চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলি থানার বিটাক মোড়ে চলতি বছর ৯ মে রাতে প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষ কিশোর গ্রুপের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান মোহাম্মদ সজীব (২০) ও মোহাম্মদ মাসুম (৩০)। এর আগে গত বছর ১৬ এপ্রিল একই থানার ঈদগা কাঁচা রাস্তার মাথা এলাকায় প্রতিপক্ষ কিশোর গ্রুপের ছুরিকাঘাতে খুন হয় ফাহিম নামে এক কিশোর। তার আগের বছর নগরীর মুরাদপুর এলাকায় মোবাইল ফোন হারানোকে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটির জেরে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের ছুরিকাঘাতে খুন হয় রফিকুল ইসলাম নামে আরেক কিশোর।
শুধু এ তিনটি ঘটনা নয়, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং অপরাধ পর্যবেক্ষকরা বলছেন, চট্টগ্রাম নগরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি থাকা সত্ত্বেও দমানো যাচ্ছে না কিশোর অপরাধ চক্রকে। দিন দিন তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। কথিত রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ ছত্রছায়ায় তারা বিভিন্ন নামে কিশোর গ্রুপ গঠন করে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ইভটিজিং, নারী ও কিশোরীদের উত্ত্যক্ত এমনকি খুনের মতো ভয়ংকর অপরাধে জাড়াচ্ছে। নগর পুলিশের বন্দর ও পশ্চিম বিভাগের করা এমন একটি কিশোর অপরাধ চক্রের তালিকা দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে।
যাতে দেখা যায়, সিএমপির পশ্চিম ও বন্দর বিভাগের আওতাধীন আট থানা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ৮১ জন। থানাগুলো হলো আকবরশাহ, হালিশহর, ডবলমুরিং, পাহাড়তলি, বন্দর, ইপিজেড, পতেঙ্গা ও কর্ণফুলী। এসব থানার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং সদস্য আছে ডবলমুরিং থানায়। এই থানা এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ৩৪ জন কিশোর গ্যাং সদস্য। ১৭ জন কিশোর গ্যাং সদস্য নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে আকবরশাহ থানা। তৃতীয় স্থানে পতেঙ্গা থানা। এ থানা এলাকায় আছে ১৫ জন কিশোর গ্যাং সদস্য। এ ছাড়া হালিশহর থানায় ১১, বন্দর থানায় ৪ জন।
তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইপিজেড, কর্ণফুলী ও পাহাড়তলি থানা এলাকায় কোনো কিশোর গ্যাং সদস্য নেই। অথচ ২০২২ সালের ১৬ এপ্রিল এবং ২০২৩ সালের ৯ মে পাহাড়তলি থানা এলাকায় ঘটেছে আলাদা তিনটি হত্যাকাণ্ড। তালিকায় ৮১ জন কিশোর গ্যাং সদস্যের মধ্যে ২৪ জনেরই বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছর। বাকি ৫৭ জনের বয়স ১৯ থেকে ৪৩ বছর। তাদের বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, অস্ত্র কারবার, অপহরণ, ছিনতাই, মারামারি ও মাদক কারবারের মতো ভয়ংকর সব ফৌজদারি অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে।
তালিকায় আছে তিন খুনের মামলার আসামিসহ সর্বোচ্চ ১৭ মামলার আসামিও। তবে এসব অপরাধীর কেউ বয়সে কিশোর নয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৮১ জনের মধ্যে জামিনে আছে ৫৫ অপরাধী। পলাতক পাঁচজন, কারাবন্দি দুজন। বাকি ১৯ জন জামিনে নাকি পলাতক, সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই পুলিশের কাছে। নাম প্রকাশ না করে সিএমপির এক কর্মকর্তা বলেন, আট থানার তালিকায় কিশোর অপরাধীদের সঙ্গে পেশাদার অপরাধীদেরও গুলিয়ে ফেলা হয়েছে।
তবে দেশ রূপান্তরের হাতে আসা কিশোর গ্যাং সদস্যদের তালিকার বিষয়ে ভিন্নরকম বক্তব্য দিয়েছেন সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আ স ম মাহতাব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো গণমাধ্যমে এ ধরনের তালিকা সরবরাহ করিনি। যে কেউ অপরাধ সংঘটনের পর তার আমলনামা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিডিএমএসে (ক্রাইম ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) চলে আসে। মূলত সেটাকেই তালিকা বলা হচ্ছে। শুধু কিশোর নয়, সব শ্রেণির অপরাধীদের গতিবিধির ওপর পুলিশের নজরদারি আছে।’
কিশোর অপরাধীদের গতিবিধির ওপর পুলিশের নজরদারি আছে বলে মন্তব্য করে সিএমপির অন্যতম শীর্ষ এ কর্মকর্তা বলেন, ‘কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণগুলো অনুসন্ধান করতে হবে। কিশোররা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার উৎস খোঁজা হচ্ছে। তবে কিশোর অপরাধে জড়ানোর দায় অভিভাবকরা এড়াতে পারেন না। নিজেদের সন্তানদের নজরদারিতে রাখতে হবে। সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মিশছে সে খেয়াল বাবা-মাকে রাখতে হবে।’
তালিকার ১১ নম্বরে আছে মো. শাকিল হাসান ওরফে লাল সাগর (২২)। তার বাবার নাম রুহুল আমীন। গ্রামের বাড়ি ফেনী সদরে। বর্তমানে থাকে নগরের বিশ্বকলোনির জে ব্লক এলাকায়। তার বিরুদ্ধে আকবরশাহ থানায় আছে ১৩টি মামলা। ছিনতাই, মারামারি, হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ১১টি, একটি অস্ত্র আইনে, অন্যটি মাদকের মামলা। পুলিশের খাতায় সে এখনো পলাতক। শাকিল হাসানের বিষয়ে জানতে চাইলে আকবরশাহ থানার ওসি ওয়ালী উদ্দিন আকবর বলেন, ‘কিশোর অপরাধীদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অপরাধ সংঘটনের খবর পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে তালিকার বিষয়টি আমি জানি না।’
ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ মিস্ত্রিপাড়ার দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং সদস্য মো. জসিম (২৯)। তার বাবার নাম হাফিজুর রহমান। তার বিরুদ্ধে আছে ১৭টি মামলা। এর মধ্যে আছে দুটি হত্যা মামলা। হালিশহর থানার হালিশহর আবাসিক এলাকার বিহারি কলোনির শাহাদাত হোসেন রকি (১৭)। বাবার নাম মো. সোহেল। রকির বিরুদ্ধে হালিশহর থানায় আছে একটি হত্যাসহ তিনটি মামলা। সে এখন জামিনে আছে।
ডবলমুরিং থানার ভয়ংকর অপরাধী বেলাল হোসেন সেলিম ওরফে সেলিম্যা (৪০)। সে আগ্রাবাদ বেপারিপাড়ার জাফর আহমদের ছেলে। তার বিরুদ্ধে ডবলমুরিং থানায় আছে ছয়টি মামলা ও চারটি জিডি। এর মধ্যে তিনটিই হত্যা মামলা। পুলিশের তথ্যমতে, দুর্ধর্ষ এ অপরাধী বর্তমানে জামিনে আছে। তবে তার বিষয়ে এই মুহূর্তে কোনো তথ্য জানা নেই বলে জানিয়েছেন ডবলমুরিং থানার ওসি সাখাওয়াত হোসেন।
ডবলমুরিং থানার আরেক দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং সদস্য গোলজার আলম ওরফে গোলজার হোসেন ওরফে পিস্তল গোলজার (৪১)। তার বাড়ি নগরের উত্তর আগ্রাবাদ দাইয়াপাড়া আজগর আলী সারাং বাড়ি। বাবার নাম মো. মুছা ওরফে কালা বুচিক্কা। জামিনে থাকা এ অপরাধীর বিরুদ্ধে ডবলমুরিং থানায় আছে ছিনতাই, মাদক ও অস্ত্র কারবারসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৪টি মামলা।
একই থানা এলাকার আরেক পেশাদার অপরাধী মো. ইমতিয়াজ খান রনি (৩২)। থাকে আগ্রাবাদ বেপারিপাড়ায়। তার বিরুদ্ধে বন্দর, কর্ণফুলী, ডবলমুরিং ও হালিশহর থানায় রয়েছে ১৭টি মামলা।