেটা রয়েল স্কুল অফ আর্টের। যেমন ড্রয়িং, চারকোল, ওয়াটার কালার, আউটডোরে ক্লাস করা এই সব কিন্তু রয়েল স্কুল থেকে নেওয়া।
সাঈদ জুবেরী : -স্পেনে যাওয়ার গল্পটা?
মনিরুল ইসলাম : আমরা যখন আর্ট কলেজে ক্লাস নিই, তখন ইয়াং স্যারদের মধ্যে রফিকুন্নবী স্যার ছিলেন। আর আমি ছিলাম সবার থেকে জুনিয়র। একদিন বারান্দায় হাঁটতেছি। তখন রফিকুন্নবী স্যার বললেন এই -স্পেনে যাবা নাকি, যাও ঘুরে আসো। আমি বললাম না। বললাম আপনি যান না কেন? তখন সিনিয়র শিক্ষক ছিলেন খাজা স্যার। তিনিও আমাকে বললেন। এরপর আবেদন করার প্রস্তুতি নিলাম। তখন পেপার বুরোক্রেসি ছিল। একগাদা কাগজপত্র জমা দিতে হতো। নিজের সব সার্টিফিকেট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, মেডিকেল সার্টিফিকেট অনেক কিছু।
আমার এক বন্ধু খুব হেল্প করছিল। সে ছিল মোনায়েম খাঁর সেক্রেটারি। ওর মাধ্যমেই ডিপ্লোম্যাটিক প্রসেসে আমার কাগজ গেল। তখন অতটা সিরিয়াস ছিলাম না। অনেকটা তাচ্ছিল্যভাবেই আবেদন করেছিলাম। স্যাররা প্রায়ই জিজ্ঞেস করত, কি মিয়া পাঠাইছো সব? বলতাম হ্যাঁ স্যার, পাঠাইছি। তিন চার মাস পর টেলিগ্রামে রিপ্লাই আসল। তখন টেলিগ্রামে সবসময় দুঃসংবাদ আসত। আমার কাছে সুসংবাদই আসছে, কিন্তু দুঃসংবাদের মতো। কারণ তখন আমার বেতন ২০০ টাকা আর যাওয়ার বিমান ভাড়াই ছিল ৪০০ টাকা। তখন একটা অ্যাপ্লিকেশন করি, আমার ওই বন্ধুর মাধ্যমে। এরপর পাকিস্তান কনসু্যুলেট থেকে বিমানের একটা টিকিট ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু আসার তো ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর ইস্ট পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল থেকে আরেকটা টিকিট পেয়ে যাই। পরে আসার তো ব্যবস্থা করতে হবে, তারপর পূর্ব পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল থেকে আরেকটা টিকিট পেয়ে যাই। এই প্রথম আমি দেশের বাইরে গেলাম। তখন আমরা পূর্ব পাকিস্তান, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান আমাদের কাছে ছিল বিদেশ, কখনো যাওয়া হয় নাই তো।
মোবারক হোসেন : -স্পেনে জীবিকা কেমন ছিল?
মনিরুল ইসলাম : সংগ্রাম করতে হয়েছে, -স্পেন তখনো একটি দরিদ্র দেশ।
শিমুল সালাহ্ উদ্দিন : যে শিল্পের জন্য আপনি মানুষের কাছে সুপরিচিত সেটা হলো আপনার বিমূর্ত চিত্রশিল্প, আর এই যে আপনি বলেছেন আপনি ফুল না এঁকে ফুলের ঘ্রাণ আঁকেন এই বিষয়টা কীভাবে একটু বলেন?
মনিরুল ইসলাম : এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে ৭০ বছর পেছনে যেতে হবে। কিশোরগঞ্জের মতো একটি শহরে ‘শিল্পী’ শব্দটাই মানুষের কাছে অপরিচিত ছিল। তখন শিল্পীর কাজ কী? সাইনবোর্ড লেখা, রিকশার পেছনে ছবি আঁকা আর রাস্তার সিগন্যালের ছবি যদি আঁকতে পারে। বড়জোর সিনেমার পোস্টার ব্যানার। এরপর খবরের কাগজের ইলাস্ট্রেশন, যা হাশেম খান বহু বছর ধরে দক্ষতার সঙ্গে করেছেন বিচিত্রায়, কাইয়ূম চৌধুরী বইয়ের মলাট করেছেন। দ্যাট ওয়াজ দ্য পার্ট অব আর্টস। তখন তো ছবির গ্যালারি বলে কিছু ছিল না। এখন একটি ছবি ৪০ লাখ টাকাও বিক্রি হয়। এটা তো সে সময় ভাবনারও বাইরে ছিল, ইট ইজ এ মিরাকল বাংলাদেশের জন্য। আর আমরা তখন (১৯৬০-৬২) একটি ছবি এঁকে পেতাম ২০-২৫ টাকা। এটা সত্যি যে ওই সময় টাকার মূল্য ছিল। যখন আমি শিক্ষকতা শুরু করি তখন আমার বেতন ছিল ২০০ টাকা মাত্র। এই টাকা দিয়েই বাসা ভাড়া, কাজের লোক রাখা এবং একটি কুকুরও ছিল, সেটা মেইনটেইন করতাম। এরপর তো আমাদের শিক্ষকদের ধানমন্ডিতে থাকার ব্যবস্থা করা হলো। তখন ঢাকায় এত কলোনি ছিল না। মাত্র চারটি কলোনি ছিল (আজিমপুর কলোনি, মতিঝিল কলোনি, বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি আর ইস্পাহানি কলোনি)। আমি যখন ধানমন্ডিতে উঠি, তখন অত্র এলাকায় ২৪টি মাত্র গাড়ি ছিল। এখন এক একটা বাড়িতে ৪০টা কার রয়েছে। যাই হোক, অন্য কথায় চলে যাচ্ছি। যে প্রশ্নটা করেছেন সেটিতে আসি। আমি আর্টের ক্ষেত্রে খুব স্লো কাজ করেছি। হঠাৎ করেই বিমূর্ত ছবিতে চলে আসিনি। চারুকলায় যখন শিক্ষকতা করি তখন পাঁচ বছরে হাজার হাজার ছবি এঁকেছি। লঞ্চে রাতে বসে বসে স্কেচ করতাম, রিয়েলিস্টিক ছবি আর ইমেজ নিয়েই বেশি কাজ করতাম। তখন আমর সাহস হয়নি যে জাম্প করেই মূর্ত থেকে বিমূর্ত ছবিতে চলে আসব। কারণ, আর্টের এই জার্নি কিন্তু এক একটি সিঁড়ি ভাঙার মতো। আপনি হুট করেই ওপরের সিঁড়িতে যেতে পারবেন না। যেমন ভ্যানগগ, লুদ্রেক একটা যুগ গেছে, যারা ইমপ্রেসনিস্ট, বাট উইথ ইমেজ, অ্যাবসট্রাক্ট নয়। সোরাদ যেমন সেই কত আগে ভেবেছেন যে তিন-চারটি রঙের মধ্যেই ছবি আনা সম্ভব। যেমন নিউজ পেপারে চারটি রঙেই সব রঙিন ছবি ছাপা হয় ব্ল্যাক, ব্লু, সায়ান অ্যান্ড ইয়োলো। এগুলো তো আমরা কিশোরগঞ্জে থাকতে জানতাম না।
সাঈদ জুবেরী : স্পেনে যাওয়ার আগেই কি বিয়েটা সেরে ফেলেন?
মনিরুল ইসলাম : না না। বিয়েটা তো আরও পরে করেছি।
মোহসীনা লাইজু : বিয়ে করলে এত আঁকাআঁকি হতো?
মনিরুল ইসলাম : না না, তেমন কোনো কথা নেই। বিশে^র অনেক পেইন্টার আছেন খুব ডিসিপ্লিনড, ওয়ান মিরর, হি ইজ এ নরমাল ম্যান, অলসো এ গ্রেট পেইন্টার। পিকাসো আবার ছিলেন আলাদা। তার কাছে ৮ ওম্যান ছিল লিগ্যালি। হেনরি ৮ উইথ ৮ ওম্যান, অ্যান্ড পিকাসো ইউথ ৮ গার্লফ্রেন্ড। এটা তাকে নিয়ে লেখা একটা আর্টিকেলসে পড়েছি। পিকাসো ইস পিকাসো, হি ইজ লয়েল অনলি হিজ আর্ট, নাথিং এলস। তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে বৈপরীত্ব ছিল। একদিনে ছিলেন ভেরি কাইন্ড, একদিকে ভেরি ক্রুয়েল। খুব খেয়ালি মানুষ ছিলেন। বেশিরভাগ টাকা-পয়সা দিয়ে দিতেন কমিউনিস্ট ফান্ডে।
সাঈদ জুবেরী : আপনার আর্টে প্রেম বা নারীর অনুপ্রেরণা কতখানি?
মনিরুল ইসলাম : অবশ্যই অনেকখানি ইনফ্লুয়েন্স রয়েছে। বাই নেচার আমরা পুরুষরা নারীর দ্বারা অনুপ্রাণিত হই। আল্লাহ তো সবাইকে পুরুষ বা সবাইকে নারী হিসেবেই তৈরি করতে পারতেন। তাহলে কেন বিপরীত লিঙ্গ সৃষ্টি করলেন? সেটার পেছনে নিশ্চয়ই বিরাট রহস্য বা যৌক্তিকতা রয়েছে। এই যে মিস্ট্রি যা আমরা এখনো পুরোপুরি ভেদ করতে পারিনি। বেসিক্যালি মানুষকেই তো পুরোপুরি ডিসকভার করা যায় না মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। আর যদি কাউকে পুরোটাই ডিসকভার করা হয়ে যায় তখন তার প্রতি ইন্টারেস্টটা চলে যায়।
সাঈদ জুবেরী : প্রেমকে আপনি রিয়েলিস্টিক নাকি অ্যাবসট্রাক্ট হিসেবে দেখেন?
মনিরুল ইসলাম : এটাকে আসলে দুই ভাবেই দেখতে হবে। যে মানুষের প্রেমে পড়লেন তিনি তো রিয়েল, সো এখানে রিয়েলিস্টিক হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। আর প্রেমের অনুভূতি নিঃসন্দেহে বিমূর্ত। ফলে সেটিকে অ্যাবসট্রাক্ট ওয়েতে দেখা যায়।
সাঈদ জুরেবী : তাহলে প্রেমিক হিসেবে আপনি কেমন?
মনিরুল ইসলাম : আমি আসলে আর্টিস্ট হিসেবে ইন্ডিভিজ্যুয়াল। আমার কাছে ব্যক্তি স্বাধীনতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কাউকে অনুকরণ করিনি কোনো দিক দিয়েই। তাছাড়া আমি পিকাসো বা অন্যান্য বিশ্ববিখ্যাত শিল্পীর জীবনের মতো হতে চাই না। কারণ তাদের কালচার আর আমাদের কালচার তো এক নয়। যেমন আমাদের এখানে বিয়ে করা মানেই হলো স্ত্রীকে নিজের সম্পত্তি মনে করা। তারও যে একটি আলাদা জীবন আছে, ব্যক্তি স্বাধীনতা আছে সেটি আমরা ভুলে যাই। তাকে হয়তো বলেই যাচ্ছি এটা ধরে দাও, ওটা দাও। কিন্তু ইউরোপে এমন নয়। নিজের জিনিস নিজেকেই করে নিতে হয়।
মোহসীনা লাইজু : মাদ্রিদের গল্পে ফিরে যাই।
মনিরুল ইসলাম : অনেকেই বিদেশে চলে গেল সে সময়। রশিদ চৌধুরী চলে গেলেন প্যারিসে, তিনি সেখান থেকে ফিরে এসে বাংলাদেশে টেপেস্ট্রি নিয়ে কাজ শুরু করলেন। যা আগে এদেশে কেউ করেনি। শফিউদ্দিন সাহেব গেলেন লন্ডনে। তিনি দেশে এসে শুরু করলেন এচিং। তিনি এচিংয়ের জন্য বিখ্যাত, দারুণ সব কাজ করেছেন এচিং নিয়ে। বাট হি ইজ ভেরি মেথোডিস্ট অ্যান্ড ভেরি এলিগেন্ট। থ্রিপিস স্যুট পরে আর্ট কলেজে শিক্ষকতা করতে আসতেন। আমি এটার পক্ষপাতী। আর্টের লাক্সারি আর রিলাক্স খুব দরকার। আর্টিস্টের চারটা গাড়ি থাকতেই পারে, সুইমিং পুল থাকতে পারে, তিনটা বাড়ি থাকতেই পারে। এটা আর্টের জন্য ক্ষতিকর নয়।
যাই হোক আমার মাদ্রিদের জার্নি বলি। আমি তো একাত্তরে যুদ্ধের মধ্যেই সেখানে চলে যাই। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আর্ট কলেজের সামনে বসেই শুনে গিয়েছি। তখন তো রেসকোর্সে একটাও গাছ ছিল না। আর্ট কলেজ থেকে দিব্যি সব দেখা যেত। এটা আমার খুব খারাপ লাগে যে, ঢাকায় একটাও ঐতিহাসিক জিনিস অক্ষত নেই। এই ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে প্রতি শুক্রবার সকালে ঘোড়দৌড় হতো। এখন একটা ফাঁকা জায়গা নেই। আমরা আর্ট কলেজ থেকে একেবারে ফাঁকা মাঠ পেরিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে চলে যেতাম। আই ওয়াজ কনফিউজ দ্যাট টাইম। মাত্র ৯ মাসের জন্য গেছি, এত কম সময়ে হোয়াট ক্যান আই ডু? পরে সিদ্ধান্ত নিলাম সেখানকার মিউজিয়ামগুলো অন্তত ভালোভাবে ঘুরে দেখি। এরপর তো সেখানে বেশ কয়েক বছর থেকে গেলাম। অনেক কিছু শেখার, অনেক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হলো।
তাপস রায়হান : শিল্পী তো কখনোই তৃপ্ত হয় না তার শিল্পকর্ম নিয়ে। আপনার ভাবনাটা জানতে চাই।
মনিরুল ইসলাম : আসলেই তাই। তবে ছবিটা শেষ করার পর এক ধরনের
তৃপ্তিবোধ কাজ করে। তখন মনের মতো করে কিছুটা সময় কাটানোর অুনষঙ্গ খুঁজে নিই।
তাপস রায়হান : আপনার এত অর্জন, সাফল্য, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা। সেই দর্শন পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন?
মনিরুল ইসলাম : না, আমি অত বড় চিন্তার মধ্যে যেতে চাইনি। আমরা (শিল্পীরা) একদিক থেকে একসেন্ট্রিক, ইগোইস্টিক অলসো। এখন আমাকে যদি বলা হয়, আপনি সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয় এমন ছবি আঁকুন। আমি কি সেটা করব? এত বছরের পড়াশুনা ও চর্চার মাধ্যমে আমার যে ইন্টেলেকচুয়াল থট গ্রো করেছে সেটাকে তো নামিয়ে আনতে পারি না। তবে এটা ঠিক যে আমার স্টাইল ও ছবি আঁকার দর্শন অনেককেই প্রভাবিত করে বলে শুনেছি। দেশেও আছে, মাদ্রিদেও আছে যারা আমাকে ফলো করে। আবার আমিও তো শতভাগ পিওর নই। আমিও কিছু না কিছু ফলো করি। যেমন ভ্যানগগ ফলো করতেন জাপানিজ ক্যালেন্ডার। অথচ তিনি গ্রেট পেইন্টার। গুরু সবারই থাকবে, কিন্তু সেই ছায়া রেখে নিজস্ব চিন্তার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নতুন ব্যঞ্জনা তৈরি করাই সফল শিল্পীর বৈশিষ্ট্য। আমি সেই ধারাটাকেই অব্যাহত রাখতে চেষ্টা করি।